বিদ্যুৎ ভোগান্তি চরমে

বিশেষ প্রতিনিধি
বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগহীনতায় সুনামগঞ্জের দুটি অঞ্চলের ৯ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহককে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। রোববার ভোর ৬ টা থেকে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত এসব অঞ্চলে ৩ থেকে ৫ বার বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করেছে। সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরের বাসিন্দা পারভেজ আহমদ বললেন,‘সরকার প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র করেছে, আমরা জেনেছি বিদ্যুতের ঘাটতি এই জেলায় নেই। সামান্য মেইন্টেনেন্সের কাজের জন্য দিনে কতবার যে বিদ্যুৎ যাওয়া আসে করে, হিসাব নেই, সুনামগঞ্জ শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দুরের গ্রামগুলোতে এক ফিডারে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। এই কারণে বিদ্যুৎ যন্ত্রণা উপকেন্দ্র হবার পরেও শেষ হয় নি। মানুষ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের আশানুরুপ সুফল ভোগ করতে পারছে না। বিষয়টি সরকারের দায়িত্বশীল মহলের জানা জরুরি।’
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)’এর জেলা সহসভাপতি অ্যাডভোকেট খলিল রহমান বললেন, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের খেলার ২২ মিনিটের মাথা থেকে ৫ বার বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করেছে। আমি শহরের মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা, আমরা আগে থেকেই বিদ্যুৎ বিভাগকে খেলার সময় যাতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকে অনুরোধ করেছিলাম, কোন লাভ হয় নি। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ট মানুষ। শহরের ষোলঘর এলাকার রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে থেকে হাওরের উপর দিয়ে আরেক উপজেলার আমবাড়ি পর্যন্ত এক ফিডারে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। এখানে কিভাবে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ আশা করা যায়। হাওরের উপর দিয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে শহরের ফিডার থেকে বিদ্যুৎ যাওয়ায় এমন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ১০ বছর আগে আমরা আবেদন করেছি বনানীপাড়া, বিলপাড়, আলীপাড়া, মোহাম্মদপুর, মাইজবাড়ি পর্যন্ত আলাদা ফিডার করতে। বিদ্যুৎ বিভাগ উদ্যোগও নিয়েছিল, কিন্তু ১০ বছর ধরেই হবে-হচ্ছে শুনছি, এভাবে যন্ত্রণা থাকলে ২০০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র মানুষের কি উপকারে আসলো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জে বিদ্যুতের কোন সংকট নেই। সুনামগঞ্জবাসীকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দেবার জন্য সুনামগঞ্জ শহরতলির ওয়েজখালিতে (ইকবাল নগরের পাশে) পাওয়ার গ্রীড স্টেশনের কাজ শেষ হয় ২০১৮ সালের মার্চ মাসে। মে মাসের ৩ তারিখ থেকে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন শুরু হয়। সুনামগঞ্জ শহর এবং দিরাই-শাল্লার প্রায় ৩০ হাজার গ্রাহক এরপর থেকে বিদ্যুৎ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
সাবস্টেশন থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন শুরু হবার পর ১৩২ কিলোভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন সম্ভব হচ্ছে। লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজ সমস্যা কমেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা যন্ত্রণা কমেনি।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সামান্য সংস্কার কাজের জন্য শহরের বনানীপাড়া, আলীপাড়া, মোহাম্মদপুর, নবীনগর, মাইজবাড়ি এলাকা এবং হাজীপাড়া, পূর্ব পশ্চিম-উত্তর দক্ষিণ নতুনপাড়া, বাঁধনপাড়া, শহীদ আবুল হোসেন রোড, শান্তিবাগ, হাসননগর, নতুন হাছননগর, আপ্তাবনগর ও সুলতানপুর এলাকার মানুষ পৌরসভার বাসিন্দা হলেও শহরের বিদ্যুৎ সুবিধা পান না তারা।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ৩০ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে ফিডার ব্যবহার করছে ৬ টি। ফিডারগুলো হচ্ছে, পশ্চিম হাজীপাড়ার বিদ্যুৎ অফিস থেকে ষোলঘর রামকৃষ্ণ মিশন পর্যন্ত, এই ফিডারকে বলা হয় থানা ফিডার। বিদ্যুৎ অফিস থেকে মল্লিকপুর, ওয়েজখালী হয়ে জলিলপুর পর্যন্ত, এই ফিডার মল্লিকপুর ফিডার। হালুয়ারগাঁও কারাগারের সামনা থেকে দিরাই সড়ক মোড় পর্যন্ত হচ্ছে দিরাই ফিডার। পশ্চিম হাজীপাড়া অফিস থেকে বড়পাড়া, তেঘরিয়া, আরপিননগর, জেলরোড, পশ্চিম বাজার, মাছবাজার ফিডার, এই ফিডারকে বলা হয় বড়পাড়া ফিডার।
সবচেয়ে বড় দুটি ফিডার হচ্ছে পশ্চিম হাজীপাড়ার বিদ্যুৎ অফিস থেকে হাজীপাড়া, পূর্ব পশ্চিম-উত্তর দক্ষিণ নতুন পাড়া, বাঁধনপাড়া, শহীদ আবুল হোসেন রোড, শান্তিবাগ, হাসননগর, নতুন হাছননগর, আপ্তাবনগর ও সুলতানপুর হয়ে পৌরসভার বাইরের বুড়িস্থল হয়ে বেতগঞ্জ পর্যন্ত অন্তত ১০ টি গ্রামের ফিডার, এই ফিডারকে বলা হয় বেতগঞ্জ ফিডার। দীর্ঘ এই ফিডার থেকে চার হাজার দুইশ’ বিদ্যুৎ গ্রাহক সংযোগ নিয়েছেন। ঠিক একইভাবে শহরের বনানীপাড়া, আলীপাড়া, মোহাম্মদপুর, নবীনগর, মাইজবাড়ি, বদিপুর এলাকা হয়ে পৌরসভার বাইরের আরও কয়েকটি গ্রাম হয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলার আমবাড়ি পর্যন্ত যাওয়া বিদ্যুৎ লাইন থেকে চার হাজার আটশ’ গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মচারী বললেন, বেতগঞ্জ ও আমবাড়ি ফিডারের গ্রাহকরা বিদ্যুৎ ভোগান্তিতে থাকারই কথা। ১০-১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দুই বিদ্যুৎ ফিডার থেকে কয়েক হাজার মানুষ সংযোগ নিয়েছেন। গ্রাহকের এমনও সংযোগ আছে, দীর্ঘ লাইন বাঁশের খুঁটি দিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঝড়ো হাওয়া বা বৃষ্টিতে একজনের সমস্যা হলে পুরো লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। একটি স্থানে বাঁশ বা গাছের ডাল পড়লে সকলকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
শহরের শহীদ আবুল হোসেন রোডের বাসিন্দা বাবুল চৌধুরী বললেন, বেতগঞ্জ ফিডারে সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বসবাস। অথচ. কথায় কথায় এখানে বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করে। সামান্য বৃষ্টি বা ঝড়ো হাওয়া হলেই বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র হবার পর এমন যন্ত্রণা থাকবে না ভেবেছিলাম আমরা। কিন্তু সামান্য কাজের জন্য যন্ত্রণা রয়েই গেল।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান বললেন, বেতগঞ্জ ফিডারকে দুই ভাগে (ডুয়েল সোর্স) ভাগ করার কাজ চলছে। জুনের মধ্যেই এই কাজ শেষ হবার কথা ছিল। দীর্ঘ লাইন থাকায় বেতগঞ্জ ও আমবাড়ি ফিডারের গ্রাহকরা অন্য ফিডারের মতো নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না স্বীকার করে তিনি বলেন, বিদ্যুতের কোন অভাব আমাদের নেই। আমরা লোড শেডিং করছি না। ডুয়েল সোর্স’এর কাজ করতে গিয়ে মাঝে মাঝে সাটডাউন দিতে হয়। আবার বাতাস বা বৃষ্টি হলেই দীর্ঘ লাইনের কোথাও গাছের ডাল বা অন্য কোন সমস্যায় সাট ডাউন হয়। লাইনের কাজ নতুন করে হলেই, হাজীপাড়া, পূর্ব পশ্চিম-উত্তর দক্ষিণ নতুন পাড়া, বাঁধনপাড়া, শহীদ আবুল হোসেন রোড, শান্তিবাগ, হাসননগর, নতুন হাছননগর, আপ্তাবনগর ও সুলতানপুর এলাকার মানুষের যন্ত্রণা কমে যাবে। আমবাড়ির বিদ্যুৎ ফিডার বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প সিলেট’এর আওতাভুক্ত হওয়ায় এই কাজ আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এটি করতে হবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প সিলেট অফিসকেই। আমরা তাগাদা দিচ্ছি তাদেরকেও।
বিদ্যুৎ অফিসের একজন কর্মকর্তা জানালেন, আমবাড়ি ফিডারকে দুই ভাগে ভাগ করার কাজ দুই দিন করেই বন্ধ করে রেখেছে সিলেটের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাই এ- কোং।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হাসান বললেন, আমরা সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কোন ফিডারের কাজ করছি না। সুনামগঞ্জ শহরতলির জলিলপুরে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন আরেকটি সাবস্টেশন হবে। এই সাবস্টেশন থেকে ছোট ছোট ফিডার যাবে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়সহ শহরের অন্যান্য এলাকায়। আমরা এই কাজ করছি। কোন কাজ দুই দিন করে বন্ধ হয় নি। কাজ অনেক দিন ধরে চলছে। চলমান রয়েছে কাজ।