মানবতা : সহায়তা প্রদানকারীদের খাওয়াচ্ছেন তারা

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যায় যখন সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে তখনই ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে দিরাইয়ের রাজ রেস্টুরেন্ট। প্রতিদিন ত্রাণ নিয়ে আসা শতাধিক মানুষকে বিন্যামূল্যে খাবার খাওয়াচ্ছেন তারা। তাদের এই উদ্যোগে উপজেলাবাসিও খুশি।
১২২ বছরের রেকর্ড ভাঙা বন্যায় প্রায় ১ সপ্তাহ তলিয়ে ছিলো পুরো জেলা। ছিল না বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট। নি¤œ আয়ের মানুষ থেকে উচ্চবিত্ত, সবাইকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়েছে। কোথাও এক ইঞ্চি শুকনো জায়গা ছিলো না মানুষ দাঁড়াবার। যাদের বহুতল ভবন ছিলো তারা রক্ষা পেয়েছেন। তবে রক্ষা করতে পারেননি ঘরের আসবাবপত্র। ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের পাশে মানবিক সহায়তা নিয়ে এসেছেন দেশের বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি। প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে পুরোজেলায় চলছে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম।
তবে ত্রাণ নিয়ে আসা অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দুই থেকে তিনগুণ বেশি নৌকা ভাড়ার জন্য নিধারিত দুর্গম এলাকায় যেতে পারেন নি। এছাড়াও বেশিরভাগ খাবার হোটেল বন্ধ ছিলো। যেগুলো খোলা ছিলো সেগুলোতেও খাবারের দাম অতিরিক্ত থাকায় বিপাকে পড়েন ত্রাণ নিয়ে আসা মানুষজন। এই পরিস্থিতিতে ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ নেয় দিরাই উপজেলার রাজ রেস্টুরেন্ট। বন্যা দুর্গত দিরাই-শাল্লা উপজেলায় যারা ত্রাণ নিয়ে আসছেন তাদেরকে বিনামূল্যে খাওয়াচ্ছেন তারা।
জানা যায়, ১০ বছর আগে যাত্রা শুরু হওয়া রাজ রেস্টুরেন্টে ৬১ রকমের খাবার পাওয়া যায়। রেস্টুরেন্টে ত্রাণ নিয়ে আসা মানুষজন তাদের কাছ থেকে কোনো পয়সা নিচ্ছেন না তারা। তাদের এই কার্যক্রমে গর্বিত উপজেলাবাসি। তারা বলছেন, মানুষ মানুষের জন্য। মানুষের বিপদে মানুষ এগিয়ে আসবে। রাজ রেস্টুরেন্ট যে কাজটি করছে সবাই যদি এরকম এগিয়ে আসতো সমাজ বদলে যেতো।
নারায়নগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলা থেকে ত্রাণ নিয়ে আসা আহসান আলম বললেন, দিরাইয়ে ত্রাণ বিতরণের জন্য আমরা কিছু শুকনো খাবার নিয়ে আসি। দুপুরে রাজ রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার হোটেলের কর্মচারীরা বললো মালিকপক্ষ যারা ত্রাণ নিয়ে আসেন তাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেয় না। আমরা বারবার টাকা দেয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা নেয় নি।
একই এলাকা থেকে ত্রাণ নিয়ে আসা আহম্মদ হোসেন বললেন, সারাদিন ত্রাণ বিতরণ করতে অনেক কষ্ট হয়েছে। রাতে যখন রেস্টুরেন্টে খেয়ে বিল দিতে গেলাম তখন টাকা নেন নি তারা। হোটেল মালিক পক্ষের এরকম আন্তরিকতায় আমরা মুগ্ধ হয়েছি।
রাজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মো. আনসার মিয়া বললেন, বন্যার্ত মানুষদের জন্য যারা ত্রাণ নিয়ে আসেন তাদেরকে বিন্যামূলে খাবার খাওয়ানো হয়। প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড়শ জন মানুষকে বিনামূল্যে খাওয়াচ্ছি আমরা।
রাজ রেস্টুরেন্টের মালিক মো. জহুর হোসেন চৌধুরী এবং ইমরান সরদার। মো. জহুর হোসেন চৌধুরী বললেন, বন্যার কারণে রেস্টুরেন্ট কিছু দিন বন্ধ ছিলো। যখন দেখলাম বাইরের জেলা থেকে অনেক মানুষ আমাদের বন্যা কবলিত এলাকার মানুষদের জন্য ত্রাণ নিয়ে আসছেন এতো কষ্ট করে, তখন আমরাও ভাবলাম তাদের জন্য কিছু করি। মানুষের জন্য কিছু করতে না পারলেও অন্তত যারা ত্রাণ আসতেছেন তাদের জন্য কিছু করি। যাতে তারা কোনো রকমের হয়রানি বা ভোগান্তির শিকার না হন। এরপরেই ২৬ জুন থেকে ত্রাণ নিয়ে আসা ব্যক্তিদের বিনামূল্যে খাবার দিচ্ছি হোটেলে।
তিনি আরও বলেন, যখন পানিবন্দি হাজারও মানুষ তখন আমাদের বাজারেও দেখা গেছে কিছু ব্যবসায়ী জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডার ২ হাজারের জায়গায় ৩ থেকে ৪ হাজার করে রেখেছেন। গত ১০ বছর ধরে ব্যবসা করছি, আগামীতেও করবো। তবে মানুষের সেবা করার সুযোগ সব সময় আসে না। তাই মানুষের দুর্দিনে মানুষের পাশে থেকে সেবা দিয়েছি। সামনে ঈদ, ঈদের ছুৃটিতে কর্মচারিরা বাড়ি যাবেন। তখন হয়তো কিছুদিন এই সেবা বন্ধ থাকবে।