বিশ্বকাপের স্মৃতি

এনাম আহমদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
২০১০ সালে বিশ্বকাপ প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় আফ্রিকা মহাদেশে। দক্ষিণ আফ্রিকার অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ নানা কারণে বর্ণময়। শাকিরার গাওয়া থিম সং ছিলো দূর্দান্ত। অনেকের মতে এযাবতকালের মধ্যে এটাই সেরা সংগীত। তাছাড়া ভুভুজেলা কালচারের সূচনাও এ বিশ্বকাপে হয়। এ বিশ্বকাপের ঘানা প্রথমবার মত কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে আফ্রিকার সম্মান রক্ষা করে। তরুনদের নিয়ে গড়া জার্মানি ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টনাকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত তৃতীয় স্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। ব্রাজিলও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। নকআউট পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। একই ভাগ্য বরণ করতে হয় আর্জেন্টিনার, তারাও বিদায় নেয় নকআউট পর্বে। আর এর আগের বারের ফাইনালিস্টদের অবস্থা তো আরও খারাপ। ইটালি ও ফ্রান্স ছিলো আগের বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা দুই দল। তারা গ্রুপ পর্বই পার হতে পারেনি। ফাইনালে উঠে প্রথমবারের মতো স্পেন ও দুইবার ফাইনাল খেলেও ট্রফি না জেতা নেদারল্যান্ডস। এই দুইদলই কখনো বিশ্বকাপ জেতেনি। এমনকি ইউরোপের বাইরে কোন ইউরোপীয় দল কখনো বিশ্বকাপ জেতেনি তখন পর্যন্ত। সেবার বিশ্বকাপে নতুন দুটি রেকর্ড হয়! নতুন একটি দল বিশ্বকাপ জেতে আর ইউরোপের বাইরে ইউরোপীয় দল বিশ্বকাপ জেতে। আর সে দলটি হলো স্পেন। ইনেস্তার গোলে ১—০ ব্যবধানে তারা বিশ্বকাপ জেতে।
২০১৪ সালে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফুটবলের উর্বর ভূমি ব্রাজিলে। দক্ষিণ আমেরিকার এই বৃহত্তম দেশে ১৯৫০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন হয় বিশ্বকাপ। ব্রাজিলই ছিলো হটফেবারিট। কিন্তু ভাগ্যর নির্মম পরিহাস, সেবাটই প্রথম ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ‘সেভেন আপ’ এর মতো দুর্ঘটনা ঘটে। সেমিফাইনালে জার্মানি স্বাগতিক ব্রাজিলকে তাদের লক্ষাধিক সমর্থকদের সামনে ৭—১ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে ফাইনালে উঠে। ব্রাজিলের বিচলিত ভাব তৃতীয়স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও যায়নি। সেই ম্যাচেও তারা নেদারল্যান্ডের কাছে ৩—০ গোলে বিধ্বস্ত হয়। অন্যদিকে আর্জেন্টনা সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসের সাথে নির্ধারিত সময়ে ও অতিরিক্ত সময়ে কোন গোল করতে না পারলে খেলা যায় ট্রাইবেকারে। তাতে আর্জেন্টিনা ৪—২ গোলে জয়লাভ করে ফাইনালে উঠে। ম্যারাডোনা উত্তর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকা আর্জেটিনার লিওনেল মেসির নেতৃত্বে ফাইনালে উঠে। ফাইনালের অন্য দল জার্মানি। জার্মানি খেলে যান্ত্রিক ফুটবল। ফাইনালে আর্জেন্টনার সুস্পষ্ট প্রাধান্য ছিলো। এর মধ্যে একটি নিশ্চিত পেনাল্টি রেফারি এড়িয়ে যান। নয়তো আর্জেন্টিনা এগিয়ে যেত। পরে নির্ধারিত সময়ে খেলা গোলশূন্য ভাবে শেষ হয়। খেলা যায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়েরও প্রথমার্ধ গোলশূন্য। দ্বিতীয়ার্ধের একেবারে শেষ সময়ে যখন দুদলই ট্রাইব্রেকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই ধারার বিপরীতে জার্মানি একটি গোল করে বিশ্বকাপ জিতে নেয়। লিওনেল মেসি ঠিকই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের মর্যাদা লাভ করেন।
সর্বশেষ বিশ্বকাপ ছিলো রাশিয়ায় ২০১৮ সালে। সেবার ফুটবলে একটি নতুন শক্তির উত্থান ঘটে। দ্বিতীয় রাউন্ডের আর্জেন্টনা বনাম ফ্রান্সের খেলা ছিলো বিশ্বকাপের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলা! তুমুল আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে খেলা চলে। শেষপর্যন্ত ফ্রান্স আর্জেন্টনাকে ৩—২ গোলে পরাজিত করে। যদিও আর্জেন্টনার বিরুদ্ধে দেয়া একটি পেনাল্টি ছিল বিতর্কিত। ব্রাজিল হারে কোয়াটার ফাইনালে, বেলজিয়ামের কাছে। বেলজিয়াম হারে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে। যদিও ভালো খেলেছিল বেলজিয়াম! অপর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড নতুন পরাশক্তি ক্রোয়েশিয়ার কাছে পরাজিত হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স ক্রোয়েশিয়াকে ৪—২ গোলে পরাজিত করে দ্বিতীয় বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে আর নতুন শক্তি ক্রোয়েশিয়াকে রানারআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। (চলবে)
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।