বাঁধের কাজ এবার ১৫ দিন পিছিয়েছে/ উদ্বিগ্ন লাখো কৃষক, প্রতিবাদে মানববন্ধন

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ এবার ১৫ দিন পিছিয়েছে। এই অবস্থায় উদ্বিগ্ন সুনামগঞ্জের লাখো কৃষক। কৃষকরা বলেছেন, বাঁধের কাজে গুরুত্ব না বাড়ালে বিপদে পড়বেন তারা।
জেলা হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি এই পর্যন্ত (সোমবার পর্যন্ত) ১০৮৯ টি বাঁধের কাজের অনুমোদন দিয়েছে। এরমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে ৫৫০ টি। এই ৫৫০ টির মধ্যে ১০০’এর বেশি বাঁধে অফিসিয়েলি কেবল কাজ শুরু হয়েছে দেখানো হয়েছে, বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয় নি।
নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে হাওরের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে বাঁধের কাজ শুরু হবার কথা। বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রত্যেক প্রকল্পের জন্য সাত সদস্যের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করতে হয়। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট হাওরের সুবিধাভোগী তিন কৃষক, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রাথমিক অথবা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা অন্য কোন শিক্ষক, স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য করার নির্দেশনা রয়েছে। কমিটির দুই জনকে সভাপতি ও সদস্য সচিব নির্বাচন করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পালন করবেন।
গেল বছর সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ৪৮ টি হাওর এবং অন্যান্য ছয়টি অঞ্চলের জন্য ৭২৭ টি বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এজন্য পিআইসি গঠন হয় ৭২৭ টি। এসব পিআইসি গঠন নিয়ে নানা কথা ওঠেছিল। পিআইসি গঠন নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও ছিল কোন কোন এলাকায়। সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষককে যুক্ত না করে অন্য এলাকার কৃষককে দিয়ে বাঁধের কাজ করানোসহ অপেক্ষাকৃত দুর্বল কৃষককে কমিটিতে রেখে নেপথ্যে প্রভাবশালীদের বাঁধ ব্যবসা করার অভিযোগ ছিল হাওরজুড়েই। এসব অভিযোগ সবচেয়ে বেশি ছিল ধর্মপাশা উপজেলায়। এবার পুরো জেলায় ১০৮৯ টি প্রকল্পে ২০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেবার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পর্যন্ত বরাদ্দ হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। অর্থ ছাড় হয়েছে ২৫ কোটি টাকা।
হাওরে সময়মত ফসলরক্ষা বাঁধ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ কৃষকসহ স্থানীয়ভাবে গঠিত হাওরের কৃষক সংগঠনগুলোও।
তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরপাড়ের বড়দল নতুন হাটির কৃষক আব্দুল্লাহ্ বললেন, ‘৩০ কেয়ার (১০ একর) জমিন (জমি) কইরা (করেছি) অখন (এখন) ঘুমে ধরেরনা (ধরছে না), ক্ষেত থাকবো কি-না, অন্যবার (অন্যবছর) ই-সময় (এই সময়) বাঁধ অইযায় (হয়ে যায়), ইবার (এই বছর) অখনো (এখনো) কামঔ আরম্ভ (শুরু) অইছে না (হয় নি)।’
তিনি জানালেন, আরও এক মাস আগে এই বাঁধের আশপাশ থেকে পানি নেমেছে। ইচ্ছে করলে জানুয়ারির প্রথম দিকেই কাজ শুরু করা যেত। এই কৃষক জানান, ফেব্রুয়ারি’র শেষ সপ্তাহেই পাহাড়ী ঢল নামার আশংকা থাকে। পাহাড়ি ঢল ফিরোজপুরের শেষ প্রান্ত দিয়ে পাতারগাঁও হয়ে দরুন গ্রামের পাশের বাঁধ ভেঙে পাঁচনালিয়া বাঁধ ভেঙে কপালপুড়ে মাটিয়ান হাওরপাড়ের লাখো কৃষকের। অথচ. এখনো বুরুঙ্গা নদীর বাঁধ, নতুন হাটির স্কুলের পাশের খালে কাজ শুরু হয় নি। বড়দল নতুন হাটির কৃষক তোফায়েল আহমদও তার বক্তব্য সমর্থন করলেন।
জামালগঞ্জ উপজলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ বললেন, উপজেলার পাগনার হাওরের ১৮ টি বাঁধের মধ্যে ছয়টিতে কাজ শুরু হয়েছে। ১০-১২ টিতে এখনো সাইনবোর্ড-ই লাগানো হয় নি। হালির হাওরেও একই অবস্থা। উপজেলার ৫৯ টি বাঁধের মধ্যে ৩০ টির কাজও বাস্তবে শুরু হয় নি।
তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরের পাচ নালিয়া ক্লোজারে (ভাঙনে) বাঁধ করার জন্য তিনটি পিআইসিকে প্রায় ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই পিআইসিগুলো সোমবার পর্যন্ত কেবল ভাঙনে সামান্য কিছু বাঁশ পুতে কাজ শুরু করেছে দেখাচ্ছে।
এই বাঁধের পিআইসি সভাপতি সাঞ্জব উস্তার জানালেন, গত বছরও তিনি এই বাঁধের পিআইসি সভাপতি ছিলেন। কাজ শুরু করেছিলেন ১০ জানুয়ারি। এই বছর তার দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ পিআইসি নিয়ে রশি টানাটানিতে কার্যাদেশ দিতে বিলম্ব হয়েছে। আওয়ামী লীগের কোন নেতার জন্য বিলম্ব হয়েছে, জানতে চাইলে সাঞ্জব বললেন, আমি এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত, নাম বলে আরও ক্ষতির মুখে পড়তে চাই না।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বললেন, ১০৮৯ টি হাওররক্ষা বাঁধের প্রকল্প জেলা কমিটিতে অনুমোদন হয়েছে। এরমধ্যে ৫৫০ টি পিআইসি কাজ শুরু করেছে। অন্যগুলো কেন শুরু হলো না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, পিআইসি পেতে বিলম্ব হয়েছে। কেন বিলম্ব হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন।
এদিকে, হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ সময়মতো শুরু না করার প্রতিবাদে এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার দাবিতে মানববন্ধন করেছে হাওর বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি। সোমবার বেলা ১১ টায় শহরের আলফাত স্কয়ারে এই মানববন্ধন হয়।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি ইয়াকুব বখত বহলুলের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়, সাংগঠনিক সম্পাদক একে কুদরত পাশা, দপ্তর সম্পাদক দুলাল মিয়া, সদস্য রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু প্রমুখ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হবার কথা। কিন্তু ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত অধিকাংশ হাওরে কাজ শুরুই হয় নি। এমনকি কোথাও কোথাও পিআইসি গঠনও হয় নি। কৃষকদের ফসল রক্ষা করার কোনো চিন্তা নেই দায়িত্বশীলদের, কিভাবে টাকা লুটপাট করে নেয়া যায় সেই চিন্তা পাউবো কর্মকর্তাদের। তাদের এই অনিয়ম কৃষকদের নিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন রোববার বিশ^ম্ভরপুর ও তাহিরপুরের কয়েকটি হাওররক্ষা বাঁধে গিয়েছেন। সোমবার বাঁধের কাজ সময়মত শুরু না হওয়া এবং পিআইসি গঠনে বিলম্ব হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বললেন, কৃষকের ফসলরক্ষার জন্য বর্তমান সরকারই সবচেয়ে বেশি কাজ করছে। শত কোটি টাকা বাঁধের কাজ করার জন্য সরকার বরাদ্দ দিচ্ছে। বাঁধের কাজে বিলম্ব, অনিয়ম, গাফিলতি করলে কাউকেই ক্ষমা করা হবে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার এসব অভিযোগের জবাবে বলেন, পিআইসি গঠনে শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ড যুক্ত নয়, এখানে সরকারের সকল শাখা যুক্ত। আমরা নীতিমাল অনুযায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ করছি।