বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু’র জন্মদিন আজ

স্টাফ রিপোর্টার
১৯৭১ সাল। যুদ্ধে যাওয়ার ডাক আসে, তখন বয়স উনিশ। তরতাজা যৌবন তাঁর। তিনি তো যুদ্ধে যাবেনই। দেশ-মাতৃকার জন্য যুদ্ধ, স্বাধীনতার লড়াই। এই যুদ্ধে তিনি কি না গিয়ে পারেন। রাজনীতি, খেলার মাঠ, সংস্কৃতি আর সাংবাদিকতার অঙ্গন ছেড়ে বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু অংশ নেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
ভারতের রেঙ্গুয়া গ্রামের পাশে হাইড ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ৫ নম্বর সেক্টরের অধীন সেলা সাবসেক্টর ছিল তাঁর যুদ্ধ ক্ষেত্র। এই সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন লে. কর্নেল মীর শওকত আলী (পরবর্তীতে লে. জেনারেল)। আর সেলা সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন এ. এস. হেলাল উদ্দিন (পরবর্তীতে লে. কর্নেল)। এঁরা দুজনই তাঁকে খুব ¯েœহ করতেন। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আক্রমণের পূর্বে ফ্যাক্টরির ভেতরে পাকিস্তানী সৈন্যদের অবস্থান ও গোলাবারুদ সম্পর্কে রেকি করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। এ সময় দেশ বরেণ্য বীরসেনানীদের যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল তিনি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। যুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় বরেণ্য রাজনীতিক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আবদুল হক, বরুণ রায়, পীর হবিবুর রহমান, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মতিয়া চৌধুরী, হুসেন বখত, দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী, আবদুজ জহুর, আলফাত উদ্দিন আহমদ মুক্তার সাহেবদের সঙ্গে। তিনি সম্মুখ সমরে অংশ নেন ছাতক ও টেংরাটিলা যুদ্ধে।
বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু’র জন্ম ভাষা আন্দোলন পরবর্তী এক উত্তাল সময়ে। ১৯৫২ সালের ২ এপ্রিল সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরে। বাবা মফিজুর রহমান চৌধুরী, মা মজিদা খাতুন চৌধুরী। ৫ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে বজলুল মজিদ চৌধুরী ছিলেন দ্বিতীয়। সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে এসএসসি, ১৯৬৯ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭২ সালে একই কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেন। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা, বইপড়া, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে মেতে থাকতেন তিনি। স্থানীয় প্রান্তিক নাট্যগোষ্ঠী ও শিল্পীচক্রের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করেছেন। ১৯৭৪ সালে আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘সুবচন নির্বাসনে’ নাটকে তিনি সর্বশেষ অভিনয় করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১১ দফা আন্দোলনসহ সকল আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। এই সংগঠনের মনোনীত প্যানেলে সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৮ সালে ঢাকা থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে যখন সুনামগঞ্জে এসে আইন পেশায় নিয়োজিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা ইকরাম উল্লাহ সরকারের পরামর্শে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে চলে যান। সেখানে ৫ বছর অবস্থানকালে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয় তাঁর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ পান। খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন প্রবাসীদের পাওয়া, না-পাওয়া, ও সুখ-দুঃখ-বেদনার অবস্থাচিত্র। লিখেছেন ‘পশ্চিম জার্মানির স্মৃতিকথা’ নামে সুখপাঠ্য একটি গ্রন্থ। জার্মানি ছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, লুক্সেমবুর্গ, চীন, সৌদি আরব, ভারত প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেছেন। দীর্ঘ সময় পৃথিবীর একটি অন্যতম সমৃদ্ধ দেশে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে থেকেও নাড়ির টানে ১৯৮৩ সালে দেশে ফিরে শুরু করেন আইনপেশা। সফল এই আইনজীবী ১৯৯১ সালে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০০ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৭-২০০৯ (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) সময়ে সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পূর্বে দৈনিক সংবাদ এবং স্বাধীনতার পর দৈনিক পূর্বদেশের সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সুনামগঞ্জের প্রথম সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক সুনাম’ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি প্রায় ৮ বছর চালু ছিল। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’র উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বিভিন্ন প্রকাশনা সম্পাদনাসহ লেখালেখিতে তাঁর পারদর্শিতা সকলকে মুগ্ধ করেছে। ২০১২ সালে সুনামগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী বই ‘রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ’ প্রকাশিত হয়। ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অপর গ্রন্থ ‘পশ্চিম জার্মানির স্মৃতিকথা’। এ ছাড়া তিনি ‘একাত্তরের সুনামগঞ্জ’, ‘বরুণ রায় স্মারকগ্রন্থ’, ‘আলফাত উদ্দিন আহমদ স্মারকগ্রন্থ’ ও ‘হুসেন বখত স্মারকগ্রন্থ’ সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্মারকগ্রন্থগুলো তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ‘সুনামগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র’র উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৯৬ সালে দোয়ারাবাজার উপজেলার নিজ গ্রাম লক্ষ্মীপুরে সাবসেক্টর কমান্ডার এ. এস. হেলাল উদ্দিন ও বজলুল মজিদ চৌধুরী দুজনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল-খসরু হাই স্কুল’। সুনামগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে একইভাবে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল শিক্ষা ট্রাস্ট’। এই প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকেই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সরকারিভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীভাতা প্রবর্তনের পূর্বে ক্যাপ্টেন হেলালের অর্থায়নে তাঁরাই সুনামগঞ্জে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা ভাতা প্রদান কার্যক্রম শুরু করেন। যখন সরকারিভাবে ভাতা দেওয়া শুরু হয় তখন এই কার্যক্রম বন্ধ করেন তাঁরা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন বজলুল মজিদ চৌধুরী। সুনামগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ ১২ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ‘আলফাত উদ্দিন রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন স্মৃতি ট্রাস্ট’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। আমৃত্যু এই দায়িত্বে ছিলেন।
এ ছাড়া রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি, ডায়াবেটিস এসোসিয়েশন, শিল্পকলা একাডেমী, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল সুনামগঞ্জ জেলা ইউনিটের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম গঠন হওয়ার পর তিনি সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সুনামগঞ্জ মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্টের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন।
তাঁর উদ্যোগেই সুনামগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁরা ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা (বরুণ রায়, হুসেন বখত, আলফাত উদ্দিন আহমদ, আছদ্দর চৌধুরী, রানা চৌধুরী এবং বজলুল মজিদ চৌধুরী) মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাপ্ত ভাতার টাকা না নিয়ে এই সংগঠনের মাধ্যমে সেই টাকা নানা সামাজিক ও সেবামূলক কাজে ব্যয় করছেন। আর্থিকভাবে অসচ্চল পরিবারের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, গবির মানুষের চিকিৎসা ব্যয়, পথশিশুদের শিক্ষা উপকরণ প্রদান, সফল মানুষদের সম্মাননা প্রদানসহ নানা কাজ করছে সংগঠনটি। এই সংগঠনের মূল চালিকা শক্তি ছিলেন বজলুল মজিদ চৌধুরী।
২০১৭ সালে সুনামগঞ্জে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির কারণে শতভাগ ফসলহানি হওয়ায় প্রতিবাদী সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠে ‘হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’। তিনি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে শেষ দিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। প্রত্যুষে পায়ে হেঁটে শরীরচর্চা করার জন্য তিনিসহ আরও অনেকে গড়ে তুলেন ‘সোনালী সকাল’ নামের একটি সংগঠন। ব্যতিক্রধর্মী এই সংগঠনটি শহরে সব মহলে পরিচিত। জীবনের শেষ দিনেও তিনি এই সংগঠনের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে হেঁটেছেন, আনন্দ করেছেন।
বজলুল মজিদ চৌধুরী ১৯৮৬ সালে সংসার জীবন শুরু করেন। তাঁর স্ত্রী মুনমুন চৌধুরী একজন কবি ও সংগঠক। একমাত্র ছেলে ড. সউদ ফারহান চৌধুরী দীপ আমেরিকায় ইনটেল কোম্পানিতে একজন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। মেয়ে সারাফ ফারহিম চৌধুরী দীয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি অনার্স শেষ করে বর্তমানে এলএলএম করছেন। পাশাপাশি ড. কামাল হোসেন এসোসিয়েটসে এপ্রেন্টিস হিসেবে কর্মরত।
বজলুল মজিদ চৌধুরী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা অন্তপ্রাণ এক মানুষ। আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল, সাহসী, প্রতিবাদী ও মানবিক মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন সব মহলে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই মানুষটির জীবন ছিল নিজের মতো করে সাজানো গোছানো। কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেন নি তিনি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বজলুল মজিদ চৌধুরী গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে আকস্মাৎ আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন। বীরের এই বিদায় পরিবার, স্বজন, শুভানুধ্যায়ীদের জন্য বড় কষ্টের, বড় বেশি বেদনার। তিনি আমাদের অন্তরে, ভাবনায় বেঁচে থাকবেন। তাঁর স্মৃতি অক্ষয় হয়ে থাকবে। তাঁর সাহস, মানবিকতা আর দেশাত্ববোধের চেতনা আমাদের সত্য, শুভ, সুন্দর ও স্বাধীনতার পথ দেখাবে, প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করবে।