বাঁধের কাজে গাফিলতির ফল হতে পারে ভয়াবহ

১৫ ডিসেম্বর থেকে যেখানে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু করার কথা সেখানে জগন্নাথপুর উপজেলায় ২৮ টি প্রকল্পের বিপরীতে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১১ টি প্রকল্পের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা শেষ হয়েছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। অথচ ঢাকঢোল পিটিয়ে ওই উপজেলায় গত ১৫ ডিসেম্বর বাঁধের কাজ উদ্বোধন করা হয়েছে। জেলার অন্যান্য উপজেলার পিআইসি গঠন কিংবা বাঁধের কাজ শুরুর অবস্থা জগন্নাথপুরের চাইতে ভিন্ন কিছু হওয়ার বাস্তবতা নেই। বস্তুত বাঁধের কাজটি এখন যে আমলাতান্ত্রিক ঘেরাটোপের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং পিআইসি’র লোক বাছাই নিয়ে যে ধরণের সুবিধা দেয়া-নেয়ার হিসাব করা হচ্ছে সেখানে এরকম ঢিলেঢালা অবস্থাই স্বাভাবিক। বাঁধ নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষের এমন ঢিলেঢালা মনোভাবের বড় উৎস হলÑ প্রচলিত ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর হাওরাঞ্চলে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি। বড় বন্যা হয়নি। পাহাড়ি ঢল নামেনি। আকষ্মিক বন্যায় হাওর তলিয়ে যায়নি। গত ৪ বছরের অনুকূল প্রাকৃতিক সুবিধার মধ্যে বাঁধের কাজ কোথায় কেমন হয়েছে তা আর হিসাব মিলানোর তেমন প্রয়োজন পড়েনি। মূলত কৃষকের জমির ফলন্ত ধান ক্ষতিগ্রস্ত না হলে বাঁধের কাজ কতটা হল আর কতটা হল না সে নিয়ে তাদের মাথা ব্যথার দরকার হয় না। তবে অন্যান্য বছর যেমন প্রকৃতি সহায় ছিল তা প্রতিবছরই অব্যাহত থাকবে এমন কোন কথা নয়। বরং প্রতিবছরই প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হবে এমন ঝুঁকি মোকাবিলার জন্যই বাঁধের জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেন।
বাঁধের কাজ সময় মত শুরু করতে না পারার পিছনে মূলত স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দায়ই বেশি। কারণ বাঁধের জন্য পূর্বপ্রস্তুতির বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করা আছে। এই কাজগুলোর মধ্যে শুধু প্রিওয়ার্ক এস্টিমেশনের কাজটি হাওরের পানি নামার সাথে সম্পর্কিত। এই কাজ ছাড়া অন্যান্য কাজগুলো যথাসময়েই শেষ করা যায়। বাঁধ এলাকায় গণশুনানি গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের নিয়ে পিআইসি গঠন করার কথা। সরকার বরাদ্দ দিতেও দেরি করেননি। তাহলে কেন পিআইসি গঠনের মত মৌলিক ও জরুরি কাজটি এখনও শেষ করা যায়নি? পিআইসি’র সভ্পাতি-সম্পাদক নির্ধারণে এখন অনেক জায়গায় রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের একটি খবর উচ্চারিত হয়। এস্টিমেট পর্যায়ে একদিকে প্রয়োজনের বাইরে যেমন প্রকল্প প্রণয়ন করা হয় তেমনি প্রয়োজনীয় বাঁধেও প্রয়োজনের চাইতে বেশি মাটির হিসাব ধরা হয়। উচ্চ প্রাক্কলনের ফলে বাঁধের কাজটি হয়ে উঠেছে লাভের বিষয়। পিআইসির কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্তিতে এর প্রভাব পড়ে। পছন্দের ব্যক্তিদের পিআইসিতে রাখতে পারলে উদ্বৃত্ত ভাগাভাগি করতে সুবিধা হয়। এই কারণে পিআইসির কর্মকর্তা হওয়ার জন্য এক ধরণের প্রতিযোগিতাও দেখা যায়। কাজের বিলম্বের জন্য এমন পরিস্থিতিও যে দায়ী তা বলা যায়।
তবে শেষ কথা হলো বোরো ধানের ঝুঁকি নিয়ে যেকোন ধরনের গাফিলতি এই এলাকার মানুষ ভালভাবে গ্রহণ করবে না। ২০১৭ সনের ইতিহাস এর বড় প্রমাণ। দেরিতে কাজ শুরু করলে কাজটি শেষ করা নিয়ে প্রচ- তাড়াহুড়ো দেখা দেয়। তখন কাজের যথাযথ মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়। তাই আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানাই আপনারা জেলার খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান উৎস বোরো ফসলের ঝুঁকি মুক্ত করার জন্য আর দেরি না করে বাঁধের কাজ দ্রুত শুরু করুন। পিআইসিতে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পরিবর্তে এলাকার প্রকৃত কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আর শুরু হওয়ার পর কাজটি যাতে মানসম্মতভাবে নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় তা নিশ্চিত করুন। মনে রাখতে হবে, কাঁধের কাজে যেকোন গাফিলতির ফল হতে পারে ভয়াবহ।