মানবপাচারচক্র/ এই অবৈধ চক্র কেমন করে তৎপর থাকতে পারে?

দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের চরম অভাবের কারণে তরুণ যুবগোষ্ঠী যেকোনো উপায়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে চায়। এজন্য তারা জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছ পা হয় না। অভিভাবকরা জমিজমা-সহায়-সম্পদ বিক্রি করে বিদেশ পাঠানোর টাকা জোগাড় করে দালালের হাতে তুলে দেন। কিন্তু প্রায়ক্ষেত্রেই দেখা যায় দালালরা বৈধ পথের পরিবর্তে অবৈধভাবে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে এদের বিদেশে পাঠাচ্ছে। কোনো এক দেশে যাওয়ার পর প্রবাসী ব্যক্তির উপর দালালের ও-দেশীয় প্রতিনিধির চরম নির্যাতন নেমে আসে আরও টাকা দেয়ার জন্য। বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা টাকা দেন। এরপর এদের ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উদ্দেশ্যে পাাঠিয়ে দেয়া হয়। চলতি পথে এদের অনেকেই মারা যায়। যারা কোনো মতে পৌঁছতে পারে তারাও কাক্সিক্ষত দেশে পৌঁছে হয় মানবেতর জীবন যাপন করে নয় সে দেশের পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলেও থামার কোনো লক্ষণ নেই দালালচক্রের অপ্রতিরোধ্য দৌরাত্ম ও বিদেশ গমনের প্রবণতা। দালালদের প্রতারণার জাল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সুচতুরভাবে পাতা, যেখানে বাঁধা পড়তে বাধ্য এই বেকার তরুণ জনগোষ্ঠী। পক্ষান্তরে সরকারিভাবে দালালচক্র নির্মূলে নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ। ভুক্তভোগীরা যখন সন্তান হারিয়ে আহাজারি করেন কিংবা কেউ আইনের দ্বারস্ত হন তখন লোকদেখানো কিছু তৎপরতা শুরু হয়। কয়েক দিন পর আবার যাহা পূর্বং তাহা পরং অবস্থা ফিরে আসে। বিদেশে লোক পাঠানোর অবৈধ কাজ যারা করে তারা এ কাজ লুকিয়ে ছাপিয়ে করে না। এদের সুশোভিত অফিস আছে। এরা প্রকাশ্যে চলাফেরা করে। কিন্তু এদের খোঁজে পায় না সরকারি প্রতিষ্ঠান।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে জেলার মানবপাচারকারী চক্রের উপর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে বেশ কয়েকজন অপরাধীর নাম জানা যায়। এরা হলেন দোয়ারাবাজারের সাহাব উদ্দিন, রাজা মিয়া, জগন্নাথপুরের আবুল মিয়া ও আসমা বেগম, দিরাই উপজেলার এনামুল, শান্তিগঞ্জের রাসেল আহমদ প্রমুখ। এইসব নাম ভুক্তভোগীদের মুখ থেকে এসেছে। বলাবাহুল্য প্রকৃত দালালের সংখ্যা উল্লেখিত সংখ্যার চাইতে আরও বহু বহু বেশি হবে। দুঃখজনক বিষয় হলো এদের খপ্পরে পড়ে গত কয়েক মাসে জেলার অন্তত ৬ তরণ করুণ মৃুত্যুর মুখে ঢলে পড়ে পরিবারের শোক ও কষ্টের পরিমাণ ভারী করেছে। বিদেশ গিয়ে মৃত্যুর শিকার ব্যক্তিরা হলেনÑ জগন্নাথপুরের একোয়ান ইসলাম, দিরাই উপজেলার জুনু সরদার, জুনেদ আহমদ, মাহবুবুল আলম, জামালগঞ্জ উপজেলার সাজ্জাদুর রহমান সুমন, ও শাল্লা উপজেলার আকাশ রায়। এইসব নিহতের ঘটনা গত কয়েক মাসের। এই মৃত্যুর মিছিল কতোটা লম্বা তার পরিপূর্ণ তথ্য কখনও জানা সম্ভব হবে না। দালালরা যে কেবল অর্থ আত্মসাতজনিত অপরাধের সাথেই জড়িত তা নয় বরং প্রতিটি মৃত্যুর জন্য এরা খুনের অপরাধীও বটে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অভিযোগ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগে থেকেই যাতে এমন প্রতারকরা মানুষকে সর্বশ্বান্ত করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এইসব মানবপাচারকারীচক্রের খবর দেশের আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানগুলো জানে না এমন কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। বরং এসব অবৈধ প্রতারক, নির্যাতক ও খুনীদের সাথে তাদের গভীর সখ্যতার খবরটিই সকলে বিশ্বাস করেন। দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বিদেশ গমনের এই প্রবণতা বজায় থাকবে। তাই বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে যাতে কেবল সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোই কাজ করতে পারে তা নিশ্চিত করে অবৈধ মানবপাচারকারীদের উৎখাত করতে হবে। নতুবা বিদেশ বিভুঁইয়ে সন্তানহারা পিতা-মাতার অসহায় ক্রন্দনে বাংলার আকাশ কেবল ভারী হতে থাকবে।