- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://sunamganjerkhobor.com -

মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এসেছে

রাজধানীর রাস্তার মোড় ও বাসাবাড়ির দেয়াল টু লেট লিখা সাইনবোর্ডে ভরে উঠেছে। অন্যান্য বড় শহরেরও একই অবস্থা। কম ও মাঝারি ভাড়ার বাসায় যারা থাকতেন, গত চার মাসের করোনা অভিঘাতে আয় রোজগার বন্ধ কিংবা কমে যাওয়ায় তারা দলে দলে বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। এই করোনা আমাদের অনেক অভূতপূর্ব শিক্ষা দিচ্ছে, নতুন নতুন পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। যে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় কখনও অর্থনৈতিক সংকটের করুণ ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করতেন না, তাদের একটি বড় অংশ করোনা দুর্যোগের কারণে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এই মধ্যবিত্তরা কখনও আপৎকালের জন্য সঞ্চয়ের চিন্তা না করে জীবন ধারণের উন্নত মান বজায় রাখতে রোজগারের শেষ পয়সাটি পর্যন্ত ব্যয় করে সঞ্চয়ের খাতাটি শূন্য রেখেছেন। এরা ভাল বাসায় থাকতে ভালবাসেন, সন্তানদের উচ্চ খরচের স্কুলে পড়াতে চান, ঘর গেরস্থালীতে যাবতীয় ইলেকট্রনিক সামগ্রী ব্যবহারের ইচ্ছা, হাল ফ্যাশনের পোশাক গায়ে চাপানোর সাধ, ড্রয়িংরুমকে শিল্পশোভিত রাখার খায়েশ, খাওয়া দাওয়ায় বিলাসী, বেড়ানোর শখ। এই করতে তাদের মাসান্তে পকেটে টান পড়ে, সঞ্চয় দূরস্ত। এরা জীবনকে উপভোগ করাকেই আভিজাত্য মনে করেন। বাইরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট হলেও অসুবিধা নেই। দেখনদারিটা ভাল করা চাই-ই। এরা অনুমানও করতে পারেননি এমন একটা দুর্যোগকাল আসতে পারে যখন আভিজাত্য রক্ষা দূরে থাক জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন মিটানোর সঙ্গতিও হ্রাস পেতে পারে। এই ভবিষ্যৎ দর্শনে অক্ষম শহুরে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় আজ বড় অসহায় হয়ে পড়েছেন। তারা না পারেন নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে না পারেন বর্তমান অবস্থাকে মেনে নিতে। তাই তারা এখন পালাচ্ছেন। দলে দলে। কেউ কয়েক মাসের ভাড়া বকেয়া বলে বাসার জিনিসপত্র রেখেই নিরবে পালাচ্ছেন। চলে যাচ্ছেন আদি উৎসে। যেখান থেকে এসেছিলেন তারা শহরে আর এক মিথ্যা প্রলোভনের ফাঁদে আটকে জীবনের অর্থ পাল্টে দিয়েছিলেন। মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে সমাজের সবচাইতে দোদুল্যমান ও ক্ষণস্থায়ী সম্প্রদায় বিবেচনা করা হয়। এদের অল্প কিছু উপরে উঠে, বেশি অংশ তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উঠতে না পেরে নীচে পতিত হয়। করোনা এখন এদের নীচে নামিয়ে আনার উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। আজ এরা চিন্তা করবে সারা জীবন কী ভুলটাই না করেছে।
যে সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির নিরাপত্তা নিজেকেই সুরক্ষিত করতে হয় সেখানে সঞ্চয়ের চিন্তা অবশ্য কর্তব্য। সুদিনের সঞ্চয় দুর্দিনের সহায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি একটু সংযমী হলে ছয় মাস এক বছর চলার মতো সঞ্চয় করতে পারেন অনায়াসে। এক্ষেত্রে তাদের ভুয়া জীবন দর্শনের মোহ ছাড়তে হবে। আভিজাত্য মানে সবকিছু খুইয়ে রঙিন সংসার সাজানো নয়। বরং বিলাসিতা কমিয়ে ভিত মজবুদ করাটা অনেক জরুরি। উন্নত দেশে রাষ্ট্রের বহু সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি থাকে। পাঁকে দুর্বিপাকে পড়লে রাষ্ট্র ব্যবস্থা এগিয়ে আসে। বৃদ্ধ হলে সেই রাষ্ট্রই পেনসন জুগায়, চিকিৎসা দেয়, আশ্রয় দেয়। সেইসব দেশে তেমন করে সঞ্চয় না করলেও চলে। তাই তারা জীবনকে চেটেপুটে উপভোগ করে। তাই বলে আমরাও? অনুকরণ সবসময় ভাল ফল বয়ে আনে না। আজ বাংলাদেশের মধ্যবিত্তরা সেই শিক্ষা পাচ্ছেন।
আজ যারা দলে দলে নগর শহর ছেড়ে পালাচ্ছেন তারা আবার শহরে ফিরবেন। করোনা চিরকাল থাকবে না। অবশ্যই মানুষ করোনা জয় করবে। জীবন জীবিকাও স্বাভাবিক পথে ফিরা শুরু করবে। আর তখন এই মানুষগুলো ছাড়া নগর শহরের একদিনও চলবে না। সুতরাং পলাতকরা ফিরবে। কিন্তু কথা হলো ফিরে আসা লোকগুলো কি করোনার শিক্ষা গ্রহণ করবে? সমাজতত্ত্বের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। মানুষ ইতিহাস থেকে কমই শিক্ষা নেয়। তাই এই মধ্যবিত্তরা আবারও পুরনো চরিত্র নিয়েই ফিরবেন হয়তো। কিন্তু অল্প কিছু লোকও যদি শিক্ষা নেয় তবে তাই হবে করোনা কালের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া।
মধ্যবিত্ত ব্যক্তিদের এই অবস্থানের মতই আমাদের রাষ্ট্রও অনেকটা অদূরদর্শী। উচ্চাবিলাসী খাতে খরচ করতে যেয়ে মৌলিক প্রয়োজনগুলোকে উপেক্ষা করেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অপার্যপ্ততা প্রকট হয়ে তা আজ স্পষ্ট করেছে। তাই মধ্যবিত্তের যেমন রাষ্ট্রের তেমন জীবন দর্শন পাল্টাতে হবে।

  • [১]