বিকল্প হলে ফুটপাত ছাড়তে আগ্রহী ভাসমান দোকানীরা

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ পৌরশহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ভাসমান দোকানপাট। সময় যত যাচ্ছে এসব দোকানের সংখ্যা বাড়ছে। এতে শহরের প্রধান প্রধান সড়কে যানজটও বাড়ছে। সচেতনমহলের দাবি, ফুটপাতের এসব দোকানীদের বিকল্প বসার ব্যবস্থা করে জনভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা হচ্ছে পুরাতন বাসস্টেশন থেকে সুরমা মার্কেট বা স্টিমার ঘাট এলাকা। এটি আবার পৌর শহরে প্রবেশ করার অন্যতম প্রধান সড়ক। পুরাতন বাস স্টেশন থেকে সুরমা মার্কেট পর্যন্ত দূরত্ব ছয় থেকে সাতশ’ মিটার। এই সামান্য দূরত্বে সড়কের দু’পাশে গড়ে ওঠেছে কয়েকশ’ ভাসমান দোকান। এসব ভাসমান দোকানীদের অনেকেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফুটপাতেই দোকান বসান। তবে বেশিরভাগ দোকান বসে বিকাল থেকে। ভ্যানগাড়ি করে সবজি, তরকারি, মাছ বিক্রি করেন তারা। এসব দোকানের জন্য সাতশ’ মিটার সড়কে যানবাহনের ধীরগতি লেগে থাকে। এতে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই।
বিশ^ম্ভরপুরের পলাশ ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল মালেক। তিনি ভাড়ায় সিএনজি চালান। প্রায়ই উপজেলা থেকে জেলা সদর হাসপাতাল ও সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে যাত্রী নিয়ে আসতে হয় তাকে। তিনি বলেন, পুরাতন বাস স্টেশনে ঢোকার পরেই শুরু হয় থেমে থেমে গাড়ি চালানো। অনেক সময় সময় সড়ক পথ বন্ধ হয় দূরপাল্লার বড় বাসগুলোর কারণে। একেকটি বাস ওখানে এসে ঘুরাতে ১০ মিনিট করে সময় লাগে। সন্ধ্যা থেকে কমপক্ষে ২০ টি বাস এখানে এসে ঘুরিয়ে রাখে। তাতে পেছন দিকের গাড়িকে আটকে থাকতে হয়। এছাড়াও ফুটপাত দখল করে অসংখ্য দোকান বসে সড়কের দু’পাশে। এসব কারণে শহরের এই অংশে যত ভোগান্তি।
আলফাত স্কয়ার (ট্রাফিক পয়েন্ট) থেকে কাজির পয়েন্ট পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়কের দু’পাশেও ভ্যানে করে প্রতিদিন অসংখ্য ভাসমান দোকানপাট বসে। এই সড়কেও যানবাহনের ধীরগতি থাকে। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের সামনে সবজি ও বিভিন্ন মৌসুমী ফলমূলের দোকান বসে।
শহরের বাসিন্দা শিক্ষক অভিজিৎ রায় বললেন, যারা ফুটপাতে দোকান দেন তাদের বিকল্প বসার জায়গা করে দিতে হবে। অনেক মানুষ গ্রামে কাজ না পেয়ে শহরে এসে ছোটখাটো দোকান দিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন। শহর সুন্দর করতে হলে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হবে। তবে তাদের হুট করে উচ্ছেদ করা যাবে না। বিকল্প ব্যবস্থা করে উচ্ছেদ করতে হবে।
বড়পাড়ার বাসিন্দা মো. রিপন মিয়া আলফাত স্কয়ার এলাকায় ফল বিক্রি করে ৫ সদস্যের সংসার চালান। আলিফ, লাম, হামজা নামে তার তিন সন্তান রয়েছে। আলফাত স্কয়ার এলাকায় ফলমূলের দোকান দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের ব্যয়ভার কোনোমতে চালাচ্ছেন তিনি।
রিপন বললেন, ফুটপাতে দোকানদারী করেই সংসার চালাই। কয়েকদিন পরপর পুলিশ এসে ফলের দোকান তুলে দেয়, তখনই বেকায়দায় পড়ি, পড়াশোনা করিনি, এই ছোটখাটো ব্যবসা দিয়েই পরিবারের ব্যয়ভার চলছে। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচশ টাকা রোজগার হয়। তা দিয়েই সংসারে চলে। এখান থেকে ওঠে গেলে, আমার সংসার চলবে কিভাবে, ওঠাতে হলে বিকল্প ব্যবস্থা আগে করে দিতে হবে।
একই এলাকার ব্যবসায়ী দৃষ্টি পান ভান্ডার এন্ড ভেরাইটিজ স্টোরের দোকানী দেলোয়ার মিয়া। প্রতিমাসে তার দু’হাত চওড়া বিশিষ্ট দোকানের জন্য ভাড়া গুণতে হয় ৬ হাজার টাকা। দোকান ছোট হওয়ায় পান বিক্রি ছাড়া আর কিছুই বেচাকেনা করতে পারেন না তিনি। সন্ধ্যা হলেই দোকানের সামনে ফুটপাতে ডিম বেচেন তিনি। এতে দোকান ভাড়া ও পরিবারের খরচ হয়ে যায় তার।
দেলোয়ার মিয়া বললেন, ২ হাতের দোকানের জন্য মাসে ৬ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। শুধু পান বিক্রি করে দোকানের ভাড়াই হয় না। দোকানে বসে অন্য কিছু বিক্রিও করা যায় না। তাই বাধ্য হয়েই সন্ধ্যায় ফুটপাত দখল করে ডিম বিক্রি করি।
ওয়েজখালীর বাসিন্দা ফলের বাজারের ব্যবসায়ী মিনার আলী (৫৫) বললেন, ৩০ বছর ধরে ভাসমান দোকান দিয়ে ফলমূলের ব্যবসা করছি। ছেলে মেয়েসহ ৯ জনের পরিবার চলে আমার আয়ের উপর। জায়গা না পেয়েই সড়কের উপর দোকান দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের জন্য নিদিষ্ট জায়গায় দোকান করে দিতো, তাহলে সড়কের উপর আর বসতে হতো না। এতে শহরও সুন্দর হতো আমাদেরও প্রতিদিনের ভোগান্তি শেষ হতো।
নিরাপদ সড়ক চাই সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি মহিম তালুকদার বলেন, আমরা ফুটপাতের দোকানীদের অন্যত্র যাওয়ার জন্য ক্যাম্পেইন করেছি। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তিনি বলেন, ৫ বছর আগেও ফুটপাতে এতো দোকান ছিলো না। দিনদিন মানুষ বাড়ছে, সেই সঙ্গে ফুটপাত দখল বাড়ছে। পৌরসভা এখনই এসব দোকানীদের উচ্ছেদ না করলে, পরে ঝামেলায় পড়তে হবে। তবে এসব দোকানীদের আগে বসার বিকল্প ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এই প্রক্রিয়া ছাড়া সুন্দর পৌরশহরের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী কালি কৃষ্ণ পাল বললেন, ফুটপাতের ভাসমান দোকানীদের শহরের একটি নিদিষ্ট এলাকায় নেয়ার জন্য আমরা ভাবছি। এরকম হলে ভাসমান দোকানীরাও একটা স্থান পাবে, শহরের পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরবে।
পৌর মেয়র বললেন, শহরের যানজটের প্রধান কারণ ফুটপাতের মধ্যে দোকানপাট। সড়কের উপর দোকানপাট দেয়ার কোনো আইন নেই। এগুলো সামাজিকভাবে সবাইকে বয়কট করতে হবে। অনেক জায়গায় দোকানপাটের ব্যবস্থা রয়েছে। যারা ব্যবসা করতে চান সেসব এলাকায় দোকানঘর ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করতে হবে। আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাদেরকে স্থানান্তরের চেষ্টা করলেও উনাদের উচিত নিজেরাই ফুটপাত মুক্ত করে অন্যত্র চলে যাওয়া।