- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://sunamganjerkhobor.com -

বাঁধের কাজে ঢিলেঢালা তদারকি- পিআইসি পদ্ধতিকে কেউ কি বিতর্কিত করতে চাইছে ?

হাওর বাঁচাও আন্দোলন সংগঠনের পক্ষ থেকে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করা হয়েছে, হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ ৫০-৫৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধের কাজ শেষ করার নির্ধারিত তারিখ থাকলেও এর দুই সপ্তাহ গত হওয়ার পরও গণমাধ্যমে বিভিন্ন বাঁধের কাজ শেষ না হওয়া নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়, জামালগঞ্জের অনেক বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। একই অবস্থা জেলার প্রায় সর্বত্র। এবার বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এবার যেন অনেকটা গা ছাড়া ভাব নিয়ে বাঁধের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। তদারকি কম বলেই অনুমিত হয়। গতবছর বা এর আগের বছর যেখানে দৈনিকই জোরদার তদারকি ব্যবস্থা চালু ছিলো সেই তুলনায় এবারের তদারকি বেশ দুর্বল বলা চলে। অথচ এবছর অন্যন্য যেকোনো বছরের চাইতে প্রকল্প সংখ্যা ও বরাদ্দের পরিমাণ বেশি। অনেকেই বলে থাকেন, গতবছর মোটামোটি ভাল মানের কাজ হওয়ায় অনেক বাঁধই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কম। এসব কম ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ছোটখাট মেরামতের মাধ্যমেই কার্যক্ষম করা যেতো। এই বিবেচনায় এবছর বাঁধের প্রকল্প ও বরাদ্দ বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। অথচ বাস্তবে এটি হয়েছে। কেন ? এর উত্তরে অনেকেই বলেন, এবার রাজনৈতিক মদদপুষ্ট পিআইসি হয়েছে বেশি। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের নামে কিংবা প্রয়োজনাতিরিক্ত বরাদ্দের টাকা নয়-ছয় হওয়ার আশংকা বেশি। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, এবারের ঢিলেঢালা তদারকি ব্যবস্থা গণমুখী পিআইসি ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার একটি সচেতন ও পরিকল্পিত প্রয়াস। শেষমেষ যদি পিআইসিগুলোকেও পূর্বের ঠিকাদারি প্রথার মতো দুর্নীতিপ্রবণ ও অকর্মন্য প্রমাণ করা যায় তাহলে এই গণমুখী পদ্ধতি নিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনার উদ্রেক হবে। বিষয়টি সত্যিই ভাববার মত। কারণ ২০১৭ সনের দুর্নীতিপ্রবণ ঠিকাদারি প্রথার কারণে হাওরডুবি ও ফসল ক্ষতির যে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছিলো, তার প্রেক্ষিতে প্রবল জনমতের চাপে সরকার ঠিকাদারি প্রথা অবলোপন করে শতভাগ পিআইসি পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। এতে অনেকের স্বার্থে আঘাত লাগে। সাবেক সুবিধাভোগী ঠিকাদার থেকে শুরু করে পাউবো পর্যন্ত সকলেই পিআইসি পদ্ধতিকে অকার্যকর প্রমাণ করার চেষ্টায় নিয়োজিত বলে লোকমুখে ব্যাপক কথা চালাচালি হয়। এছাড়া এবার রাজনৈতিক মদদপুষ্ট কিছু ব্যক্তি বাঁধের পিআইসিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আখের গোছানোর ধান্দায় লিপ্ত রয়েছেন বলেও কথা আছে। সুতরাং সবকিছু মিলিয়ে এবার হাওরপাড়ের কৃষক ও সাধারণ মানুষ বেশ শংকিত রয়েছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা মেঘ-বৃষ্টি শুরু হওয়ার মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। জেলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এমন যে, টানা দিন কয়েক পাহাড় ও সমতলে বৃষ্টি হলে হাওর ডুবির পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্যই ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাঁধের কাজ শেষ করার সময়সীমা ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এই সময়ে কাজ শেষ না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। বোরো ফসল চাষীদের মনের মধ্যে অজানা আশংকা শুরু হয়েছে। তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর সৃষ্টিকর্তার নাম জপ করেন যাতে কোনো দুর্যোগ না ঘটে। কৃষকের এমন ভাগ্যনির্ভর অনিশ্চয়তা কাটাতে সরকার যেখানে কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন সেখানে সেটি যদি ভরসার কারণ না হয় তাহলে সেই ব্যর্থতা বাঁ^ধ নির্মাণের সাথে জড়িত সকল পক্ষের। পিআইসি, পাউবো, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি; কেউ এই দায় এড়াতে পারেন না। আমরা চাই না কেউ ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিন। আমরা চাই আমাদের সোনাফলা হাওরগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাক। কারও উপর দায় চাপিয়ে ফসল হারানোর কোনো ক্ষতি পোষানো যাবে না।
হাওরপাড়ের কৃষকরা চান না পুরনো ঠিকাদারি প্রথা আবার ফিরে আসুক। তারা চান পিআইসি ব্যবস্থাকে আরও গণমুখী করা হোক। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট বা অন্যকোন প্রভাবাশ্রিত নয়, প্রকৃত সুফলভোগীদের নিয়ে পিআইসি ব্যবস্থাটি অধিকতর কার্যকরী হয়ে উঠুক এই কামনা সকলের।

  • [১]