মানবিক যোদ্ধা তারা

বিশেষ প্রতিনিধি
তারা মানবিক যোদ্ধা। করোনার এই সময়ে যেখানেই মৃতের মরদেহ নিয়ে বিপদে পড়বে মানুষ, সেখানেই তারা হাজির হবে। ছাতকের কিছু তরুণরা এমন পন করেছেন । গত ৬ জুন এলাকার করোনা আক্রান্ত একজনের মৃতদেহ দাফনের মধ্য দিয়ে এমন মানবিক সহযোগিতার সূচনা তাদের। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা স্বেচ্ছাসেবী দল এটি।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় বিভাগের সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। এই উপজেলায় এই পর্যন্ত মারাও গেছেন ৩ জন। করোনার সক্রমণকে এখানকার একটি শ্রেণি যেমন অবহেলার চোখে দেখে, স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই ঘুরাফেরা করছে। অন্য একটি অংশ যাদের পরিবারের সদস্য আক্রান্ত হয়েছে, বা মারা গেছে, তাদের মধ্যে ভয়-আতঙ্খও কাজ করছে। মৃত্যুর পর লাশ দাফনের খাটিয়াই পেতে সমস্যা হবার সংবাদেও চিন্তিত এই উপজেলার অনেকে। এরমধ্যে এলাকার তরুণদের এমন কার্যক্রমের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জেলায়।
গত ৬ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের গণেশপুরের হীরা মিয়া নামের একজনের মৃত্যু ঘটে। এই মৃত্যু সংবাদ শোনার পরপরই এলাকার তরুণরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে বলেন, আক্রান্তের মরদেহ দাফনে সহযোগিতা করবেন তারা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার অনুমোদন নিয়ে পরে ইসলামপুর ইউনিয়নের ৮ জন ও পাশের ভাতগাঁও ইউনিয়নের ২ জন স্বেচ্ছাসেবী হীরা মিয়ার মরদেহ ঘরের বাইরে আনা থেকে শুরু করে গোসল- দাফন সবকিছুই করে দেয় তারা।
হীরা মিয়ার ভাগ্নে রুবেল আহমেদ জানালেন, তার মামা করোনা পজিটিভ হবার ২ দিনের মধ্যেই মারা যান। ৬ জুন বেলা সোয়া ১১ টায় মৃত্যু হয় তার। মৃত্যুর পর দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন কীভাবে গোসল করাবেন, লাশ দাফন করবেন এই নিয়ে। আত্মীয়-স্বজনদের বিষয়টি মৃত্যুর সংবাদ জানাচ্ছিলেন। এরমধ্যেই (ঘণ্টা খানেকের মধ্যে) ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক দেলোয়ার ইসলাম, রিপন আহমেদ, মোজাম্মেল হক রোমান, আবু তাহের, পাবেল আহমদ, ফাহিম শাহ্রিয়ার রেজোয়ান, ইমরান হোসাইন, আহমদ হাসান, মাওলানা মুফতি জুবায়ের আহমদ ও মাওলানা আকরাম আহমদ বাড়িতে আসেন। তারা এসে বলেন, আপনারা দুশ্চিন্তা করবেননা লাশের গোসল-দাফন সবই আমরা করে দেব। পরে তারাই সবকিছু করেন। করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে জেলাজুড়ে।
ইসলামপুর ইউনয়ন করোনা স্বেচ্ছাসেবক টিমের সদস্য, ছাত্রলীগ কর্মী ফাহিম শাহ্রিয়ার রেজওয়ান বলেন, গণমাধ্যমে আমরা সংবাদ দেখছি, ছেলে মাকে বের করে দিচ্ছে, বোন ভাইকে ফেলে আসছে, স্ত্রীকে বনে ছেড়ে দিচ্ছে স্বামী। মৃত ব্যক্তির লাশ বহনের জন্য খাটিয়া দেওয়া হচ্ছে না। এমন হৃদয়হীনতার সংবাদে হৃদয়স্পর্শ করেছে আমাদের এলাকার তরুণদের। আমরা ইউনিয়নের একজন সাধারণ মানুষ মারা গেছেন, শুনেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবগত করি এবং লাশ দাফন-কাপনের কাজ আমরা করবো জানিয়ে দেই। এর আগেই স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি জানতেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কর্মকর্তা। তাঁরা কেবল জিজ্ঞেস করেছেন আমরা প্রস্তুত আছি কী না, কয়জন প্রস্তুত আছি। আমরা ইউনিয়নের ৮ জন স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুত রয়েছি জানাই তাঁদের। শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভাতগাঁও ইউনিয়নের দুইজন মাদ্রাসা পড়–য়া স্বেচ্ছাসেবীকে আমাদের সঙ্গে পাঠান। আমরাই পরে গণেশপুরে মৃত হীরা মিয়ার বাড়ি গিয়ে লাশের গোসল, জানাজা ও দাফনের কাজ করি। কাজের সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম কবির বার বারই খোঁজ নিয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কর্মকর্তা ডা. রাজিব চক্রবর্তী স্বাস্থ্য সহকারী হাসান আহমেদকে মৃতের বাড়িতে পাঠান। হীরা মিয়াকে মৃত ঘোষণার জন্য। মৃত হীরা মিয়ার দাফনের কাজ করে আমি তৃপ্ত। আমরা ইউএনও স্যারকে জানিয়ে দিয়েছি, করোনায় কেউ মারা গেলে, দাফন কাজে যুক্ত হতে প্রস্তুত রয়েছি আমরা, সেটি ছাতকে হোক বা অন্য কোন উপজেলায়ই হোক।
ছাতক পৌরসভা স্বেচ্ছাসেবক টিমের টিম লিডার মৃদুল দাস জানালেন, ছাতক পৌরসভায় ৪৬ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন তারা। জেলার যে কোন প্রান্তেই করাজ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি রয়েছে তাদের।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম কবির বললেন, ছাতকের বাসিন্দা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের জনপ্রিয় ডা. মঈন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার পর তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে দাফনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জসিম নামের এক করোনা উপসর্গের রোগী একা এসে মেঝেতে পড়ে যাবার ঘটনার পর দুশ্চিন্তায় পড়ি আমরা। ওই সময় থেকেই স্বেচ্ছাসেবক তৈরির বিষয়টি নিয়ে ভাবনা শুরু করি। আমরা ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী তৈরি করার আগ্রহ নিয়ে কাজ শুরু করি। উপজেলার ১৩ ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার ১০৭৫ জন স্বেচ্ছাসেবী হতে নাম লেখান। আমরা ইউনিয়নে ইউনিয়নে গিয়ে আগ্রহীদের বলি যেনে শুনে যারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারবেন কী না, যারা পারবেন, তারাই কেবল এই কাজে যুক্ত হতে পারবেন। ৩৫’এর উপরের বয়সের কাউকে যুক্ত করা হয় নি। অসুস্থ কাউকে নেওয়া হয় নি। এরপরও ১৯৪ জনকে যুক্ত করা গেছে। ৫ জন মেয়েও যুক্ত হয়েছেন। ছেলে- মেয়ে উভয় ক্ষেত্রেই হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের রয়েছেন। দাফনে ইমামতি করার মতো এবং শেষকৃত্যে পুরোহিত হবার মতো ছেলেরাও যুক্ত আছেন। তিনি জানান, হীরা মিয়া’র গোসল, জানাজা ও দাফন সবই স্বেচ্ছাসেবীরা করেছে। গত পহেলা জুন জাউয়া বাজার ইউনিয়নের রাউলীর ওষুধ ব্যবসায়ী আব্দুল হক মারা যাবার পরও স্বেচ্চাসেবীরা ওখানে গেছে এবং দাফনে সহযোগিতা করেছে। একইভাবে ৫ জুন ছাতক শহরের বাঘবাড়ি’র মুক্তিযোদ্ধা পেয়ারা মিয়ার দাফনেও তারা সহযোগিতা করেছে।
সিভিল সার্জন ডা. শামস উদ্দিন জানান, ছাতকের সকল স্বেচ্ছাসেবককে সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এই উপজেলার স্বেচ্ছাসেবীদের কাজ জেলাজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বললেন, আমরা ছাতকের ন্যায় সারা জেলায় স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। ছাতকে শুরু থেকেই স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করার কাজে আমরা উৎসাহিত করেছি। তারা যেভাবে হীরা মিয়ার দাফন করলো এটি নিশ্চয় প্রশংসার দাবি রাখে। যে সময় স্বামীর লাশ শেষ কৃত্যের জন্য স্ত্রীকে একা নিয়ে যেতে হয়। মায়ের লাশ ছেলে একা। বাবার লাশ মেয়েরা নিয়ে যেতে হয় শেষ কৃত্যে বা দাফনে. এই সময়ে এমন কাজকে নিশ্চয়ই উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের অফিসাররা যেমন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে, টিক তেমনি কোন বাধ্যবাধকতায় না থেকেও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছে।