বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর

এস ডি সুব্রত
মহাভারতের রচয়িতা কবি সঞ্জয়, মরমী সাধক হাসন রাজা, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম আর ধামাইল গানের জনক রাধারমণ দত্তের সুনামগঞ্জ জেলার টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এক অপরূপ সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি, যার জুড়ি মেলা ভার। ভারতের খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর হিজল করচের সারি, বিরল প্রজাতির মাছ, পাখি আর জলজ উদ্ভিদের অনন্য আধার। হাওর কন্যা সুনামগঞ্জ এর বর্ষার এক অনুপম সৌন্দর্যের নাম টাঙ্গুয়ার হাওর। বর্ষায় অনন্য রূপ নিয়ে ধরা দেয় আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় ‘রামসার সাইট’ টাঙ্গুয়ার হাওর। সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় অবস্থিত এ হাওরের আয়তন ১২৬৫৫ হেক্টর। ৪টি ইউনিয়ন, ১৮ টি মৌজা, আর ৪৬ টি গ্রাম নিয়ে বিশাল এ হাওরে রয়েছে ১০৯ টি বিল। টাঙ্গুয়ার হাওর দেশীয় মাছ, জলজ বৃক্ষ পরিযায়ী পাখির এক অনন্য আবাসস্থল। বিলুপ্ত প্রায় হিজল করচ, নল খাগড়া আর চাইল্যা বনের দেখা মেলে এখানে। এ হাওরে রয়েছে ১৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৪১ প্রজাতির মাছ, ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১৫০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১২ প্রজাতির ব্যাঙ, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরিগিটি আর ২১ প্রজাতির সাপ। এ হাওরে বিলুপ্ত প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে মহাশোল, সরপুটি, চিতল, বাগার ও রিটা মাছ। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের নীল জলরাশি আর ওপারের মেঘালয় পাহাড় এ হাওরকে সাজিয়ে দিয়েছে অনন্য রূপে। এখানে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য পর্যটকদের জন্য রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। এখানে রয়েছে সোয়াম ফরেস্ট। হাওরের মাঝে দেখা মিলবে হরেক রকমের শাপলা শালুক, নীল জলরাশির খেলা, ছবির মতো সুন্দর বৌলাই নদী। এ হাওরের অন্যতম বিল হচ্ছে লেউচ্ছামারা, বেরবেরিয়া ও হাতিরগাথা। হাওরের টলটলে জলে গোসল, সাঁতার আর রাতে পূর্ণিমা যাপন পর্যটকদের আনন্দ উদযাপনের এক অন্যতম অনুষঙ্গ। এ সময় চাঁদের আলোয় পানি চিক চিক করে। দিনে ঘুরা ঘুরি শেষে নৌকায় রাত্রি যাপনের মজাই আলাদা। বর্ষা ও শীতে দুই রুপে দেখা দেয় টাঙ্গুয়া। বর্ষায় যতদূর চোখ যায় শুধু থৈ থৈ জলরাশি, আর জলরাশিতে মাথা বের করে দাঁড়িয়ে থাকে সারি সারি হিজল করচ। হাওরের গ্রামগুলো তখন যেন দ্বীপের মতো ভাসতে থাকে পানিতে। কখনো সাদা মেঘের ভেলা আর রোদের ছায়ায় নীল ঢেউয়ের জলকেলিতে মন হারায় অজানায়। টাঙ্গুয়ার হাওরে বর্ষায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত ছোট বড় নৌকা যা ভাড়ায় পাওয়া যাবে। বর্তমানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন পর্যটন নৌকা রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়ানোর জন্য। কম সময়ে ঘুরার জন্য রয়েছে স্পীটবোটের সুবিধা। টাঙ্গুয়ার হাওরের অপরুপ সুর্যাস্ত, চাঁদনী রাতের মাতাল জোছনা আর বাউল বাতাসে ক্ষণিকের জন্য হলেও হারিয়ে যাওয়া যায় অচেনা ভূবনে। এমন মনকাড়া উন্মাদনা হাওর কন্যা সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার আর কোথাও মিলবে না ।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক