বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু জর্জ হ্যারিসন

রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু
সঙ্গীতের সব শাখায় বিচরণ করা জর্জ হ্যারিসন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বন্ধু। সঙ্গীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসন একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং লিড গিটাররিস্ট। বিশ্বের সাড়া জাগানো ব্যান্ডদল দ্য বিটলস এর অন্যতম লিড গিটারিস্ট ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের মেডিসিন স্কয়ার গার্ডেনে জজ হ্যারিসন আয়োজন করেন সঙ্গীতানুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের নাম ছিল কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। জজ হ্যারিসনের সঙ্গি ছিলেন পন্ডিত রবিশঙ্কর, শিল্পী লিওন রাসেল, শিল্পী রিঙ্গো স্টার শিল্পী বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রিস্টন প্রমুখ।
জজ হ্যারিসনের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাজ্যর লিভারপুলের ওয়ার্ভাটরিতে জন্মগ্রহণকারী হ্যারিসনের পিতার নাম হ্যারল্ড হারগ্রিভস হ্যারিসন এবং মাতার নাম লুইস। চার সন্তানের মধ্যে জর্জ হ্যারিসন ছিলেন সবার ছোট। তার পিতা হ্যারল্ড ছিলেন বাসের কন্ডাক্টর। এবং মাতা লুইস একটি ভেরাইটিস দোকানের সেলস গার্ল ছিলেন। হ্যারিসনের বাবা এবং মা দু’জনই সঙ্গীতের ভক্ত ছিলেন। তার মায়ের স্বপ্ন ছিল হ্যারিসন যেন একজন ভালো শিল্পী হতে পারে। জর্জ হ্যারিসনে জীবনী লেখক জোশুয়া গ্রিন তার গ্রন্থে লিখেছেন হ্যারিসন সাপ্তাহিক বন্ধের দিন অর্থাৎ প্রতি রোববার তিনি সেতার এবং তবলার দ্বারা অদ্ভুত রহস্যময় শব্দগুলোর সুর করতেন। এই আশায় যে, বহিরাগত সঙ্গীতটি গর্ভের সন্তানের মধ্যে শান্তি ও শান্তি বয়ে আনবে।
১৯৪৯ সালে ৫ বছর বয়সে হ্যারিসন ডোভডালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে ১৫ বছর বয়সে লিভারপুর ইনস্টিটিউট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় আপ্ত সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এই ইনস্টিটিউট এর একটি সঙ্গীত কোর্সেও ভর্তি হন। তবে ইনস্টিটিউটে গিটারের অনুপস্থিতিতে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন জর্জ হ্যারিসন। হ্যারিসনের বাবা এতটাই সঙ্গীতের ভক্ত ছিলেন যে, তিনি রেডিও ইন্ডিয়াতে প্রায়ই বিভিন্ন সঙ্গীত শ্রবণ করতেন। চার ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট হ্যারিসন যাতে একজন ভালো শিল্পী হতে পারে সেটাই ছিলো সবার লক্ষ্য। হ্যারিসনের বড় ভাই পিটার তাঁকে একটি গিটার উপহার দিয়েছিলেন। ছোট বেলায় হ্যারিসন যখন উচ্চস্বরে গান গাইতেন তখন তাঁর মা তাকে উৎসাহ দিতেন। প্রচুর পরিশ্রম করে ছেলেমেয়েদের চাহিদা পূরণ করতেন। বাবা, মাসহ পরিবারের সবাই হ্যারিসনকে উৎসাহ দিতেন যাতে সে একজন ভালো শিল্পী হতে পারে। হ্যারিসনের আরেক বড় ভাই হ্যারল্ড এর মতে তাঁর মা লুইস পরিবারের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে সন্তানদের যা আশা করতেন তা পেলে মারাত্মক খুশি হতেন। মায়ের আশা-ভরসার কারণে তারা অপরাপর ৩ ভাই বোন জর্জ হ্যারিসনের পাশে দাঁড়াতেন।
জর্জ হ্যারিসন সম্পর্কে জোশুয়া গ্রিণ আরো উল্লেখ করেন, তিনি সুযোগ পেলেই বাদ্যযন্ত্র কিনতেন। তার বাবাও তাকে বাদ্যযন্ত্র কিনে দিতেন। তার বাবা তাকে ফর্ন্বি, ক্যাব কল্লোহে, জ্যান্মো রেইন হার্ট এবং হোয়াজি কিনে দিয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালের গোড়ার দিকে তিনি একটি এপিফ্যনি পেয়েছিলেন। তিনি ক্লাসে প্রাইয় পিছনের ব্রেঞ্চে বসতেন এবং পুরোপুরি গিটারে মনোনিবেশ করতেন। স্লিম হুইটম্যান ছিলেন তাঁর প্রথম স্বপ্নের গিটারিস্ট। ম্যাগাজিন এ পড়েছেন এবং টেলিভিশনে দেখেছেন স্লিম হুইটম্যানের গিটার বাজানো। জোশুয়া গ্রিণ তার বইয়ে উল্লেখ করেন, জর্জ হ্যারিসনের পিতা হ্যারল্ড সঙ্গীত ক্যারিয়ারে নিজের ছেলের আগ্রহ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবে ১৯৫৬ সালে তার পছন্দের জিনিস ডাচ ডিমের ফ্ল্যাট টপ অ্যাকোস্টিক গিটার কিনেছিলেন ছেলে জর্জ হ্যারিসনের জন্য। অত্যন্ত দামী এই গিটার কিনে দিতে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তাঁর এক বন্ধু যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় গিটারিস্টের কাছে প্রথমে তালিমের ব্যবস্থা করে দেন হ্যারিকেনকে। এক পর্যায়ে আর্থার কোলি নামক এক যুবকের সাথে তাঁর পরিচয় হয় এবং বন্ধুত্ব হয়। আর্থার কেলিও ভালো গিটার বাজাতেন। ফলে দ্রুতই তার সঙ্গে ঘনিষ্টতা হয়ে যায়।
হ্যারিসন যখন স্কুলে যাতায়াত করতেন তখন পল ম্যাক কার্টনির সাথে দেখা হয়। যিনি লিভারপুর ইনস্টিটিউটেও এসেছিলেন এবং জুটি তাদের সঙ্গীতের ভালোবাসা ভাগ করে নিয়েছিলেন। জর্জ হ্যারিসন তাঁর বড় ভাই এবং বন্ধু কোলিকে নিয়ে একটি সঙ্গীতের দল গঠন করেন। নাম দেন স্কিফ। এক পর্যায়ে ম্যাক কাটিনও দলে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে লেননের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। বিখ্যাত গিটারিস্ট লেনন, হ্যারিসনের গিটার বাজানো দেখে সন্তুষ্ট হন। ১৯৬০ সালে লেননের দ্য বিটলস এ যোগ দেন হ্যারিসন। ১৯৬৬ সালে মডেল অ্যান বয়েডের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অ্যান বয়েডের সঙ্গে কয়েক বছর পর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এর কিছু দিন পর আমেরিকার চলচ্চিত্র পরিচালক আলভিয়া ত্রিনিদাদকে তিনি বিয়ে করেন। ১৯৭১ সালে ভারতের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী পন্ডিত রবি শঙ্কর ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন যোগান। পরিকল্পনা করেন বন্ধু রবিশঙ্কর সঙ্গে কিভাবে বাঙালিদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা যায়। দুই বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নেন একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করার। অনুষ্ঠান থেকে যা আয় হবে তা বাংলাদেশিদের কাছে সহযোগিতা হিসেবে প্রেরণ করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের পক্ষে জনমতও তৈরি হবে। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট কনসার্টের আয়োজন করা হয়। কনসার্ট ফল বাংলাদেশ নামে এই অনুষ্ঠানটি দুইটি শো হয়। প্রায় ৪০ হাজার দর্শক উপস্থিত হয় এই শোতে। এই শোতে ‘বাংলাদেশ’ নামক গানসহ একাই আটটি গান পরিবেশন করেন। পুরো অনুষ্ঠানে জজ হ্যারিসন ছাড়াও পন্ডিত বরিশঙ্কর, বব ডিলান রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রেস্টন, লিওন রাসেল, আলী আকবর খাঁ, আল্লারাখা, এরিক ক্ল্যাপটন, ক্লস ভোরম্যান, জিম কেল্টনার, ব্যাড ফিঙ্গার, জেসি এন্ড ডেভিস, জন প্রিস্টন, কার্ল র্যাডলি প্রমুখ। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নামক অনুষ্ঠান থেকে প্রায় আগাই লাখ ডলার ১৯৭১ সালেই বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এভাবেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকলেন জর্জ হ্যারিসন। অসংখ্য গ্র্যামি এওয়ার্ড পাওয়া জর্জ হ্যারিসন ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর ৫৮ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।