মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ

অধ্যক্ষ মোঃ ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক
পটভূমি ঃ বাংলাদেশ ভূ-খন্ডটি স্বাধীনতা পূর্বকালে ছিল পূর্ব পাকিস্তান। দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির ফলে মধ্যখানে ভারতের বিশাল এলাকা থাকাবস্থায় দুই প্রান্তে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত দু‘টি প্রদেশ নিয়ে গঠিত পাকিস্তানের অর্থনীতিতে গরিষ্ঠ অবদান রেখেও এ অঞ্চলের জনগণ সর্বক্ষেত্রে নিদারুণ বঞ্চনার শিকার হতে থাকেন। স্বপ্ন ভঙ্গের ক্ষোভ বিক্ষোভে রূপ নেয় বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে। চুয়ান্নর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁদেরকে সরিয়ে সামরিক আইন জারী করা হয়। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে চালু করা হয় বুনিয়াদী গণতন্ত্র। সে বুনিয়াদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ সোচ্চার হয়। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আর ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন রূপ নেয় উনসত্তরের উত্তাল গণঅভ্যুত্থানে। স্বৈরাচারী আয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হয়। সেনা প্রধান ইয়াহিয়া খান দায়িত্ব নিয়ে সার্বজনীন ভোটাধিকার পূনঃপ্রবর্তন করে নির্বাচন দিলে সত্তরে বিশাল বিজয় অর্জন করে আওয়ামী লীগ গোটা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। আবারও ষড়যন্ত্রের শুরু-ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে সামরিক জান্তা পশ্চিমা সেনা সমাবেশ করে। ছাত্র-জনতা-শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সামরিক জান্তা গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা শুরু করে।
বজ্রকন্ঠ ঃ একাত্তরের ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স আর বর্তমান ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় সারা বাংলার সর্বস্তরের জনগণ সমবেত হন। বৃটিশ এবং পাকিস্তান উভয় সরকারের আমলেই বঞ্চিত মানুষের পক্ষে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে জীবনের অধিকাংশ সময় কারাভোগকারী বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভায় আসলেন- ভাষণ দিলেন – যে ভাষণ ছিল অনন্য- যেন অন্য এক জগৎ থেকে এসে ফুটে বেরুচ্ছে তাঁরই কন্ঠ থেকে…… ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও গদিতে বসতে পারি নাই।…… আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাঁকে (ইয়াহিয়া খান) অনুরোধ করলাম, ১৫ ফেব্রুয়ারী তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না ………. আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়- তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং ………. প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। সেই বজ্রকন্ঠের কালজয়ী ভাষণে বাঙালি জাতি উদ্দীপ্ত হয়েছিল- ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল – সারা বাংলার হিন্দু-মুসমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান মিলে মিশে একাকার হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
প্রবাসী সরকার ঃ ২৫ শে মার্চের কালো রাত্রিতে পাক বাহিনী ঢাকায় নিরস্ত্র মানুষের উপর বর্বর হামলা চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করে সর্বত্র তার বার্তা পাঠান। তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়। বাঙালি সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যসহ ছাত্র তরুণেরা আওয়ামী লীগের নেতুত্বে প্রত্যেক জেলা, মহকুমা, থানা ইত্যাদি স্থানে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। দলে দলে সাধারণ মানুষ পাকিস্তানীদের অত্যাচারের ভয়ে দেশের অভ্যন্তর থেকে এসে সীমান্তের এপারে ওপারে জড়ো হন। এপ্রিলে মেহেরপুরের আ¤্রকাননে প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়। কারারুদ্ধ বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি আর সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করে, তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী আর কর্ণেল আতাউল গণি ওসমানী (জন্মসূত্রে       সুনামগঞ্জের সন্তান) প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন। বিদেশে বিশেষ দূতের দায়িত্ব পান সুনামগঞ্জের সুসন্তান এম এন এ আব্দুস সামাদ আজাদ। বিদেশে কর্মরত বাঙ্গালী কূটনীতিকদের অধিকাংশ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন। সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী তাদের মধ্যে অন্যতম। সীমান্তের ওপারে বেশ কয়েকটি  ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করে ছাত্র তরুণদের  গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং করানো হয়। বিভিন্ন দেশের বিবেকবান মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বক্তব্য বিবৃতিদান এবং শরণার্থীদের সাহায্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে থাকেন। ভারত বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করে সর্বাতœক সহযোগিতা করতে থাকে।
সুনামগঞ্জে সংগ্রাম পরিষদ ঃ সুনামগঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু ‘৭১ এর মার্চ এর প্রথম থেকেই। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রেরণায় ছাত্ররা কাঠের তৈরী ডামী রাইফেল বানিয়ে ট্রেনিং শুরু করেন। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা ৪ মার্চ পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল বৃত্ত ও সবুজ বেষ্টনী সম্বলিত স্বাধীন বাংলার পতাকা মহকুমা প্রশাসক অফিস ও থানার সামনে উড়িয়ে দেন যা ২৭ মার্চ পর্যন্ত উড়তে দেখা গেছে। ২৭ মার্চ তারিখে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সারা বাংলাদেশের মত সুনামগঞ্জেও সত্তরের নির্বাচিত নিন্মবর্ণিত এম এন এ, এম পি এ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় ঃ
দেওয়ান ওবায়দুর রাজা চৌধুরী – এম এন এ – আহবায়ক
আব্দুস সামাদ আজাদ – এম এন এ – সদস্য
আব্দুল হক – এম এন এ – সদস্য
আব্দুল হেকিম চৌধুরী – এম পি এ  – সদস্য
আব্দুর রইছ – এম পি এ  – সদস্য
আব্দুজ জুহুর – এম পি এ  – সদস্য
শামসু মিয়া চৌধুরী – এম পি এ  – সদস্য
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত – এম পি এ  – সদস্য
হোসেন বখত – আওয়ামী লীগ নেতা – সদস্য
আলফাত উদ্দিন আহমদ – ভাসানী ন্যাপ নেতা – সদস্য
মো. আলী ইউনূস – মোজাফফর ন্যাপ নেতা- সদস্য।
সুনামগঞ্জে প্রতিরোধ যুদ্ধ ঃ ২৭ মার্চেই পাক সেনাদের ১১ সদস্যের একটি দল ক্যাপ্টেন মাহবুব (বাঙালি, বাড়ী-বরিশাল) এর নেতৃত্বে সুনামগঞ্জ এসে জুবিলী হাইস্কুল সংলগ্ন সার্কিট হাউজে অবস্থান নেয়। শহরের মুক্তিকামী ছাত্র-তরুণ-জনতার সাথে তাদের যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ মার্চ সকাল ১১ টায়। বাঙালি ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ সদস্যগণ মুক্তিকামী জনতার পক্ষে কিছু অস্ত্রসহ যোগ দেন। আনসার সদস্য আবুল হোসেন যুদ্ধরত অবস্থায় শাহাদাৎ বরণ করেন। পাকসেনাদের গুলিতে আহত রিক্সাচালক গণেশ দাশ হাসপাতালে মারা যান। রাতে ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পাকসেনারা সিলেটের দিকে পালাতে থাকলে মুক্তিসেনাদের সাথে আবারও যুদ্ধ হয়। এতে একজন বাঙালি ইপিআর সদস্য শহীদ হন এবং একজন পাকসেনা আহত অবস্থায় বন্দী হলে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। পরবর্তীতে আহত পাকসেনা মারা যায়। শহরের সকল কার্যক্রম সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে থাকে। ২৮ এপ্রিল পাকসেনারা ছাতক থানা শহর দখল করে ব্যপক হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ চালায়। ছাতকের এম পি এ শামসু মিয়ার চৌধুরীর পিতা ও ভাইসহ অনেক নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। এ সময় কৌশলগত কারণে সংগ্রাম পরিষদের অফিস সুনামগঞ্জ শহর থেকে সরিয়ে রঙ্গারচরে নেয়া হয়। ১০ মে দুই শতাধিক পাকসেনা ৩ টি দলে ভাগ হয়ে ৩ দিক দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। এতদিন ঘাপটি মেরে থাকা কিছু লোক তাঁবেদার হয়ে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠন করে। শুরু হয় হত্যা, ধর্ষণ অগ্নিসংযোগ আর লুটতরাজের নৃশংস কার্যকলাপ। সংগ্রাম পরিষদের কার্যালয় শেষবারের মত স্থানান্তরিত হয় সীমান্তবর্তী বালাটে।
মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ও শরণার্থী ঃ মুক্তিযোদ্ধোদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জোয়াই হিলে ইকো ওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে। কিশোরগঞ্জের আব্দুল হামিদ (বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি), সিলেটের দেওয়ান ফরিদ গাজী, সুনামগঞ্জের দেওয়ান ওবায়দুর রাজা চৌধুরী, ছাতকের আব্দুল হক, দিরাই-শালার সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখ এমএনএ/এমপিএ গণের প্রেরণায় ছাত্র তরুণেরা ইকো-ওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণে যেতে থাকেন। প্রথম ব্যাচে কিশোরগঞ্জের, সিলেটের, সুনামগঞ্জের, ছাতকের, দোয়ারাবাজারের মোট ৫টি গ্রুপের প্রায় শ’খানেক মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে  প্রতি সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে শুনে রক্ত ঝরানো বজ্রশপথে বলীয়ান হতেন সবাই। এরপর ব্যাচের পর ব্যাচ ট্রেনিং চলতে থাকে। বর্বর পাক সেনা ও তাঁবেদার রাজাকারদের নিষ্ঠুর নির্যাতন থেকে পরিত্রাণের জন্য ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দলে দলে মানুষ সীমান্তের দিকে ছুটে গিয়ে আশ্রয় নেন ভারতীয় শরণার্থী শিবির এবং মুক্তাঞ্চলের বাড়ী ঘরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী বাঙালিরা শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাহায্য পাঠাতে শুরু করেন। মহেশখলা, বালাট, সেলা, ভোলাগঞ্জ, ডিংরাই, ইছামতি, মাইলাম, পানছড়া, মনাই, রাণীগঞ্জ, চেরাপুঞ্জী, ঘোমাঘাট, হাফলং, বড়ছড়া, লালপানি প্রভূতি স্থানে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সাহায্য দ্বারা শরণার্থী শিবির পরিচালিত হয়।
সুনামগঞ্জে গেরিলা যুদ্ধ ও সম্মুখ যুদ্ধ ঃ জুন মাসে প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাগণকে ৩০৩ রাইফেলসসহ বালাট, সেলা ও ভোলাগঞ্জে প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে সত্তরের এম পি এ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আব্দুজ জহুরের প্রচেষ্টায় টাকেরঘাটেও পাঠানো হয়। প্রথমাবস্থায় মিত্র বাহিনীর কমান্ডারগণের পারামর্শ ও নির্দেশনা অনুসরণ করে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পাকসেনা অবস্থান লক্ষ্য করে মুক্তিযোদ্ধারা শুধু  ঐরঃ ্ জঁহ পদ্ধতির গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। তৎকালীন মহকুমা শহর সুনামগঞ্জে ও বিভিন্ন থানায় পাকসেনা অবস্থানে অতর্কিত আক্রমণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ তাদেরকে ব্যতিব্যস্ত ও আতংকিত করে তোলেন। জুলাই মাসের মধ্যভাগে সারাদেশের যুদ্ধ এলাকাকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। সুনামগঞ্জ ৫নং সেক্টরের আওতাভূক্ত হয় এবং মেজর মীর শওকত আলী সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হয়ে আসেন। সুনামগঞ্জের টাকেরঘাট, বালাট, সেলা, ভোলাগঞ্জ এবং সিলেটের ডাউকি ও  মুক্তাপুর মোট ৬টি সাবসেক্টর ৫নং সেক্টরের অন্তর্ভূক্ত হয়।
উপর্যুক্ত সাব-সেক্টরসমূহ যথাক্রমে সাবসেক্টর কমান্ডার হিসাবে টাকেরঘাটে প্রথমাবস্থায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও পরবর্তীতে মেজর মুসলিম উদ্দিন, বালাটে প্রথমাবস্থায় ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন ও পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন মোত্তালিব, সেলায় ক্যাপ্টেন আবু সৈয়দ হেলাল উদ্দিন, ভোলাগঞ্জে প্রথমাবস্থায় নাজিম কায়েস চৌধুরী ও পরবর্তীতে ইঞ্জিনিয়ার নাজমুল আহসান মোঃ আলমগীর কমান্ড করে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। টাকের ঘাটের ০৫ টি কোম্পানীতে ১২৯৭ জন, বালাটে ০৮ টি কোম্পানীতে ১৭৩৯ জন, সেলায় ০৮ টি কোম্পানীতে ১৫১৬ জন এবং ভোলাগঞ্জে ০৮ কোম্পানীতে ১২৩২ জন বীরমুক্তিযোদ্ধা সশ¯্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া মেজর শাফায়াৎ জামিলের কমান্ডে থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের আলফা, ব্রাভো, চার্লি ও ডেল্টা কোম্পানীর সৈনিকগণ ছাতক অপারেশনসহ সেলা ও ভোলাগঞ্জ সাবসেক্টরে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ জেলায় সংঘটিত উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ সমূহের মধ্যে জামালগঞ্জের যুদ্ধ, সদরপুরের যুদ্ধ, মাখাল কান্দির যুদ্ধ, তাহিরপুরের যুদ্ধ, সুলেমানপুরের যুদ্ধ, সাচনাবাজার যুদ্ধ, কাউকান্দির যুদ্ধ, বীরনগর ও সিশকা যুদ্ধ, দিরাই থানা আক্রমণ, বেহেলী ক্যাম্পের লড়াই, জগন্নাথপুর থানা আক্রমণ, বানিয়াচং ও নবীগঞ্জ অভিযান, দাস পার্টির আজমিরিগঞ্জ অভিযান, বেরীগাঁও আক্রমণ, উজানীগাঁও যুদ্ধ, আহসান মারা অভিযান, বিরামপুর অপারেশন, সৈয়দপুর-নলুয়া যুদ্ধ, রাজাবাজের যুদ্ধ, নীলপুরের মাইন অপারেশন, আহসানমারা পাকসেনাদের জীপ ধ্বংসের অভিযান, মুসলিমপুরের যুদ্ধ, কৃষ্ণতলার যুদ্ধ, মঙ্গলকাটা অপারেশন, আমবাড়ি আক্রমণ, ভাদেরটেক দখল-পূনর্দখলের যুদ্ধ, অপারেশন গণিগঞ্জ, ঝরঝরিয়া যুদ্ধ, ছাতক অপারেশন, লক্ষীপুরের যুদ্ধ, সুলতানপুরের যুদ্ধ, বেতুরা আক্রমণ, চরবাড়–কা আক্রমণ, টেংরাটিলার যুদ্ধ, নৈনগাঁও ও মুরাদপুরে গ্যাসপাইপ ডেমোলেশন, নরসিংপুরের যুদ্ধ, বেটিরগাঁওয়ের যুদ্ধ, বালিউরার যুদ্ধ, মহব্বতপুরের যুদ্ধ, বৃটিশ সড়কের যুদ্ধ, ডাবর ফেরী ধ্বংস, জাউয়া সেতু ধ্বংস, ঝাওয়া রেল ও সড়ক সেতু ধ্বংস, পীরেরটিলা আক্রমন, তেগাঙ্গার যুদ্ধ, রাজাকার ক্যাম্প ধ্বংস, বুড়কির যুদ্ধ, কালারুকা যুদ্ধ, গোবিন্দগঞ্জ অভিযান, গৌরিনগরের যুদ্ধ, মোলারগাঁও যুদ্ধ, চ্যাঙ্গেরখালের যুদ্ধ, আলীনগর অপারেশন, আফজালাবাদ রেলষ্টেশন অভিযান, বুড়াইরগাঁও যুদ্ধ অন্যতম। রক্তক্ষয়ী এসকল যুদ্ধে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং বিপুল সংখ্যক পাকসেনা ও রাজাকার নিহত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসী যুদ্ধের মাধ্যমে চুড়ান্ত বিজয়ের ১০ দিন পূর্বে ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ শহরসহ জেলার উল্লেখযোগ্য বিশাল এলাকা থেকে হানাদার পাকসেনারা বিতাড়িত হয়। বিজয়ের আনন্দ এবং জনগণের স্বতফূর্ত সহযোগিতায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা চলতে থাকে।  এ যাবত প্রাপ্ত তালিকা অনুসারে সশ¯্র যুদ্ধে সুনামগঞ্জ জেলাবাসী ১৩০ জন এবং অন্য জেলার ৫৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ বরণ করেন। এ জেলার যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭৩ সনে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১ জনকে বীর উত্তম, ০৪ জনকে বীর বিক্রম এবং ০৯ জনকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়।
স্মৃতিসৌধ/স্মারক/ ট্রাস্ট/ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঃ  টাকেরঘাট সাব সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের সৌজন্যে গঠিত ‘মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্ট, সুনামগঞ্জ’  মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে এবং বিভিন্ন যুদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে। ১৯৭২ সনে সুনামগঞ্জ শহরের মধ্যে মেজর মোতালিবের উদ্যোগে সালেহ চৌধুরীর নকসা অনুসারে ‘শহীদ মিনার’ নির্মাণ করা হয়। একই সনে সুনামগঞ্জ কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসটির নাম রাখা হয় ‘শহীদ তালেব’ ছাত্রাবাস। ছাতকের গোবিন্দগঞ্জে এলাকাবাসীর উদ্যোগে ‘আব্দুল হক স্মৃতি কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এম সি এ শামসু মিয়া চৌধুরীর সহযোগিতায় ডাঃ মুছাব্বির বাঁশতলায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি কবর চিহ্নিত করেন। জায়গাটির নাম ‘হক নগর’ রাখা হয় এবং ‘হকনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরীকে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগজ্যোতি পাঠাগার’ ও বি ডি হলকে ‘শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তন’ নামকরণ করা হয়। ডলুরায় ৪৮ জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর মধুমিয়ার নিরলস শ্রমে পরিণত হয়েছে ‘মুক্তিযোদ্ধা শহীদদের মাজার’ হিসাবে। পরবর্তীতে জেলা পরিষদ এখানে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করে। ছাতকে প্রজেশ কুমার দাস এর দানকৃত ভূমিতে নির্মিত হয় ‘ছাতক থানা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’। ১৯৮০ সনে শ্রীরামসী স্কুলের পাশে গণহত্যায় শহীদদের ‘শহীদ স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণ করা হয়। রাণীগঞ্জে একই ভাবে নির্মিত হয়েছে একটি ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ”। ১৯৯০ সনে উপজেলা চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান মানিক ছাতকের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণকে সাথে নিয়ে মাধবপুরের বধ্যভূমি চিহ্নিত করে সীমানা দেয়াল নির্মাণ করে ‘শিখা সতের’ নামকরণ করেন এবং তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন ডিজাইনে পূনঃনির্মাণ করেন। এখানে জগন্নাথপুরের ১৭ জন ছাত্র তরুণ বেতুরার খেয়া (সুরমা নদীতে) পার হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্তের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় দালাল মতছির আলী (ফকির) ধোকায় ফেলে পাক সেনাদের হাতে তুলে দিলে সকলকে হত্যা করে একই গর্তে পুঁতে রাখা হয়েছিল। ১৯৯১-৯২ সনে সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের সৌজন্যে নির্মিত হয় ‘তালেব-গিয়াস-জগৎজ্যোতি স্মৃতি  স্তম্ভ”। সাচনা বাজারের পাশে নির্মিত হয়েছে একটি স্মৃতি স্তম্ভ। ১৯৯৬ সনে লক্ষ্মীপুরে স্থাপিত হয় ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল-খসরু হাই স্কুল’। ১৯৯৬ – ৯৭ সনে মুহিবুর রহমান মানিক এমপি ‘বাঁশতলা হকনগর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সৌধ’ এর সীমানা দেয়াল ও গেট নির্মাণের ব্যবস্থা সহ ৫ নং সেক্টর সদর দপ্তরের পুরো এলাকার বাউন্ডারী নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৯৯-২০০০ সনে স্থানটি পরিদর্শন করে বি ডি আর ডিজি মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান বীর উত্তম উপর্যুক্ত স্মৃতি সৌধের পাশে একটি গোলঘর সহ হকনগর বাজার থেকে স্মৃতি সৌধ পর্যন্ত কাঁচা সড়ক ও একটি কালভার্ট নির্মাণ করে দেন। ১৯৯৯-২০০০ সনে বড়খাল স্কুল ও কলেজে কর্ণেল হেলাল নিজ অর্থায়নে ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল বিজ্ঞান ভবন’ নির্মাণ করে দেন। কর্ণেল হেলাল ১৯৯৭-৯৮ সনে ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল কল্যাণ প্রকল্প’ চালু করে দুই শতাধিক সাথী অসহায় মুক্তিযোদ্ধাকে কয়েক বছর পর্যন্ত মাসিক ৩০০/- থেকে ৫০০/- টাকা পর্যন্ত নিজ তহবিল থেকে ভাতা দেন। ১৯৯৮ সনে তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল শিক্ষা ট্রাষ্ট’ গঠন করে সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বার্ষিক এককালীন বৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন। জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ ট্রাষ্টি বোর্ডের সভাপতি হিসাবে প্রতি বছর আনুষ্ঠানিকভাবে এ বৃত্তি প্রদান করেন। ২০০৬ সনে জেলা প্রশাসক জাফর সিদ্দিক সুনামগঞ্জ শহরের শহীদ স্মারকটির সামনে মেজর মোতালিবের নামে শিলালিপি স্থাপন করেন। একই সনে সুনামগঞ্জে জেলা প্রশাসক এবং জেলা দায়রা জজ আদালতের সামনে নির্মাণ করা হয় ‘শহীদ স্মৃতি সৌধ’। এখানে স্থান পেয়েছে গেজেটভূক্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম। পিটিআই এর উত্তর পশ্চিমাংশে বধ্যভূমির শহীদদের স্মরণে নির্মিত  হয়েছে একটি স্মারক। ২০০৭-০৮ সনে মুক্তিযুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার লেঃ কর্ণেল আবু সৈয়দ হেলাল উদ্দিন বাঁশতলা হকনগরে শহীদ স্মৃতি সৌধের পাশে নিজ অর্থায়নে নির্মাণ করেন একটি শহীদ স্মৃতি স্মারক। ২০১০ সনে বাঁশতলায় এলাকাবাসীর উদ্যোগে ‘বাঁশতলা চৌধুরীপাড়া শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯-১৩ মেয়াদে এম পি মুহিবুর রহমান মানিকের প্রচেষ্টায় পুরো এলাকাটির সীমানা দেয়াল, কবরগুলোকে টাইলস দিয়ে মোড়ানো, একটি মসজিদ, একটি ওয়াশ ব্লক ও অজুখানা, বঙ্গবন্ধু ও আব্দুল হক এর ম্যুরাল, একটি রেস্টহাউজ, একটি বিজয় মঞ্চ নির্মাণসহ রাস্তাটি পাকা করা হয়। ২০১১ সনে তাঁরই প্রচেষ্টায় টেংরাটিলায় মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্য নির্মিত হয় ‘বিজয় ৭১’ নামে। ২০১৪ সনে যুদ্ধের স্মৃতি জাগরুক রাখতে মহব্বতপুরে নিজ অর্থায়নে কর্ণেল হেলাল নির্মাণ করেন ‘স্মৃতি দীপ্তিমান’। সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের অর্থায়নে ব্যারিস্টার এম. এনামুল কবীর ইমনের উদ্যোগে তাহিরপুর উপজেলার টাকেরঘাট, ধরমপাশা উপজেলার মহেশখলা ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরায় ‘মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণ করা হয়েছে এবং সুনামগঞ্জ সিলেট সড়কের জগন্নাথপুর যাওয়ার প্রবেশ পথে আব্দুর রইছ এমপিএ (৭০/সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর) এর নামে নির্মিত হয়েছে ‘আব্দুর রইছ চত্ত্বর’। পৌর মেয়র আয়ুব বখ্ত জগলুলের উদ্যোগে শহরের প্রাণকেন্দ্র হাসন নগরে নির্মিত হয়েছে ‘হোসেন বখত চত্ত্বর’। আহসানমারা ব্রিজের পাশে শহীদ তালেব, কৃপেন্দ্র ও একজন অজ্ঞাত মুক্তিযোদ্ধার স্মরণে (যাদেরকে পাকসেনারা হত্যা করে উক্ত স্থানে লাশগুলো ফেলে যায়) এনামুল কবীর ইমন নির্মাণ করেছেন একটি ‘স্মৃতি ভাস্কর্য’। দিরাই উপজেলার চরজটি গ্রামে ২০১৫ সনে সালেহ চৌধুরী নিজ অর্থায়নে হামিদ, হান্নান, মকদ্দছ ও হেমেন্দ্র এর স্মরণে ‘দীপ্ত স্মৃতি’ নির্মাণ করেন। মহকুমা ছাত্রলীগ সেক্রেটারী বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ তালেব উদ্দিন আহমদকে হত্যা করে তাঁকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো শহরের মানুষকে দেখিয়ে পাক সেনারা আহসানমারায় ফেলেছিল যা সুনামগঞ্জের জন্য একটি অনন্য ও অসাধারণ ঘটনা – কাহিনীটি আলোচনা করে সুনামগঞ্জ জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় ২০১৬ সনে ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক আহসানমারায় নির্মিত সেতুটির নাম ‘শহীদ তালেব সেতু’ রাখার প্রস্তাব করলে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় ও মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা হয়।