ভুয়া পরোয়ানার প্রতারণা নির্মূল করতে হবে

ভুয়া মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা মূলে নিরীহ লোকদের কারাবাস করা খুবই দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। যে ব্যক্তির জীবনে এমন অভিশাপ নেমে আসে সে ছাড়া আর কেউ এর যন্ত্রণা বুঝতে সক্ষম হবে না। এমন অভিশপ্ত ৪ কারাভোগকারী নিরপরাধ ব্যক্তি বৃহস্পতিবার শহরে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্ভোগের কথা জানিয়ে এমন অপকর্মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছাতকের কৃষক আবদাল হোসেন ২৭ দিন কারাবাস করেন ঢাকার আশুলিয়া থানার একটি প্রতারণা মামলায়। অথচ তিনি কোনো দিন ঢাকাই যাননি। পরে যে মামলা ও পরোয়ানা মূলে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল তা ভুয়া বলে প্রমাণিত হওয়ায় তিনি ছাড়া পান। দুর্ভোগের শিকার ব্যক্তিকে নিজের নিরপরাধের প্রমাণ দিতে প্রাণ বেরোনোর জোগাড় হয়। একটি চক্র এমন ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করে ব্যক্তি বিশেষকে নাজেহাল করে চলেছে। তাদের তৈরি পরোয়ানাগুলো নাকি এতটাই নিখুঁত থাকে যা পুলিশের পক্ষে বুঝাও সম্ভব হয় না। এতে জড়িত চক্রের দক্ষতার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। যখন অপরাধীরা এমন দক্ষ হয়ে উঠে তখন এর প্রতিকারে যারা নিয়োজিত তাদেরকে আরও বেশি দক্ষতাসম্পন্ন হতে হয়। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু ব্যক্তি যে এখনও প্রতারকচক্রের নিপুণ জালিয়াতি ধরতে পারেন না, সংবাদ সম্মেলনে আগত ৪ ব্যক্তির দুর্ভোগ থেকে তা বুঝা যায়। তাই এক্ষেত্রে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু করতে হবে। এরকম প্রতারণার ঘটনাটি সুনামগঞ্জের এই চার ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সারা দেশেই এমন প্রতারণার শিকার হতে দেখা যায় অনেককে। আদালতও এমন প্রতারণার বিষয়টির উপর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। সুনামগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এজিএম আল মাসুদ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জেলার বাইরে থেকে আগত গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের আগে এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য থানার ওসিদের নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি এক্ষেত্রে জিআর মামলার পরোয়ানার ক্ষেত্রে কোর্ট ইন্সপেক্টর ও সিআর মামলার পরোয়ানার ক্ষেত্রে আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে পরোয়ানার যথার্থতা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ প্রদান করেছেন।
এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেট সর্বত্রগামী। গ্রেফতারি পরোয়ানাগুলো সাধারণত ডাকযোগে আসে। ডাকযোগে আসা পরোয়ানার সত্যাসত্য নির্ধারণ করা সত্যিই দুরূহ। কারণ ভুয়া পরোয়ানাগুলোকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে নিখুঁতই মনে হয়। এক্ষেত্রে আদালত যদি ডাকযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পাশাপাশি ই-মেইলে এর কপি সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠিয়ে দেন তাহলে আমাদের মনে হয় প্রতারণার পরিমাণ কিছুটা কমবে। আদালত ও থানাগুলো এখন তথ্যপ্রযুক্তির সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার আওতায় রয়েছে। যদিও ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতেও প্রতারণার সুযোগ রয়েছে তবুও নিরপরাধ ব্যক্তিদের প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে বিকল্প কিছু ব্যবস্থার চিন্তা তো করতেই হবে। নাগরিক নিরাপত্তা সমুন্নত রাখা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে কী করে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা সংক্রান্ত প্রতারণার ঘটনাগুলো আটকানো যায় সেই পথ অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে।
যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ না করেই জেল খাটেন তার ক্ষতি আর কিছু দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। আমাদের আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে নিরপরাধ প্রমাণ করাও বেশ জটিল কাজ। বিশেষ করে স্বল্প শিক্ষিত কিং বা অশিক্ষিত ও আর্থিকভাবে দুর্বল লোকজন এক্ষেত্রে একেবারেই অসহায়। আইন ও আইন-প্রেেয়াগকারী সংস্থাগুলোকে এই নিরপরাধ ব্যক্তিদের ভরসার জায়গা হতে হবে। সংবাদ সম্মেলনকারী ৪ ব্যক্তিকে ফাঁসানোর জন্য যে চক্রটি জড়িত ছিল তাদের খোঁজে বের করে আইনের আওতায় আনাটাও সমান জরুরি। নতুবা প্রতারকচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাবে এবং জায়গায় জায়গায় নিরপরাধ ব্যক্তিরা এই ধরনের প্রতারণার শিকার হতে থাকবেন।