বর্ণিল ব্রাজিল

এনাম আহমদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
পৃথিবীর ৫ম বৃহত্তম দেশ ব্রাজিল। সারাবিশ্বে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি ভৌগোলিক —রাজনৈতিক ভাবে যতোটা পরিচিত, তা অপেক্ষা অনেক অনেক বেশি পরিচিত ফুটবল খেলার কারণে। বিশ্ব ফুটবলের বৃহত্তম খনি ব্রাজিলে অবস্থিত! প্রায় ২২কোটি মানুষের এই দেশের রাজধানীর নাম ব্রাসিলিয়া। ১৮১৫ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল ছিল পর্তুগালের উপনিবেশ। ১৮২২ সালে ব্রাজিল পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ব্রাজিলের ভাষা এখনো পর্তুগীজ।
ব্রাজিল ১৯১৪ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলা শুরু করে। এ পর্যন্ত ফিফা নিয়ন্ত্রিত ১৯টি আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছে তারা। এর মধ্যে রয়েছে রেকর্ড ৫টি বিশ্বকাপ! সর্বোচ্চ ১৫৯ বার ফিফা র‌্যাংকিং এ শীর্ষে উঠেছে ব্রাজিল। সাম্বা নৃত্যের সাথে শৈল্পিক ফুটবলের সংমিশ্রণ ব্রাজিলকে দিয়েছে অনন্য উচ্চতা।
ব্রাজিলের হলুদ জার্সির উপর সবুজ রঙের পাঁচটি ছোট ছোট তারা। এটি সমর্থকদের গর্বের প্রতীক। ৫ বারের বিশ্বকাপ জয়ী দল তাদের হলুদ জার্সি নিয়ে গর্ব করতেই পারে। কিন্তু ১৯৩০ সালের ১ম বিশ্বকাপ থেকে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত ব্রাজিলের জার্সির রং ছিল সাদা! ১৯৫০ সালের ব্রাজিলের মাঠে ব্রাজিল বনাম উরুগুয়ের মধ্যে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়।
প্রায় দুই লক্ষ স্বাগতিক দর্শকের উপস্থিতিতে মারাকানাজো স্টেডিয়ামে ব্রাজিল প্রথমে গোল করে এগিয়ে গেলেও উরুগুয়ে পরে দু গোল দিয়ে বিশ্বকাপ ছিনিয়ে নেয়! ব্রাজিলে শুরু হয় বিরাট হুলুস্থুল! অনেক সমর্থক পরাজয় সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। শেষমেশ সমর্থকরা সাদা জার্সিকে অপয়া মনে করে তা বদলে ফেলার জন্য বিক্ষোভ করতে থাকেন। আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ জাতীয় দলের জার্সির রং হলুদ নির্ধারণ করেন।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার এডিসন আরাতেস দো নাসিমেন্তো, সারাবিশ্বে তিনি পেলে নামে বিখ্যাত। ৮২ বছর বয়সী এই জীবন্ত কিংবদন্তি চার দশকেরও বেশি আগে ১৯৭৭ সালে অবসর নিলেও সাবেক এই খেলোয়ার সারা দুনিয়ায় এখনও সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিদের একজন। মূলত তিন তিনবার বিশ্বকাপ জয় করার জন্য পেলে বিখ্যাত হয়েছেন। তিনিই বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি এতোবার বিশ্বকাপ জয় করলেন। তিনি সর্বমোট গোল করেছেন ১২৮১টি যা বিশ্বরেকর্ড! ফুটবল খেলায় পেলে যে দক্ষতা ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছেন, সেটি মানুষের কল্পনার সীমানাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তার গল্প ছড়িয়ে আছে খেলাধুলার বাইরের জগতেও।
নান্দনিক ফুটবলের রাজা ব্রাজিল, ফুটবল বিশ্বের সফলতম দলের নামও ব্রাজিল। ব্রাজিল যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার। যারা ফুটবলকে শিল্প হিসেবে রুপদান করেছেন। ফুটবলার নান্দনিকতা,সৌন্দর্যবর্ধনে ব্রাজিল যোগ করেছে নতুন মাত্রা। পেলে, গ্যারিঞ্জা, জর্জিনহো, বেবেতো, ভাবা, দিদি, লিওনিডাস, কাফু, দুঙ্গা, জিকো, সক্রেটিস, কাকা, কার্লোস, রোনালদো, রিভালদো, রোমারিও, রোনালদিনহো অধুনা নেইমারের মতো কালজয়ী ফুটবলারদের আবির্ভাব ঘটেছে ব্রাজিলে।ব্রাজিলে প্রতিভার অভাব নেই, প্রতিটি প্রজন্ম থেকেই একাধিক মহা তারকা তৈরি করেছে ব্রাজিল। প্রতি বছরই শত শত ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় ইউরোপে খেলতে যায়।সেখানে খেলে একেকজন তারকা তৈরি হয়। এভাবেই ব্রাজিল নিজেদের ফুটবল সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে।
সেই ২০০২ সালে সর্বশেষ শিরোপা জেতে ব্রাজিল! এবারের কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিল অত্যন্ত শক্তিশালী দল। এবার শিরোপা না জেতে ঘরে ফেরাটা হবে তাদের জন্য বড় ব্যর্থতা। ব্রাজিলের অধিবাসী ও পৃথিবীর কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্তদের নেইমার—আলিসনদের কাছে একমাত্র চাওয়া ৬ষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা। শুষ্ক মরু অঞ্চল থেকে দিগ্ধ সবুজ বনভূমিতে এবারের শিরোপা স্থানান্তরিত হয় কী—না এখন সেটিই সবার কৌতূহল!
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।