বিদ্রোহী স্বতন্ত্রে কোণঠাসা নৌকা

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে আগামী ১৫ জুনের দুই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে নির্বাচনী এলাকা। বৃষ্টিবিঘ্নিত দিনেও প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। চলছে গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক। নানা প্রতিশ্রুতিতে ভোটারদের মন জয় করারও চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা।
সুরমা নদীর উত্তর ও দক্ষিণ পারে বিস্মৃত জামালগঞ্জ সদর ও উত্তর দুই ইউনিয়নই উপজেলা সদর এবং সাচনা বাজার কেন্দ্রিক। সাচনা বাজার ভাটির নৌ-বন্দর হিসাবে খ্যাত। এজন্য এই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে আলোচনামুখর সেখানকার চা-স্টল, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট। জামালগঞ্জ উপজেলাবাসীর নজর এখন এই দুই ইউনিয়নের দিকে।
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রতিদ্বন্দ্বি দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী এম নবী হোসেন ও জামিল আহমেদ জুয়েলের নাম ঘুরে ফিরে সামনে চলে আসলেও এই দুই প্রার্থীর ভোট বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলের বিদ্রোহী ও আওয়ামী ঘরানার স্বতন্ত্র প্রার্থী। জামালগঞ্জ সদরে বিদ্রোহী ও উত্তরে স্বতন্ত্র প্রার্থীর বেড়াজাল টপকে এই দুই প্রার্থীর বের হয়ে আসতে ঘাম জড়াতে হবে বলছেন স্থানীয় ভোটাররা।
একাধিক ভোটার বলেছেন, জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীর চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আওয়াজও কম নয়। আনারস প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা তরুণ চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈকত ঘোষ চৌধুরী ও ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী মো. হানিফ মিয়াও মূল লড়াইয়ে থাকতে পারেন জানিয়েছেন তারা (ভোটাররা)। এছাড়া জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চশমা প্রতীকের প্রার্থী মো. শহীদুল ইসলামও চায়ের কাপে উষ্ণতা ছড়িয়েছেন। আলোচনায় আছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী এম নবী হোসেনও। এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন ভোটাররা।
অন্যদিকে জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জামিল আহমেদ জুয়েলের প্রধান বাধা হয়ে ওঠেছেন বিদ্রোহী প্রার্থী মো. কামাল হোসেন। এলাকায় ‘ঢাকাইয়া কামাল’ হিসেবে পরিচিত অর্থবিত্তে শক্তিশালী উপজেলা কৃষক লীগের সহসভাপতি এই নেতা নৌকার ভোট বিভক্ত করে আ.লীগ মনোনীত প্রার্থীকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে, এমন অভিমত অনেকের। বিদ্রোহী কামালকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে উপজেলা আ.লীগ ও কৃষক লীগ।
এছাড়াও সদর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার বৃহৎ একটা অংশের ভোটব্যাংক নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। তবে তাঁর নিকটাত্মীয় সাবেক চেয়ারম্যান ফয়জুল আলম মোহন প্রার্থী হওয়ায় দুশ্চিন্তায় আছেন তার কর্মী সমর্থকরাও। আওয়ামী লীগ প্রার্থী জামিল আহমেদ জুয়েল, আনারস প্রতীকের প্রার্থী সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার ও চশমা প্রতীকের প্রার্থী মো. কামালের মাঝে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠবে এই ইউনিয়নে। উপজেলা নির্বাচন অফিসের দায়িত্বশীররা জানান, ১৫ জুন জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ১০ কেন্দ্রে ২০ হাজার ৬৯৩ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এরমধ্যে পুরুষ ১০ হাজার ৩৯৮ ও নারী ভোটার ১০ হাজার ৩০৪ জন রয়েছেন। অন্যদিকে জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ভোটার সংখ্যা ১৬ হাজার ৮৯৬ জন। ওই ইউনিয়নের ১১ ভোট কেন্দ্রে ৮ হাজার ৫৮৯ জন পুরুষ ও ৮ হাজার ৩০৭ জন নারী ভোটার ভোট দিতে যাবেন।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নে ৭ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
এরা হচ্ছেন উপজেলা আ.লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক জামিল আহমেদ জুয়েল (নৌকা), ফারুক আহমেদ (মোটর সাইকেল) মো. ওয়াসিম চৌধুরী (ঘোড়া), উপজেলা কৃষক লীগের সহ সভাপতি মো. কামাল (চশমা), মো. নাজিম উদ্দিন (টেবিল ফ্যান), মো. ফয়জুল আলম মোহন (অটোরিক্সা) ও মো. সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার (আনারস মার্কায়) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী রয়েছেন ৬ জন। এরা হলেন, উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন (নৌকা), বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রজব আলী (মোটরসাইকেল), সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম (চশমা), সৈকত ঘোষ চৌধুরী (আনারস), হানিফ মিয়া (ঘোড়া) ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. ইকবাল হোসাইন (হাতপাখা মার্কা) নিয়ে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চাঁনপুর গ্রামের ভোটার মো. হায়দার আলী বললেন, ভোটের প্রচারে আ.লীগ নেতাকর্মীরা এখনও সেভাবে নামেনি। প্রচার-প্রচারণায় অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে। চশমা প্রার্থী কামাল ও বর্তমান চেয়ারম্যান সাজীব প্রচারণায় এগিয়ে। আ.লীগ প্রার্থী কর্মী-সমর্থক নিয়ে মাঠে নামলে দৃশ্যপট বদলাবে মনে করেন অনেকে।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. শহীদুল ইসলাম বললেন, যেদিকে যাচ্ছি, সেদিকে ভোটাররা আমাকে ভোট দেবেন বলে আশ্বস্ত করছেন। আমার বিশ্বাস আমি নির্বাচনে জয়ী হতে পারব। কথা দিচ্ছি জয়ী হলে অবহেলিত এই ইউনিয়নকে মডেল ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তুলব।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের নৌকা প্রার্থী জামিল আহমেদ জুয়েল বলেন, আমার বিশ্বাস উন্নয়ন ও পরিবর্তনের স্বার্থে জনগণ আমাকে নির্বাচিত করবে। উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য আমি ভোটারদের প্রতি অনুরোধ জানাই।
ইভিএমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এমনটা জানিয়ে উপজেলা নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ আছে। এখন পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ কেউ কওে নি। সার্বিক পরিস্থিতিও ভালো রয়েছে। দুই ইউনিয়নে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র তেমন নেই। প্রসঙ্গত, গত ৫ জানুয়ারি জামালগঞ্জের ৬ ইউনিয়নের মধ্যে ৪ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হলেও জামালগঞ্জ সদর ও জামালগঞ্জ উত্তরের নির্বাচন হয় নি। ২০১৭ সালে জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ভেঙে সদর ও উত্তর ইউনিয়ন পৃথক হওয়ায় এ দুই ইউনিয়নের নির্বাচন দেরিতে হয়েছিল। ফলে ৫ জানুয়ারি সদর ও উত্তর ইউনিয়নের মেয়াদ পূর্ণ না হওয়ায় তা পিছিয়ে আগামী ১৫ জুন নির্বাচন হবে।