যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন…

স্টাফ রিপোর্টার
মৃত্তিকার বন্ধন থেকে রবীন্দ্রনাথ কত শতবার আমাদের নিয়ে গিয়েছেন ‘নীলাম্বরের মর্মমাঝে’। আবার যখন তিনি আমাদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন তখন এই মৃত্তিকাই স্বর্গের চেয়ে অধিকতর মধুময় হয়ে ওঠে’।
‘তারায় তারায় দীপ্তশিখার অগ্নি জ্বলে
নিদ্রাবিহীন গগনতলে-’
শুনে কি কল্পনা করতে পারি যে
‘ঐ আলোক-মাতাল ম্বর্গসভার মহাঙ্গন,
কোথায় ছিল কোন যুগে মোর নিমন্ত্রণ।’
তারপর যখন মনকে তৈরি করলুম। সেই স্বর্গসভার নব নব অভিজ্ঞতার জন্য তখন আবার হঠাৎ আমি
‘কালের সাগর। পাড়ি দিয়ে এলেম চলে
নিদ্রাবিহীন গগনতলে।’
তারপর এ-ধারার কি অপরূপ বর্ণনা
‘হেথা মন্দমধুর কানাকানি জলে স্থলে
শ্যামল মাটির ধরাতলে।
হেথা ঘাসে ঘাসে রঙিন ফুলের আলিম্পন
বনের পথে আঁধার-আলোয় আলিঙ্গন।’
কখনো স্বর্গে কখনো মর্ত্যে, আপনি অজানাতে এই যে মধুর আনাগোনা, মানুষকে দেবতা বানিয়ে, আবার তাকে দেবতার চেয়ে মহত্তর মানুষ করে তোলা-মাত্র কয়েকটি শব্দ আর একটুখানি সুর দিয়ে-এ আলৌকিক কর্ম যিনি করতে পারেন। তিনিই বিশ্বকর্ম মহাত্মা’। [সৈয়দ মুজতবা আলী, পঞ্চতন্ত্র – ১ম পর্ব ]
আজ বাইশে শ্রাবণ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। এমন ঘনঘোর বরিষায় বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল কিংবা বসন্তের আগমনী বার্তায় সবার আগে যে নামটি মনে আসে, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলার ঋতু, প্রকৃতি আর গ্রামীণ সৌন্দর্যকে সার্থকভাবে কাব্য, গীতির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি। কবিগুরুর প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা। অজ¯্র রচনায় বাংলার বর্ষাকে তিনি অনিন্দ্যসৌন্দর্য্য ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে প্রিয় ঋতুতেই নির্বাপিত হয়েছিল কবির জীবনপ্রদীপ। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদান রাখা এই কবির মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সেদিন শোকাহত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপারের কোলে/বাংলার কবি শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি তুমি চলে যাবে বলে/শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে।’ রবীন্দ্রনাথ অবশ্য জন্ম-মৃত্যুর মাঝে খুব সামান্যই তফাত দেখেছেন। আর তাই তো তিনি লিখেছেন, ‘মৃত্যু দিয়ে যে প্রাণের/মূল্য দিতে হয়/সে প্রাণ অমৃতলোকে/মৃত্যুকে করে জয়।’ আশি বছরের জীবন সাধনায় মৃত্যুকে নিয়ে গভীর জীবন তৃষ্ণায় তিনি লিখেছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’
আবার তিনিই বলেছেন, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,/ আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,/ চুকিয়ে দেব বেচা কেনা,/ মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা,/ বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে-/ তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে…’। ১৯১৬ সালের ৭ এপ্রিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বসে ‘বাউল’ রাগে ‘দাদরা’ তালে লিখেছিলেন তার অনুপস্থিতিময় ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনুভূতিতে ভরা এ সংগীত। কেউ তাকে মনে রাখুক বা না রাখুক, তাতে কিছু আসে যায় না বলে তিনি জানিয়ে গেলেও ৮০ বছর পরও তার প্রয়াণ দিবসে শোকাচ্ছন্ন হয় সারা বাংলা!
সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে কবিগুরুর ছোঁয়া লাগেনি। জীবন চলার পথের সব অনুভূতিকে বৈচিত্র্যময় ভাষা আর শব্দের মাধ্যমে কালি ও কলমে প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রেম, রোমাঞ্চ, ভালোবাসা কিংবা বিরহ প্রকাশে তিনি যেন অপরিহার্য। তাই তো বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মহীরুহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য নতুন রূপ লাভ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। তাঁর লেখা বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছে বাংলা সাহিত্যকে। সবার কাছেই তিনি মানবমুক্তির বারতা নিয়ে উদ্ভাসিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবির কিরণের মতোই আপন প্রতিভার আলোয় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে উদ্ভাসিত করেছিলেন। প্রায় একক প্রতিভায় তিনি বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদাপূর্ণ আসনে। কাব্য, সংগীত, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, শিশুতোষ রচনাসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখা তাঁর প্রতিভার স্পর্শে দীপ্তিমান হয়ে উঠেছিল। সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবনে কালজয়ী চিহ্ন রেখে গেছেন বলে তার সৃষ্টিকর্ম বারবার বাঙালি জাতির মানসপটে নিয়ে আসে তাকে।
‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি এবং প্রথম এশীয় হিসেবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লাভ করেন নোবেল পুরস্কার। নোবেল ফাউন্ডেশন তার এই কাব্যগ্রন্থটিকে বর্ণনা করেছিল একটি গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বল ও সুন্দর কাব্যগ্রন্থ রূপে। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে ওই উপাধি প্রত্যাখ্যানও করেন তিনি। জীবনের শেষ পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গভীর আগ্রহে চিত্রকলার চর্চা শুরু করেন। তাঁর এসব কাজ ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পকলায় ভিন্ন মাত্রা সংযোজন করেছে। সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি সমাজসংস্কার, শিক্ষাবিস্তার, কৃষি উন্নয়নসহ বিভিন্ন কর্মে নিজেকে জীবনব্যাপী সক্রিয় রেখে এক অনন্যদৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানে গানে বলেছিলেন-‘এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসিখেলায়/ আমি যে গান গেয়েছিলেম জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়। /মনে রেখো।’ বাঙালি মানসে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি চিরকালের, চিরজীবনের। তিনি মৃত্যুকে জীবনেরই অপর নাম হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। মানুষকে ভালোবেসে, মানুষের ভালোবাসা পাবার ঘটনা জীবনের ‘অমূল্য দান’ হিসেবে অকপটে বলেছেন। তিনি লিখেছেন-
‘আমার কীর্তিরে আমি করি না বিশ্বাস।
জানি কালসিন্ধু তা’রে
নিয়ত তরঙ্গঘাতে
দিনে দিনে দিবে লুপ্ত করি।
আমার বিশ্বাস আপনারে।
দুই বেলা সেই পাত্র ভরি’
এ বিশ্বের নিত্য সুধা
করিয়াছি পান।
প্রতি মুহুর্তের ভালোবাসা
তার মাঝে হয়েছে সঞ্চিত।
দুঃখভারে দীর্ণ করে নাই
কালো করে নাই ধূলি
শিল্পেরে তাহার।
আমি জানি যাব যবে
সংসারের রঙ্গভূমি ছাড়ি’
সাক্ষ্য দেবে পুষ্পবন ঋতুতে ঋতুতে
এ বিশ্বেরে ভালোবাসিয়াছি।
এ ভালোবাসাই সত্য, এ জন্মের দান।
বিদায় নেবার কালে
এ সত্য অম্লান হয়ে মৃত্যুরে করিবে অস্বীকার ॥’