মন্দিরসহ গ্রামজুড়ে ভাংচুর, লুটপাট

বিশেষ প্রতিনিধি
শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের সমর্থকরা হামলা, লুটপাট ও ভাংচুর করেছে। এসময় গ্রামের ৫ টি মন্দিরসহ প্রায় এক’শ বাড়িঘরে তা-ব চালায় হামলাকারীরা। নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মাওলানা মামনুল হককে কটাক্ষ করে কথিত স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় বুধবার সকাল ৮ টা থেকে ১০ টার মধ্যে এই তা-ব চালানো হয়। এ ঘটনায় সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত নোয়াগাঁও ও হবিবপুর গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভয়ে গ্রাম ছাড়াদের অনেকে এখনো বাড়ি ফিরেন নি। পুরুষরা ঘর বাড়ি দেখা শুনার জন্য বাড়ি ফিরলেও নারী ও শিশুদের বাড়ি নিয়ে আসেননি অনেকে।


গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার বিকাল থেকেই নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দারা শুনছিলেন তাদের গ্রামে হামলা হতে পারে। রাতে গ্রামের অনেক বাসিন্দা বাড়ি ছেড়ে চলে যান। বিষয়টি মঙ্গলবার রাতেই স্থানীয় পুলিশকে জানান গ্রামবাসী। সকাল ৮ টায় দিরাই উপজেলার নাচনি, চ-িপুর, সন্তোষপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের কয়েক’শ মানুষ দা, রামদা, লাটি-সোটাসহ দেশীয় অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে ওই গ্রামে হামলা চালায়। এসময় গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে থাকা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এবং গ্রামের চ-ি মন্দির, দুর্গা মন্দির, কালী মন্দির, শিব মন্দির, বিষ্ণু মন্দিরের পুরোহিতরাও গ্রাম ছেড়ে হাওরের দিকে চলে যান। হামলাকারীরা সকাল ৮ টা থেকে ৯ টা পর্যন্ত তা-ব চালায়। সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্তিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।


গ্রামের সকলে দৌঁড়ে পালানোর সময় চিৎকার করে অন্যদের বাড়ি ছেড়ে না যাওয়ার অনুরোধ করছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎ চন্দ্র দাশ (৭০)। সবাই তাঁকে ফেলে দৌড়াতে থাকে। তিনি যান নি। তার অবস্থানের কারণে ছেলে লিটন দাশও বাড়ি ছাড়েনি। বাড়ির দু’তলা ঘরের উপরতলায় লিটন এবং নীচে দরজা বন্ধ করে অবস্থান করছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎ চন্দ্র।


উপরে থেকে হামলার ঘটনা দেখে নিজের শরীর কাঁপতে থাকে লিটনের। লিটন দাশ বললেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমার বড় ভাই জানালেন কাশিপুর, চণ্ডিপুর ও নাচনী গ্রামে মাইকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। এই অবস্থায় গ্রামের ঘরে ঘরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাত ৮ টায় হবিবপুর- নোয়াগাঁওয়ের গণমান্যরা বৈঠকে বসেন কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দানকারী ঝুমন দাশ আপনকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে।

এরপর প্রত্যেকটি সম্ভাব্য স্থানে দ্রুত মোটর সাইকেলে ঝুমনকে আটকের জন্য মানুষ পাঠানো হয়। রাতে উপজেলার শ্বাসখাই বাজার থেকে ঝুমনকে গ্রামের লোকজনই আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এরপর গ্রামের গণ্যমান্যরা জড়ো হয়ে পুলিশ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে ফোন করেন। তারা সকলেই আশ্বাস দেন, এখন আর কিছু হবে না, আপনারা সকলেই বাড়িতে থাকেন। সকাল ৭ টা থেকে দিরাইয়ের বৃহৎ গ্রাম নাচনি, চণ্ডিপুর ও শাল্লার কাশিপুরের মসজিদে মসজিদে মাইকে সকলকে একত্র হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

এই সংবাদ নোয়াগাঁও গ্রামে পৌঁছালে গ্রাম থেকে থানায় ফোন দিয়ে জানানো হয়। সকাল ৮ টার দিকে গ্রামের একেক হাটিতে হাটিতে একেক দল দা, রামদা, লাটিসোটা নিয়ে হামলা চালায়। আমাদের বাড়িতে নাচনি গ্রামের ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়া ও পক্কন মিয়ার নেতৃত্বে হামলা হয়। আমি উপর থেকে শুনছিলাম, পক্কন মিয়া বলছিলো- এটি জগদীশের কাকার বাড়ি, ভেঙে গুড়িয়ে দাও। কিছুক্ষণ ভাঙচুর চালিয়ে দরজা ভাঙতে না পেরে আমাদের মাঝের হাটির অন্য বাড়িতে চলে গিয়েছিল এই দলের ভাংচুরকারীরা। পরে আবারও ফিরে এসে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে ভাংচুর চালায় তারা। আমার বাবাকে (বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎ চন্দ্র দাস) টানা হেছড়া শুরু করে। বাবা পরে তার শোকেস’এর ড্রয়ার থেকে ১০ হাজার টাকা বের করে দিয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলে টাকা নিয়ে ওরা ফিরে যায়।


গ্রামের অসীম চক্রবর্তী জানান, তার বাড়ির বিষ্ণু মন্দির ভাংচুর করে শত বছর আগের কষ্টি পথরের বিষ্ণু মূর্তি নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। তিনি জানান, ঘটনার সময় কয়েক’শ মানুষ দেশীয় অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় এবং ধারণ বাজার নামের একটি বাজারে আরও কমপক্ষে ১০- ১২ হাজার মানুষ অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে সমবেত হয়েছিলেন।
স্থানীয় হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ দাস বকুল জানিয়েছেন, হামলাকারীরা তার নিজের ঘরসহ ৯০ টি ঘরবাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট করেছে।
শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অলিউল হক’এর বাড়ি কাশিপুর গ্রামে। তার গ্রাম থেকে ভাংচুর করতে এসেছে অনেকে।
অলিউল হক বললেন, আমরা ঠেকানোর চেষ্টা করেছি। কেউ শুনেছে আমাদের কথা, কেউ কেউ শুনে নি। তিনি বললেন, ২-৩ টি ঘর ভাংচুর হয়েছে, এর বেশি নয়।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন চৌধুরী বললেন, ৮৮ টি বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট হয়েছে। বিত্তশালীদের বাড়ীতে হামলা ও লুটপাট হয়েছে বেশি। দিরাই উপজেলার নাচনি গ্রামের পক্কন মিয়া ও স্বাধীন মিয়ার কথা গ্রামের অনেকে বলেছেন, তারা ভাংচুরে সক্রিয় ছিল বেশি। তাদের সঙ্গে বিল শুকিয়ে মাছ ধরা নিয়ে গ্রামবাসীর দ্বন্দ্ব ছিল। তারা বিল শুকিয়ে মাছ ধরায় এই গ্রামের মানুষের চাষাবাদে সমস্যা হয়েছিল। কাশিপুর গ্রামের কিছু মানুষ ফেরানোরও চেষ্টা করেছে বলে দাবি করেন তিনিও।
শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক বললেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গ্রামবাসী জানানোর পর দিরাইয়ের চ-িপুর ও নাচনি এবং শাল্লার কাশিপুর গ্রামের গণ্যমান্যদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি। সকাল ৮ টায় ওরা আবার মাইকে প্রচার চালাচ্ছে খবর পাই। পরে সেখানে আবারও পুলিশ নিয়ে যাই। আমরা সেখানে পৌঁছার আগেই নদী পার হয়ে কিছু মানুষ ওখানে গিয়ে হামলা করে। বেশিরভাগ মানুষকে আটকাতে পেরেছে পুলিশ।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ও পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান দুপুরে ঘটনাস্থলে সরেজমিনে ঘুরে এসেছেন।


পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বললেন, মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে কটাক্ষ করে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ায় নোয়াগাঁওয়ের আশপাশের গ্রামের মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। রাতে স্ট্যাটাস দানকারী ঝুমন দাস আপনকে আটক করা হয়। সকালে মামুনুল হকের সমর্থকরা ওই গ্রামে হামলা চালায়, ভাংচুর করে। বাড়ীঘরে লুটপাট চালায়। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
প্রসঙ্গত. গত সোমবার দিরাই স্টেডিয়ামে হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বক্তব্য দেন। এসময় ধর্মীয় উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন মামুনুল হকসহ হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা।

এদিকে শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা, লুটপাট ও ভাংচুরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবি। বুধবার সন্ধ্যায় জেলা সিপিবি’র সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. এনাম আহমদ এক বিবৃতিতে নিন্দা জ্ঞাপন করেন।