বাঁধ ব্যবসায় সরকার দলীয় কিছু নেতা!

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও মধ্যনগর) আসনে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ যে কোনভাবে বাগিয়ে নেবার চেষ্টা করছেন সরকারদলীয় কিছু নেতারা। এ কারণে কোন কোন হাওর রক্ষা বাঁধে পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) ঘোষণা এবং বাঁধের কাজ শুরু করতেও বিলম্ব হচ্ছে। জেলায় বাঁধের কাজে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলা। অথচ. দুটি উপজেলাই হাওরাঞ্চলের বড় উপজেলা হিসাবে পরিচিত। তাহিরপুরে অর্ধেক ফসল রক্ষা বাঁধের কাজও শুরু হয় নি। ধর্মপাশায়ও ধীর গতি।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের একটি উপজেলায় দায়িত্ব পালনকারী একজন পাউবো প্রকৌশলী (নাম না ছাপানোর অনুরোধ করেছেন) বললেন, এমপি সাহেব, সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সবাই কৃষকের নাম দিয়ে বলছেন, ‘আমার এই কৃষককে পিআইসির সভাপতি করতে হবে।’ একজনের কথা শুনলে, আরেকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে পারলে মারতে আসেন। সুপারিশকারীদের কেউ কেউ পিআইসি পাইয়ে দিতে টাকা লেনদেন করছেন এমন অভিযোগও শুনা যাচ্ছে। আবার এমনও আছে, কৃষককে সামনে রেখে তারা নিজেরাই বাঁধ ব্যবসা করতে এসেছেন এমনটাও শুনা যাচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলা হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী শওকতুজ্জামান কে মঙ্গলবার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক শফিকুল ইসলাম অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন জানিয়ে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট মৌখিকভাবে নালিশ করেছেন।
শওকতুজ্জামান এই প্রতিবেদককে বললেন, আমাকে কোন কারণ ছাড়াই অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেছেন শফিকুল ইসলাম। বিষয়টি আমি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। তিনি আমার বিরুদ্ধে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ আনেন, অনৈতিক লেনদেন দূরে থাক, এক কাপ চা খেতেও হিসাব করি আমরা।
উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বললেন, কাজে বিলম্ব হওয়ায় রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করছেন বাঁধ নির্মাণ কাজের দায়িত্বশীলরা। অথচ. তাহিরপুরের পাউবো প্রকৌশলী শওকতুজ্জামানের মাধ্যমে টাকা নিয়ে পিআইসিতে নাম যুক্ত করা হচ্ছে, নাম কাটা হচ্ছে। প্রতি পিআইসিতে দুই-তিন লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমি প্রকৌশলীর সঙ্গে কোন কথাই বলিনি।
তিনি বললেন, বাঁধের কাজ ১৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবার কথা, এখন পর্যন্ত (বুধবার পর্যন্ত) ১১২ বাঁধের মাত্র ৪৮টিতে কাজ শুরু হয়েছে। এবার এই আসনের বড় বড় হাওর অরক্ষিত থাকার আশংকা আছে। এসব কথা মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলতে গিয়েছিলাম। তিনি উল্টো আমার উপর রেগে গেলেন।
এই উপজেলার আরেক রাজনীতিবিদ (নাম বলতে চান নি) বললেন, সংসদ সদস্যের শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় স্বজনসহ কমপক্ষে ৩০টি পিআইসি তাঁর (সংসদ সদস্যের) পছন্দের মানুষকে দিয়ে করানো হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হোসেন খান ও সাধারণ সম্পাদক অমল কর পিআইসি দেবার জন্য বড় একটি তালিকায় স্বাক্ষর করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দিয়েছেন। এমন টানাপোড়নেই বাঁধের পিআইসি গঠন ও কাজ শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অমল কর বললেন, আমি দেশেই ছিলাম না। হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ নিশ্চিতের জন্য সংগঠনের উপজেলা সভাপতি কিছু পিআইসির জন্য সুপারিশ করলে অপরাধের কিছু মনে করছি না।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুপ্রভাত চাকমা বললেন, এমপি সাহেব হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মনিটরিং কমিটির উপদেষ্টা। এজন্য তাঁর কিছু পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। অন্যরাও কিছু সুপারিশ করেছেন। আমরা সবকিছু দেখে ভালো কৃষককে যুক্ত করার চেষ্টা করেছি। এজন্য সামান্য কিছু বিলম্ব হয়েছে। দু’এক দিনের মধ্যে কাজ শুরু হবে। একই অবস্থা ধর্মপাশা উপজেলায়ও। ওখানেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আছে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিসসহ সরকার দলীয় চারজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সংসদ সদস্যের পক্ষে পিআইসির তালিকা দেখভাল করছেন বলে দলের কার্যনির্বাহী কমিটির দায়িত্বশীলরাই গণমাধ্যম কর্মীদের বলেছেন।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ বললেন, গেলবছরও বাঁধের কাজের সময় পিআইসি করিয়ে দিয়ে প্রতি পিআইসি থেকে এক থেকে তিন লাখ টাকা নিয়েছে একটি সি-িকেট। এবারও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিস এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাই ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুকনের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট কাজ করছে।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিস বলেছেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমি বাঁধের কাজে কোন কৃষকের নাম দিয়ে সুপারিশ করি নি। কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান কৃষকদের আবেদন বেশি হওয়ায় যাচাই করার দায়িত্ব পালন করেছেন। নীতিমালায় ইউপি চেয়ারম্যানগণ কৃষক যাচাই করবেন এমন কথা উল্লেখ নেই জানালে, তিনি বললেন, তারা কেবল সহযোগিতা করছেন।
ধর্মপাশা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুকন বললেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা না থাকায় বাঁধের কাজ কিছুটা পিছিয়েছিল। দ্ইুদিন আগে নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যোগদান করেছেন। এখন দ্রুতই কাজ হবে। নীতিমালা মোতাবেক প্রকৃত কৃষকরাই পিআইসিতে যুক্ত হয়েছে দাবি করে রুকন বললেন, এখানে কেউ সি-িকেট করে অর্থ আদায় করছে বলে আমার জানা নেই।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বললেন, নীতিমালায় কৃষক যাচাইয়ের দায়িত্ব ইউপি চেয়ারম্যানদেরকে দেওয়া হয় নি। এটি উপজেলা কমিটির কাজ। তিনি জানালেন, বুধবার পর্যন্ত তাহিরপুরের ১১২টি বাঁধের মধ্যে ৪৮ টি এবং ধর্মপাশার ৫৮ বাঁধের মধ্যে ৫৫টিতে কাজ শুরু হয়েছে।
সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন তার নির্বাচনী এলাকায় বাঁধের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হবার বিষয়টি স্বীকার করে বললেন, আমার কোন আত্মীয় স্বজন বাঁধের কাজে যুক্ত হয় নি। তাহিরপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তাকে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক গালিগালাজ করেছেন এমন অভিযোগ আমার কাছেও এসেছে। উপজেলায় দলের সভাপতি বা সম্পাদক ভালো কৃষককে পিআইসিতে যুক্ত করার অনুরোধ জানিয়ে থাকলে দোষের কিছু দেখছি না। তাহিরপুরের আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম কর্তৃক পাউবো প্রকৌশলীকে গালিগালাজ করার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ইমনকেও দোষারোপ করলেন তিনি।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবির ইমন বললেন, নীতিমালা মোতাবেক বাঁধের পিআইসি হচ্ছে কি-না সেটি যেমন দেখা জরুরি। কমিটি কাজ সঠিকভাবে করছে কি-না সেটি পর্যবেক্ষণও জরুরি। বাঁধের কাজে দায়িত্বশীলদের গালিগালাজ করার জন্য আমি কাউকে উৎসাহিত করিনি। পিআইসি কোন কৃষককে দিয়ে করা হবে সেটি দলের নেতাদের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট কমিটি দেখবে।
প্রসঙ্গত. এবার সুনামগঞ্জের পুরো জেলায় ৪৮টি বড় হাওরে ১০৮৯ টি প্রকল্পে ২০৫ কোটি টাকা বাঁধের কাজে বরাদ্দ দেবার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পর্যন্ত বরাদ্দ হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। অর্থ ছাড় হয়েছে ২৫ কোটি টাকা।