ভিক্ষুক ও অসহায়রা দাওয়াত খান যে রেস্টুরেন্টে

বিশেষ প্রতিনিধি
‘গেছে শুক্করবারে আইতাম পারছি না, এর লাগি ১০-১২ দিনের মাঝেঔ ভালা খানি খাওয়া অইছে না। আজকে পেট ভইরা খাইলাম।’ জগন্নাথপুর পৌর শহরের এক ভিক্ষুক (রহিমা বেগম) বিনা পয়সায় রেস্টুরেন্টে খাওয়া শেষে এভাবেই তৃপ্তির ঢেকুর গিলছিলেন। আরেক ভিক্ষুক হিরণ মিয়া বললেন, ‘আমি ভাত খাইতাম পারি না, বেটায় রুটি কাইট্টা মাংস দিয়া দিছইন, হখল শুক্রবারেঔ ই-কাম করইন তাইন’।
প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর পৌর শহরের ব্যস্ততম এলাকার ‘মাহিমা রেস্টুরেন্ট’এ প্রতি শুক্রবারেই এমন দৃশ্য দেখা যায়।
গত শুক্রবার বেলা আড়াইটায় ওই রেস্টুরেন্টে খাবারের উদ্দেশ্যে ঢোকার সময় মুরাদ আহমদ নামের একজন কর্মচারী এসে বললেন, আপনারা ভেতরের কক্ষে বসুন। সামনে পুরো কক্ষে ভিক্ষুক ও এতিমদের খাবার দেওয়া হবে এখন।
ভিক্ষুক ও এতিমদের কে খাওয়াবে জানতে চাইলে বললেন, ‘ইখানোতো শুক্রবারে হারা বছরঔ তারা খায়’ জানিয়েই খাবার দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে গেলেন মুরাদ। মুরাদের সঙ্গে অন্য কর্মচারীরাও ব্যস্ত ভিক্ষুক, এতিম ও হতদরিদ্র মানুষদের খাবার পরিবেশন করতে। স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী অমিত দেব জানালেন, প্রতি শুক্রবার দুপুরের দৃশ্য এটি।
মাহিমা রেস্টুরেন্টটি জগন্নাথপুর পৌর শহরের ব্যারিস্টার আব্দুল মতিন মার্কেটে ২০১৭ সালে চালু হয়েছিল। শুরু থেকেই রেস্টুরেন্ট মালিক মকবুল হোসেন ভুইয়া শুক্রবার দুপুরে ফকির, মিসকিন ও এতিমদের খাবারের আয়োজন করেন। খাবারের মেন্যুতে ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি ও মোরগের মাংস দেওয়া হয়।
রেস্টুরেন্ট কর্মচারীরা জানালেন, প্রথম প্রথম ৩০-৪০ জন করে প্রতিবন্ধি ও হতদরিদ্ররা এসে খেতেন। ক্রমে ক্রমে সেটি বাড়তে থাকে। এখন দুইশ জনের খাবার তৈরি করতে হয়।
কর্মচারী মুরাদ আহমদ বললেন,‘সারাদিনইতো খাদিমদারী করি, শুক্রবার দুপুরের খাদিমদারী করে যে তৃপ্তি পাই, সারা সপ্তাহে আর কোন কাজ কইরা ই-তৃপ্তি মিলে না।’
ব্যারিস্টার আব্দুল মতিন মার্কেটের মালিক অ্যাডভোকেট মির্জা আবু তাহের বললেন, মাহিমা রেস্টুরেন্টের মালিক মকবুল হোসেন বন্যার সময় খিচুরি রান্না করে বন্যার্তদের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়েছেন। তিনি এসব কাজের প্রচারও চান না। রেস্টুরেন্ট খোলার পর থকেই শুক্রবার দুপুরে ভিক্ষুকদের খাওয়াচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি উপজেলার শফিকুল ইসলাম ভূইয়া এতিমখানার এতিমদেরও এই দিনেই দুপুরে খাওয়ানো হচ্ছে তার উদ্যোগে।
মকবুল হোসেনের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি প্রথমে এসব কাজের প্রচার করতে আগ্রহী নয় বলে মন্তব্য করেন। কথা বললে অন্যরাও এই কাজে উৎসাহ পাবে বলার পর তিনি বললেন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি আছে। খরচ বেড়েছে। এরপরও আমার ব্যবসায় লোকসান হচ্ছে না। প্রতি শুক্রবার ২০০ প্রতিবন্ধি দরিদ্র মানুষের খাওয়ানোর খরচও ব্যবসার আয় থেকেই চলছে বলে মন্তব্য করেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বললেন, যতদিন এই ব্যবসা চলবে, এই দাওয়াতি খানাও চলবে।
প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুরের যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের অনেকেই হতদরিদ্রদের দান-খয়রাত এবং সাহায্য সহায়তা করে থাকেন। তার এই উদ্যোগে কেউ সহায়তা দিয়েছেন কি-না জানতে চাইলে মকবুল বললেন, ‘কয়েকজন প্রবাসী অর্থ সহায়তা পাঠিয়েছেন। আমি তাদের কাছ থেকে এভাবে নিয়েছি, বলেছি খাবার আয়োজন আমার উদ্যোগেই হবে। তারা সহায়তা করলে এভাবে করতে পারেন, আমার খাবারের সঙ্গে মাংস বা মাছ যুক্ত করে আয়োজনটাকে আরও ভালো করতে পারেন।’
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম বললেন, বিষয়টি আমি জানি। একদিন শুক্রবার রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছি। ওই ব্যবসায়ী মন থেকেই এই কাজ করে তৃপ্তি পান।