মুখরিত প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন

বিশেষ প্রতিনিধি
যেন অন্য রকমের অনুভূতি। কেউ কেউ নিজেরাই স্কুল সাঝানোর সরঞ্জাম নিয়ে এসেছে। মনের আনন্দে সাজাচ্ছিল স্কুল আঙ্গিনা। শিক্ষকরা ফুল দিয়ে বরণ করছিলেন শিক্ষার্থীদের। স্কুলের স্টাফরা স্যানিটাইজার নিয়ে ফটকে দাঁড়ানো। আনন্দে উদ্বেলিত সকলেই। যেন এই দিনটি কাঙ্খিত ছিলো শিক্ষাঙ্গনের। রোববার সকাল ৯ টায় সুনামগঞ্জ সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পরিবেশ ছিল এমন।
বিদ্যালয়ের ১০ ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিকুন্নাহারর মীম বললো, কতদিন পর সকলের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আর যেন এমন পরিস্থিতি না হয়। আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠান খোলাই দেখতে চাই। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই স্কুলের আঙ্গিনায় থাকবো আমরা। বিদ্যালয়ের প্রতিটি কোনে কোনে প্রাণের উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছিল।
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী তোহফাতুল জান্নাহ চৌধুরী, তাফহিমা মোর্শেদ আদি, সোনিয়া মেহজাবিন, আইরিন জাহান অ্যানি, ফাতেমা তুজ জোহরা, অনন্যা রায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার স্লোগান সংবলিত হাতে লিখা ফেস্টুন স্কুলের প্রবেশদ্বারসহ নানা স্থানে লাগানোর কাজ করছিল। সকলেই বললো, আমরা নিজের উদ্যোগেই সকাল থেকে এসে করছি এসব কাজ, স্যাররা উৎসাহিত করেছেন। শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দেবার পর থেকেই আমরা উদগ্রীব ছিলাম, স্কুলে আসবো প্রথমদিন সকাল থেকেই সাঝাবো, নেচে গেয়ে আনন্দ করবো।
বড়দের সঙ্গে কাজে ও আনন্দে সামিল হয়েছিল ৯ম শ্রেণির ¯েœহা, ৭ম শ্রেণির লামিয়া ও তোবা।
লামিয়া ও তোবা বললো, আমাদের এই আনন্দ যেন আর কখনোই না থামে। করোনা দূর না হওয়া পর্যন্ত আমরা মাস্ক পড়বো, স্যানিটাইজার ব্যবহার করবো, বারে বারে হাত ধুয়ে সতর্ক থাকবো।
সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজ মো. মাসহুদ চৌধুরী বললেন, আমরা শিক্ষকরাও আনন্দিত। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পাঠদান করা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে একই রকমের পরিবেশ ছিল হাওরাঞ্চলের অর্থাৎ হাওরের পাড়ে পাড়ে থাকা ২৩৩ টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৪৭৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে আসা উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্যনিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার দিকে সর্বোচ্চ নজর ছিল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বার রঙিন বেলুন দিয়ে সজ্জিত করার পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের বরণ করতে শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রস্তুতিও ছিল ব্যাপক। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অভিভাবক সকলের মুখেই ছিল মাস্ক। শিক্ষার্থীরা যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেছে। থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপা হয়েছে। হ্যান্ডস্যানিটাইজার ব্যবহারের পর নির্ধারিত আসনে বসানো হয় শিক্ষার্থীদের। শ্রেণিকক্ষেও ছিল পারস্পরিক নিরাপদ দূরত্ব।
সুনামগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, কালীবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শহর বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সৃজন বিদ্যাপীঠ, ড্যাফডিল কিন্ডারগার্টেন, আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতন, ফারিহা একাডেমী, সুনামগঞ্জ পৌর কলেজ, বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়, এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়, বিয়াম ল্যাবরেটরী স্কুল সহ বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষার্থীদের বরণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষকবৃন্দ প্রিয় শিক্ষার্থীদের ফুলেল শুভেচ্ছা ও চকলেট বিতরণ করেছেন।
কালীবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নমিতা রানী সরকার বলেন, স্কুল বন্ধ থাকায় পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়েছিলো। নতুন করে সরকারি নিময় মেনে স্বাস্থ্যব্যাধি মেনে দীর্ঘ ১৮ মাস পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলে দেয়ায় খুব ভালো লাগছে। আজকে স্কুেল এসে ছাত্র-ছাত্রীরা সালাম করছে। ঘরবন্দী থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দ উৎসবমুখর পরিবেশে ক্লাস করতে আসছে। এ যেন আঁধার পেরিয়ে আলোর দেখা মিলেছে।
শহর বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তার খানম বলেন, স্কুলে প্রবেশের সাথে সাথেই থার্মোমিটার দিয়ে শিক্ষার্থীদের তাপমাত্রা মাপা হয়েছে। হাতে হ্যান্ড সেনিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। সাবান রাখা হয়েছে ভালোভাবে হাত পা ধোয়ার জন্য। কখনও এরকম উৎসবমুখর পরিবেশ দেখি নাই। আমার নিজের কাছেও অনেক ভালো লাগছে।
সৃজন বিদ্যাপীঠের প্রিন্সিপাল জাকিয়া নাসরিন বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে সৃজন বিদ্যাপিঠে আজকের ক্লাস শুরু হয়েছে। শীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ দেখে খুব ভালো লাগছে। প্রায় ১৮ মাস পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবার নতুন করে চালু হয়েছে। এ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাওয়া। আমাদের স্কুলে সরকারি নির্দেশনা ফলো করে ক্লাস শুরু করা হয়েছে। একটা ব্রেঞ্চে ২ জন করে শিক্ষার্থী বসেছে। বাধ্যতামূলক মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হাত-পা ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ড্যাফডিল কিন্ডারগার্টেনের প্রিন্সিপাল অজিত কুমার দাস বলেন, শিক্ষার্থীরা খুব খুশি হয়েছে, স্কুল খোলে দেওয়াতে। যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাওয়া।