মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে না

বিশেষ প্রতিনিধি
জেলায় উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। কিন্তু মাধ্যমিকে যেভাবে শিক্ষার্থী গড়ে ওঠা প্রয়োজন, সেভাবে গড়ে ওঠছে না। শিক্ষক সংকটের কারণেই এমন অবস্থা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। শিক্ষকরা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো বাড়ছে, কিন্তু পদ শূন্যতায় ভুগছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
করোনাকালে সারা দেশের ন্যায় সুনামগঞ্জের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য জেলা শহরের মতো এখানে অনলাইনে পাঠদানও হয় নি। সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিলে নতুন বছরেই শিক্ষক সংকটে পড়তে হবে সরকারি স্কুলগুলো। সুনামগঞ্জে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হচ্ছে, এ বছরই শুরু হবে পাঠদান। হচ্ছে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^ বিদ্যালয়ও। এসব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করতে পারবে তো? এমন আলাপচারিতা এখন জনে জনে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষক সংকটের কারণে মাধ্যমিকে যেভাবে শিক্ষার্থীদের গড়ে ওঠা প্রয়োজন, সেভাবে গড়ে ওঠছে না শিক্ষার্থীরা। দায়িত্বশীলরা বলছেন, সুনামগঞ্জের বাসিন্দা শিক্ষকরা এখানকার সরকারি স্কুলে থাকছেন না। বড় শহরে তদবির করে বদলি হচ্ছেন। কর্তৃপক্ষও তাদের সরিয়ে নিতে সহায়তা করছেন। এই অবস্থা থেকে মুক্ত না হলে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেছেন শিক্ষকরা।
জেলার ৫ টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে জগন্নাথপুরের দুটিতে করোনার আগে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের চাঁদায় খ-কালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করানো হয়েছে। খ-কালীন শিক্ষকদের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে।
করোনার আগেও তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬৫০ শিক্ষার্থীর পাঠদান করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ ৫ শিক্ষক। কেউ একজন না থাকলে, এক শ্রেণির পাঠদান বন্ধ রয়েছে। দুইজন না থাকলে দুই শ্রেণির পাঠদান বন্ধ ছিল।
সুনামগঞ্জ শহরের দুটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটিতে ৫২ জনের স্থলে আছেন ৩২ জন। আরেকটিতে ৫২ জনের স্থলে আছেন ৩৫ জন। এই অবস্থায় জেলার সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দান করা কঠিন বলে মন্তব্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের। বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরুর আগেই শিক্ষক সংকট দূর করার দাবি জানিয়েছেন।
জেলার জগন্নাথপুর স্বরূপচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের ১০ টি পদ রয়েছে। বিদ্যালয়টি ১৯৮৬ ইংরেজি সনে সরকারিকরণ হবার সময় এই পদ নিয়ে সরকারিকরণ হয়েছিল। এখনো ১০ জনেরই পদ আছে। অথচ এই মানের বিদ্যালয়গুলোতে কমপক্ষে ২৪ জন শিক্ষক-কর্মচারীর পদ থাকার কথা। এই বিদ্যালয়ের ৬ শিক্ষকের পদ শূন্য। ৪ জন সহকারী শিক্ষক আছেন, এরমধ্যে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। ৩২০ জন শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে করোনার আগে পাঠদান হয়েছে খ-কালীন ৩ শিক্ষক দিয়ে। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী’র ২ টি পদের ১ টি শূন্য। চতুর্থ শ্রেণির একটি পদ থাকলেও অনেক দিন ধরেই এই পদ শূন্য।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছায়াদ আলী জানালেন, পদ সৃজন করার কথা অনেক আগে থেকে বলা হচ্ছে, কিন্তু পদ সৃজন হচ্ছে না।
ছায়াদ আলী বললেন, ‘দীর্ঘদিন হয় এই অবস্থায় চলায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না, স্কুলের অবকাঠামোর কোন সংকট নেই। অবকাঠামো দেখলে কেউ বুঝতেই পারবেন না এখানে শিক্ষক মাত্র ৪ জন।
জগন্নাথপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েরও একই অবস্থা। বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষকসহ ৯ শিক্ষকের পদ থাকলেও প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ ৫ জনেরই পদ শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির একটি পদের একটি-ই শূন্য। চতুর্থ শ্রেণির দুটি পদের দুটিই শূন্য।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জয়ন্ত শেখর রায় বলেন, ‘মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের যেভাবে গড়ে ওঠা প্রয়োজন, সেভাবে গড়ে ওঠছে না। এই অবস্থার জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা শিক্ষক সংকট। অবকাঠামো আছে পর্যাপ্ত, অথচ শিক্ষক নেই। আরও নতুন অবকাঠামো করা হবে, কিন্তু শিক্ষক এক বছরের আগে হবে বলে মনে হয় না। তাঁর মন্তব্য শিক্ষক থাকলে গাছ তলায়ও পাঠদান করা যেত।
তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ১১ জন শিক্ষক হলেও বিদ্যালয়ে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন। যেখানে ২৭ জন শিক্ষকের প্রয়োজন, সেখানে আছেন ৫ জন।
সুনামগঞ্জ সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী’র সংখ্যা ১২০০ জন। শিক্ষক সংকটে ভুগছে জেলার এই পুরোনো এই বিদ্যাপীঠও। বিদ্যালয়ে ৫২ শিক্ষকের পদ থাকলেও আছেন ৩২ জন। এর মধ্যে প্রেষণে আছেন ১ জন এবং সঞ্জয় চক্রবর্তী নামের এক শিক্ষক ৫ বছর ধরে বিনা অনুমতিতে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজ মো. মাশহুদ চৌধুরী বলেন,‘ শিক্ষার গুনগত মানোন্নয়ন করতে হলে শিক্ষকের সংকট দূর করতে হবে। বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ জরুরি। শিক্ষকের মানোন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষকের ৫২ টি পদের মধ্যে আছেন ৩৫ জন।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফয়জুর রহমান বললেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা রয়েছে আমাদের সবসময়ই। আরও ভাল করতে হলে শিক্ষক সংকট দূর করতে হবে। সুনামগঞ্জে বাড়ি এমন শিক্ষকরাও বড় শহরে বদলি হয়ে চলে যান। এমনটা বন্ধ করতে হবে। প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণের কাজও করতে হবে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সুনামগঞ্জের সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট শব্দটি না বলে, মহাসংকট বলতে হবে। সুনামগঞ্জের বাসিন্দা শিক্ষকরা এখান থেকে বদলি হয়ে বড় শহরে যাবার চেষ্টা করেন। এটি বন্ধ করতে হবে। বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিরও অনেক দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলোও কাটিয়ে ওঠা প্রয়াজন।