মাছের খামারীদের স্বপ্ন ডুবলো

বিশেষ প্রতিনিধি
‘রাইত তিনটার সময় বজ্রঝড় আরম্ভ হয়— ঢলও নামে, খামারের পাড়ে থাকা পাহাড়াদার ও কর্মীরা দৌড়াইয়া নিরাপদ জাগাত যায়, ইসময় পুকুরের পাড়, জাল—রশি সব ভাসাইয়া লইয়া গেছে, মাছ খালি বড় অইছিল, দুই—তিন কেজি ওজনের মাছ, চৌখের সামনে ভাইস্সা গেছে, জৈষ্ঠমাসে দাম ভালা পাওয়া যাইবো দেইখ্খা মাছ তুলছিলাম না, প্রায় ৩০ লাখ টেকার মাছ গেছে। ছয় দিন আগেও প্রত্যেকদিন ২০ কেজির ৩০ বস্তা মাছের খাবার লাগতো, এখন দুই বস্তা খাওনই খাওয়ার মাছ নাই, কিভাবে ব্যাংক ঋণ দেই, কেমনে স্টাফের বেতন দেই’।
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার আলীপুরের মাছের খামারী আব্দুর রহিম এভাবে কষ্টের বর্ণনা দিচ্ছিলেন।
গত ১৭ মে রাত তিনটায় ভারী বর্ষণ শুরু হলে এবং ভারতের আসাম চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসা ঢলে খাসিয়ামারা নদীর পাড় উপচে ভেসে যায় তার নয়টি চাষের মাছের পুকুর।
গেল পৌষমাসে ১০২ বিঘা জমির নয় পুকুরে রুই মৃগেল, কাতলা, তেলাপিয়া মাছের লাখো পোনা ছেড়েছিলেন এই খামারী। ঢলের পানিতে তার বেশিরভাগ মাছই ভেসে গেছে।
সেরা খামারী হিসাবে পুরস্কারপ্রাপ্ত আব্দুর রহিম জানালেন, কৃষিব্যাংক থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণ তুলেছিলেন এবার। পোনাও বেশি ছেড়েছেন, জৈষ্ঠ্য মাসে রুই—মৃগেলসহ দেশীয় জাতের মাছ পুকুর থেকেই ২০০ টাকা কেজি কিনে নেয় মাছের আড়ৎদাররা। তেলাপিয়া—পাঙ্গাসেও তখন দাম বেশি পাওয়া যায়। এইজন্য মাছ লালন করছিলেন তিনি। এখন কি করবেন বুঝতে পারছেন না খামারী আব্দুর রহিম।
কেবল এই মাছের খামারী নয় দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিসনগর, টেবলাই, বৈঠাখাই, পশ্চিম টিলাগাঁওসহ সীমান্তবর্তী এলাকার ৩০ টি গ্রামের কয়েকশ খামারীর হাজারো পুকুর ডুবেছে, এখন কোথায় পুকুর আছে ঈশারায় বুঝাতে হচ্ছে।
এই এলাকার খামারী কলিম উদ্দিন, মেছবাউল গণি, আব্দুশ শহিদ ও শের মাহমুদের পুকুরের মাছও ভেসে গেছে। এরা সবাই বড় খামারী।
টেংরাটিলা বাজারের মাছের খাদ্য ও ওষুধ বিক্রেতা বজলুল মামুন বললেন, খামারীদের মাথায় হাত, মাছের খাদ্য বিক্রি চারভাগের তিনভাগই কমে গেছে।
কেবল দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা এলাকা নয়। সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ ও ছাতক উপজেলার শত শত মাছের খামারীর স্বপ্ন ভেঙেছে ঢলে। হাওরাঞ্চলে পাহড়ী ঢল ও ভারী বর্ষণে ১৯ টি হাওরের ফসল নষ্ট হবার পর মাছের খামারের এমন ক্ষতিতে হাওর অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মনোহরপুরের মাছের খামারী বাবলু মিয়া বললেন, ‘চাইর পুকুরে বড় মাছের চাষ করছিলাম, খালি মাছ তুইল্লা বিক্রি করার প্রস্তুতি নিছলাম, ইসময় সব মাছ নিলোগি ভাই, রুই, মৃগেল, কাতলা ছাড়ছিলাম সাড়ে চাইর হাজার, ১৫ হাজার তেলাপিয়া, ১০ হাজার পাঙ্গাস সবই গেছে, পানি যে সময় আইছে, ঝড়ও শুরু অইছে, খামারে আমার মানুষ যারা আছিল, টিকতো পারছে না, ঢলের পানিয়ে পুকুরের পাড়, জালের বেড়া সব ভাসাইয়া নিছে।
বাবলু মিয়া জানালেন, কৃষি ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকা ঋণসহ ব্যক্তিগত হাতের ঋণও আছে তার। কিভাবে এই ঋণ পরিশোধ করে টিকে থাকবেন তিনি এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন এখন।
সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুরের বাসিন্দা হুমায়ূন কবির বললেন, এলাকার মর্ডান এগ্রো ও মিজানুর রহমানের মৎস্য খামার পানিতে তলিয়ে গেছে। লাখ লাখ টাকার মাছ তারা চাষ করেছিলেন।
দোয়ারার মৎস্য খামারী রতন মিয়া, রবীন্দ্র দাসও একই ধরণের কষ্টের কথা শুনালেন।
পৌর মার্কেট মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি সহিবুর রহমান বললেন, ঢলে যেভাবে ক্ষতি করেছে, সরকারী সহায়তা ছাড়া অনেক মাছের খামারী ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সীমা রানী বিশ^াস বললেন, জেলার ২০ হাজার ৪৬৯ টি মাছের পুকুরের মধ্যে এক হাজার ২৫০ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ১৬ হাজার পাঁচশ খামারীর মধ্যে ১১ শ’ খামারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় তিন কোটি টাকার বড় মাছ, ৩০ লাখ টাকার পোনা মাছ ভেসে গেছে। ১২ লাখ টাকার অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে।
সুনামগঞ্জে গত ১৫ দিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। একইসঙ্গে ব্যাপক পমিাণে পাহাড়ি ঢল নামছে। এতে জেলার পাঁচটি উপজেলা বন্যা কবলিত হয়েছে। এরমধ্যে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা আক্রান্ত বেশি।