বিশ্বকাপের স্মৃতি

এনাম আহমদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বিশ্বকাপের প্রথম স্মৃতি ১৯৮২ সালে! পড়ি ক্লাস থ্রিতে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ছাড়া কিছু ছিল না। তাও সাদা—কালো টিভিগুলো কোনরকমে টিকে ছিলো! খেলা দেখাতে পারতো খুব কম, একটি বা দুটি। তালিমাবাদ ভূ—উপগ্রহের মাধ্যমে তা প্রচারিত হতো। তালিমাবাদ স্থানটি তখন সারাদেশে খুব বিখ্যাত ছিল! শহরের বাসাগুলোতে টেলিভিশনের সংখ্যা ছিলো খুবই কম। পাড়ায় যে বাসায় টিভি থাকতে সে বাসায় সব প্রতিবেশিরা এসে হাজির হতেন। ৮২তে শুধু ইটালির একটি খেলা অস্পষ্টভাবে মনে আছে। একজন খেলোয়াড়ের নাম মনে আছে পাওলো রসি নামে! পরে জেনেছি তিনি ইটালির অত্যন্ত বিখ্যাত স্টাইকার।
খেলার মূল আমেজ আসে ১৯৮৬ সালে। ম্যারাডোনা নামের এক খর্বাকৃতির অতিমানবকে নিয়ে চলে সর্বত্র আলোচনা! বিশ্বকাপ আসরটি বসেছিল মেক্সিকোতে। বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী গভীর রাতে খেলা হতো। স্কুলে পড়লেও রাত জেগে খেলা দেখতাম! অভিভাবকরাও তেমন একটা আপত্তি করতেন না, কারণ উনারাও নিয়মিত দর্শক ছিলেন। সেবার ম্যারাডোনার একক ঝলকে আর্জেন্টনা তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিকে পরাজিত করে দ্বিতীয় বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে। এরপর থেকে সুনামগঞ্জের মানুষ অপেক্ষা করতে থাকে আবার কবে বিশ্বকাপ আসবে। ৮৬ সালেও বিটিভি সবগুলো খেলা দেখাতে পারেনি। ১৯৯০ সালের ইটালির বিশ্বকাপটি ছিল সত্যিকার অর্থ অপূর্ব! সেবার বিটিভি সবগুলো খেলা দেখায়। টেলিভিশনের গ্রাফ্রিক্সের কাজগুলোও ছিলো অসাধারণ! খেলা শুরুর আগে ইটালির দর্শনীয় স্থানগুলো দেখাতো। ইটালির নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে আমরা অভিভূত হতাম। খেলা দেখার সঙ্গে এগুলো ছিলো আমাদের বাড়তি পাওনা। তখন শহরে টেলিভিশনের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেলেও উৎসবের আমেজের জন্য আমরা পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে সবাই মিলে অকাল প্রয়াত যুবনেতা অ্যাড. মঈনুদ্দিন আহমদ জালাল দাদার হোটেল জালালাবাদের চারতলার খোলা জায়গায় সমবেত হয়ে দেখতাম। বিদ্যুৎ না থাকলে পশ্চিম বাজার থেকে ব্যাটারি নিয়ে আসা হতো। বিদগ্ধ দর্শকগণের টিকা—টিপ্পনীতে জমজমাট থাকতো পুরো সময়। সেবার ম্যারাডোনা—ক্যানিজিয়া ছাড়া আর্জেন্টিনার তেমন উল্লেখযোগ্য কোন খেলোয়াড় ছিলো না। ম্যারাডোনাও খেলেছেন ইনজুরি নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে। গ্রুপ পর্যায়ের খেলাতেই আর্জেন্টনা সমস্যায় পড়ে যায়! শেষে কোন মতে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে দ্বিতীয় পর্বে উঠে। কিন্তু এতে বড় ধরণের বিপদের মুখোমুখি হয়। দ্বিতীয় রাউন্ডে নক আউট পর্বে প্রথম খেলাই পড়ে যায় ব্রাজিলের সঙ্গে! এদিকে ব্রাজিল ঐ বছর অত্যন্ত শক্তিশালী দল। সুনামগঞ্জের ব্রাজিলের সমর্থকরা সম্ভাব্য বিজয় উদযাপন শুরু করে আমাদের কোনঠাসা করে ফেলে। পতাকা উড়তে থাকে সর্বত্র। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে পরাজয়ের আশংকা! খেলার দিন শহর থমথমে। সবার মুখে একই আলোচনা। স্কুল —কলেজ, অফিস —আদালত বন্ধ হয়ে যায় সময়ের আগেই। যদিও খেলা মধ্যেরাতে। অবশেষে কাঙ্খিত খেলা শুরু হয়। ব্রাজিলে মুহুমুহু আক্রমনে দিশেহারা আর্জেন্টিনা ও তার সমর্থকরা। প্রথম দশ মিনিটেই ব্রাজিলের দুইটি শট বারে লেগে ফিরে আসে। আমরা আলামত বুঝতে পেরে চুপসে যাই। ব্রাজিল সমর্থকদের উল্লাসে কান পাতা দায়। প্রথমার্ধ কোন মতে গোলশূন্য ভাবে শেষ হয়। দ্বিতীয়ার্ধের প্রথমদিকের গল্পও একই! এক পর্যায়ে ম্যারাডোনা হঠাৎ বল নিয়ে প্রচন্ড বেগে ঢুকে পড়েন ব্রাজিলের সীমানায়। ব্রাজিলের ডিফেন্সে অস্থিরতা শুরু হয়। সব খেলোয়াড় দৌঁড় দেয় ম্যারাডোনাকে ব্লক করার জন্য। এই সুযোগে ম্যারাডোনা বল পাস দিয়ে দেন ফাঁকায় দাড়ানো ক্যানিজিয়াকে। ক্যানিজিয়ার সামনে তখন শুধু ব্রাজিলের গোলকিপার! তাকে কাটিয়ে সহজেই ক্যানিজিয়া আর্জেন্টিনার পক্ষে গোল করে বসেন। পরে শত চেষ্টা করেও ব্রাজিল আর গোল শোধ করতে পারেনি। তখন আমাদের লম্ফঝম্প আর দেখে কে? শহরে তখন বিভিন্ন উৎসবে পটকা ফোটানো হতো। পরাজিত হবো মনে করে আমরা কোন পটকা কিনি নাই। কিন্তু ব্রাজিল সমর্থকেরা প্রচুর পটকা কিনেছিল জয় উদযাপন করার জন্য। শেষে আমরা তাদের পটকা দিয়ে আর্জেন্টনার জয় উদযাপন করি। শহরে রাত তিনটায় শুরু করি বিজয় মিছিল। পুরো শহরের মানুষ তখন জেগে আছে। আমাদের মিছিলের পরিধি সময়ের সাথে শুধু বর হতে থাকে। (চলবে)
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।