বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত রানীগঞ্জ সেতু/ উদ্বোধনের পর চলবে গণপরিবহন

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের দক্ষিণা দুয়ার খুলে যাবে আজ (সোমবার)। সকাল ১০ টায় সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ সেতু (রানীগঞ্জের কুশিয়ারা সেতু) ভার্চুয়ালি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই পথ দিয়ে চলবে সকল প্রকার যানবাহন। নব নির্মিত রানীগঞ্জ সেতুকে বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত করা হয়েছে।
সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সুনামগঞ্জবাসীর বহুদিনের স্বপ্নপূরণ হবে। সুনামগঞ্জের ভাটির কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য সহজেই পৌঁছে যাবে রাজধানী ঢাকায়। ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সুনামগঞ্জবাসীর দুরুত্ব কমে যাবে ৫৫ কিলোমিটার। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা সময় কম লাগবে সুনামগঞ্জবাসীর।
সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীলরা জানান, পাগলা-জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কের রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কুশিয়ারা নদীর ওপর রানীগঞ্জ সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট। ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতু ও আড়াই কিলোমিটার সংযোগ সড়ক কাজ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ২৪ ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড ২৪ বি এবং এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এমবিইএল। চুক্তি অনুযায়ী ৭০২ দশমিক ৩২ মিটার দীর্ঘ এবং ১০ দশমিক ২৫ মিটার প্রস্থ সেতুটির নির্মাণ কাজ ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা ৬ বছরে এসে শেষ হয়।
১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের চেষ্টায় পাগলা-জগন্নাথপুর-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজ শুরু হয়।
২০০১ সালে বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ওই সড়ক অপ্রয়োজনীয় উল্লেখ করে সড়কের বরাদ্দ বাতিল করলে মহাসড়কের অকাল মৃত্যু ঘটে। পরে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এলে ওই আসনের সংসদ সদস্য বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ওই আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজ পুনরায় চালুর প্রচেষ্ঠা চালান। এক পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার তালিকা সবুজ পাতায় সড়কটি অন্তর্ভূক্ত করে একনেকে ৫২ কোটি টাকা অনুমোদন করান।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরেরর তথ্য মতে, ২০১৪ সালের ২৫ জুন একনেকের সভায় প্রধানমন্ত্রী এই সেতুর ১২৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেন। পরে ওই বছরের জুন মাসে সেতুর দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রে অংশ নেয় দেশী-বিদেশী তিনটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। অবশেষে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে যৌথভাবে কার্যাদেশ পায় চায়না রেলওয়ে ২৪ ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড ২৪ বি এবং এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এমবিইএল। পরে ২০১৭ সালের ১৪ জানুয়ারি বর্তমান সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানকে সাথে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ব্যয় এবং সময় বাড়ানো হয়।
রানীগঞ্জ ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুক্তাদীর আহমদ জানান, রানীগঞ্জ সেতু নির্মাণের ফলে রাজধানী ঢাকাসহ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগে সুবিধা হবে। ঢাকার সঙ্গে কমবে দূরত্ব, বাঁচবে সময়। তাছাড়া আশপাশে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে। যা এলাকার বেকারত্ব নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আকমল হোসেন জানান, রানীগঞ্জ সেতু উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে জগন্নাথপুরসহ জেলাবাসীর দীর্ঘদিন স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। প্রবাসী অধ্যুসিত জগন্নাথপুরবাসীকে এখন ভিড় ঠেলে সিলেট হয়ে রাজধানীতে যাওয়ার যন্ত্রণা সইতে হবে না। পুরো জেলাবাসীর বহুদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে এই সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, শত সেতু ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সোমবার রানীগঞ্জ সেতু উদ্বোধন করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সিলেট বিভাগে ১৭টি সেতুর উদ্বোধন হবে এদিন। এর সবগুলোই সুনামগঞ্জের। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় রানীগঞ্জ সেতু। প্রধানমন্ত্রী সকাল ১০টায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সভাপতিত্ব করবেন। সুনামগঞ্জ, বরিশাল, খাড়ড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হবেন প্রধানমন্ত্রী। সুনামগঞ্জের রানীগঞ্জ সেতুর পাশের স্কুল মাঠে এই উপলক্ষে বড় আকারের সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। এখানে মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এমপি ও পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ এমপি, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানগণ উপস্থিত থাকবেন।