মধু সরকারের এখন গানই প্রাণ

আকরাম উদ্দিন
‘যার উচিলায় হইলেন সৃজন তামামও সংসার, মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ বন্ধু যে আল্লাহর’। সুমধুর কণ্ঠের গান শুনে থমকে দাঁড়ালাম। জিজ্ঞেস করলাম কে এই প্রবীণ। পথচারী হাত উঁচিয়ে বলল ওই বাড়ির বাউল মধু সরকার। তিনি একা উঠানে বসে নিরবে নিভৃতে আত্ম তৃপ্তিতে গান করছেন। শিল্পীর ধার ঘেঁষে বসে নিরবে শুনলাম তাঁর সুললিত কণ্ঠের গান। আমার উপস্থিতিতে যেন প্রেরণার প্রবলতা বাড়ল শিল্পীর মনে। গান শেষ হতেই আরেকটি গানের সুর ধরলেন ‘মানব বেশে আরব দেশে আসিলেন নুরের পুতুল, নাম মোহাম্মদ রাসুল’। এই গানও শুনলাম। খুবই ভাল লাগল। এসব গান শুনলে পর পারে টেনে নেয় মন প্রাণ। গানের ফাঁকে বাউল মধু সরকার এই প্রতিবেদককে দেখে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, এখন গানই আমার প্রাণ। জীবনে অনেক গান গেয়েছি। অনেক গান রচনা করেছি। কিন্তু অন্য দশজন গুণী শিল্পীর মতো পরিচিত হতে পারিনি। সারা
জীবন আড়ালেই থেকে গেলাম। তাই আনন্দ বেদনায় গান গেয়ে সময় পার করছি। গান গাইলে মন প্রাণ ভাল থাকে। প্রায় প্রতিদিন এভাবেই গান গেয়ে যাই।
সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের সোনাপুর বেদে পল্লীর বাসিন্দা শিল্পী মধু সরকার। প্রবীণ এই শিল্পীর বয়স প্রায় ৭০ বছর। তিনি জানান, ১৯৫২ সালে সিলেটের বাদাঘাট এলাকায় বেদে নৌকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ৮ বছর বয়সে পিতা আব্দুল গণি চৌধুরী বসতি স্থাপন করেন সুনামগঞ্জের সোনাপুর গ্রামে। এ সময় পিতা আব্দুল গণি চৌধুরী তাঁকে ভর্তি করে দেন স্থানীয় শাক্তারপাড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয়ে তিনি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ওই সময় থেকে মধু সরকার গানের প্রতি আসক্ত হয়ে উঠেন। অন্যের গান গেয়ে বেড়ান বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং গ্রাম্য জারী ও সারী গানের আসরে। মধু সরকারকে গান শেখার আগ্রহ দেখে পিতা আব্দুল গণি চৌধুরী ময়মনসিংহ জেলার উকিল মন্সীর ছেলে উস্তাদ ছাত্তার মিয়ার কাছে পাঠিয়ে দেন। ছাত্তার মিয়া মারা যাওয়ার পর উস্তাদ ছিলেন ঢাকার রহমত আলী। তখন তিনি গান চর্চায় বেশ মনোনীবেশ হয়ে উঠেন। গান চর্চার পাশাপাশি ১৯৭৭ সালে সার্কাসে ভর্তি হন তিনি। ওই সার্কাসে গান করতেন মধু সরকার। এভাবে তিনি ভারত, ময়মনসিংহ ও সিলেটে বিভিন্ন মালজোড়া গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গান করেছেন।
মধু সরকার জানান, সংগীতে যখন ভাল উপার্জন। তখন যৌবনকাল। বয়স ১৮। ঘর সংসার করার ইচ্ছে জাগে তাঁর মনে। নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ে করার প্রথা থাকায় এ সময় বিয়ে করেন একটি, ২৫ বছর বয়সে আরও একটি বিয়ে করেন তিনি। এখনও দুই স্ত্রী আছেন সংসারে। তাঁদের ঔরসজাত সন্তান ৬ ছেলে, ৬ মেয়ে। পরিবারে ২ ছেলে ও ২ মেয়ে বিয়েকে বিয়ে দিতে পারছেন না।
বাউল মধু সরকার জানান, জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও অবসর সময় পার করতে নিজে গান রচনা করি। গান রচনার পর আসর জমিয়ে সুর করে গাই। আগে এই গান বিভিন্ন স্থানের গানের আসরে গাইতাম। এখন নিজের বাড়িতে গান গেয়ে সময় কাটাই। বয়স বেড়েছে। শরীরে নানা রোগে বাসা বেঁধেছে। কাজ কর্ম করতে পারি না। ছেলেরা সংসার চালায়। আমি প্রতি বছর ভাতা পাই ১৩ হাজার ৫শত টাকা করে। আমি গত ২০১৮ সালে আমার রচিত ১৩০ গানের ‘এক পথের পথিক’ নামের গ্রন্থ প্রকাশ করেছি। আমার রচিত আরও অনেক গান সংরক্ষণে আছে।