মায়ের দায়িত্ব গ্রহণে সন্তানের অস্বীকৃতি/ মানবিক শুভবোধ জাগৃতির মাধ্যমে এই অবক্ষয় রোধ করতে হবে

সন্তানরা ভরণপোষণ না দেয়ায় জগন্নাথপুরে এক মায়ের থানায় অভিযোগ দাখিল করা, পরে থানা পুলিশের মধ্যস্ততায় সন্তানদের মায়ের দায়িত্ব গ্রহণের খবরটি আমাদের সমাজ বাস্তবতার এক করুণ দিক মাত্র। জগন্নাথপুরের ওই ৭৫ বয়সী বৃদ্ধ মা হয়তো সাহসী হয়ে অভিযোগ পর্যন্ত যেতে পেরেছেন। তিনি সমাধানও পেয়েছেন। কিন্তু আমাদের কত পরিবারে কত বৃদ্ধ পিতা মাতার অসহায় অব্যক্ত কাতর ক্রন্দনধ্বনি আকাশে মিলায় একটু কান পাতলেই তা শুনা যায়। কেবল অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্যই এমন মানবিক বিপর্যয় নেমে আসেনি বরং আমাদের মন-মানসিকতায় আত্মস্বার্থপরতার প্রলেপ এমন গাঢ় হয়ে লেগে গেছে যেখানে জন্মদাতা বা জন্মদাত্রীরাও পর হয়ে যাচ্ছেন। নানাদিকে রাষ্ট্র সমাজ ও মানুষের উন্নতি হচ্ছে। মানুষের অভাব কমেছে, আয় বেড়েছে, শিক্ষার বিস্তার বেড়েছে, সুযোগ সুবিধা বেড়েছে। কিন্তু আত্মোন্নয়ন সে মাত্রায় বেড়েছে কি? একটুও না। সরকার আইন করেছেন বৃদ্ধ অবস্থায় সন্তান যদি বাবা-মার ভরণ পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ না করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে যে পবিত্র সম্পর্ক সেটি সুরক্ষা করতে একটি সমাজে যখন আইন প্রণয়ন করতে হয়, এক মা যখন তার অধিকার রক্ষায় পুলিশ পর্যন্ত ছুটে যান তখন বুঝতে হবে অবক্ষয় মাত্রা ছাড়িয়েছে। সমাজের একেবারে ভিতরে তৈরি হওয়া এই অবক্ষয়ের ময়লা সাফ করার কোনো সামাজিক উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ধর্মীয় আচরণগত জায়গায় ব্যাপক স্ফীতি লক্ষ্য করা যায় এখন। কিন্তু ধর্মের মর্মবাণী উপলব্ধি করে মানবিক গুণাবলী সেই অর্থে বিকশিত হচ্ছে না। এর কারণ কী? এর উত্তর খুঁজতে আমরা যত বিলম্ব করব তত মহামারীর মতো গ্রাস করবে আমাদের যাবতীয় মূল্যবোধ, প্রথা, রীতি ও মানবিক সত্ত্বাকে।
আজ যে সন্তান বুড়ো হয়ে পড়া বাবা-মার দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা দেখাচ্ছে বা তাচ্ছিল্য অবহেলা করছে, সে একবারও কি ভাবে না এই বাবা-মা তাকে কী করে বড় করে তুলেছেন? সে কি এ কথাও মনে রাখে না যে, সে নিজেও একদিন বুড়ো হবে। তখন তার সন্তান কী করবে? সন্তানরা তো পরিবার থেকেই শিক্ষা পায়। অভাব বা আর্থিক অনটন কোনো বড় বিষয় নয়। কোনো বাবা-মাই চান না সন্তানরা সাধ্যের বাইরে গিয়ে কিছু করুক। বরং বাবা-মা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সন্তানের মঙ্গল ও শান্তি কামনা করেন, এতে কষ্ট স্বীকার করতে হলে হাসি মুখেই তারা তা করেন। এই উপলব্ধি না জন্মালে আমাদের আবহমান কালের ভরসার প্রতীক পরিবারপ্রথা ভেঙে চুড়মার হয়ে যাবে। পরিবার হলো শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের সমাজের সবচাইতে ছোট্ট ইউনিট। এই ইউনিটটি গড়ে উঠেছিলো মানব জাতির কল্যাণ বিবেচনা করেই। এর সুফল আমরা শত শত বছর ধরে পাচ্ছি। আজ যখন এর মন্দ পরিণতি চোখে দেখছি তখন দুঃসহ ভবিষ্যৎ চিন্তা করে আমরা যারপরনেই আতঙ্কও বোধ করি। আজ যেসব দেশে পরিবারপ্রথা ভেঙে গেছে সেসব দেশের অবস্থা আমরা জানি। ওইসব দেশে এখন আবার পরিবারপ্রথায় ফিরে যাওয়ার আকুল আকুতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সমাজ কেবল রাষ্ট্রীয় আইন কানুন দিয়ে চলে না। সমাজ নিজের ভিতর থেকে শক্তি আহরণ করে। এই শক্তি দানকারী উপকরণ হচ্ছে সমাজেরই মানুষ। মানুষকে ভালো সবকিছুর জন্য সচেষ্ট থাকতে হয় নিরন্তর। এই নিরন্তর প্রয়াশই মন্দ প্রপঞ্চগুলোকে দূরে ঠেলে দেয়। সুতরাং মানুষের যে প্রেরণাদায়ী বৈশিষ্ট্য তার অব্যাহত বিকাশই সকল পতন রোধ করতে সক্ষম। আমরা মানুষের এই চিরন্তুন শুভ শক্তির জাগৃতি কামনা করি।