রাজনীতির শেষ গন্তব্য সাধারণ জনতা

পরিবহন ধর্মঘটের ফলে সিলেটে বিএনপির সমাবেশে লোক¯্রােত একটুও কম হয়নি। পরিবহন ধর্মঘট দিয়ে যেটি হয়েছে তা হলো- আগের দিন থেকেই সমাবেশস্থল পরিপূর্ণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যে সমাবেশ কয়েক ঘণ্টার একটি কর্মসূচি ছিলো তাকে দুই দিনের কর্মসূচিতে পরিণত করা হলো। মাঝখান থেকে বিএনপি ধর্মঘটকে তাদের সমাবেশস্থলে বাধা দানের উপকরণ হিসাবে প্রচারের সুযোগ পেল। শুধু সিলেট বিভাগ নয়, এর আগে যেসব বিভাগীয় সমাবেশের জায়গায় পরিবহন ধর্মঘট আহুত হয়েছিলো সর্বত্রই একই দৃশ্য দেখা গেছে। যদিও পরিবহন ধর্মঘটকে পরিবহন খাতের দায়িত্বশীলরা সমাবেশের সাথে সম্পর্কিত নয় বলে দাবি করেছেন তবুও সমাবেশের আগের দিন থেকে সর্বত্র একই কায়দায় এই ধর্মঘট আহ্বানের ফলে বিএনপি এটিকে তাদের সমাবেশ করার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করার বিষয় হিসাবে প্রচার করার সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করেছে। একটি নিরীহ ধরনের সমাবেশ কর্মসূচিকে বেগবান করার ষোলকলা পূর্ণ করেছে পরিবহন ধর্মঘট। বিএনপি পরিবহন ধর্মঘটকে নিজেদের দলীয় সংহতি, দৃঢ়তা ও শক্তিমত্তা দেখানোর সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং তাতে শতভাগ সফল হয়েছে। সুতরাং তথাকথিত এসব পরিবহন ধর্মঘট কেবল সংশ্লিষ্ট এলাকার চলাচলকারী জনসাধারণের জন্য দুই বা এক দিনের চরম দুর্ভোগ হিসাবেই প্রতিভাত হয়েছে। এই ধর্মঘট দিয়ে মূলত কোনো কিছুই অর্জন করা যায়নি।
রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হয়। বিভাগীয় সমাবেশগুলোর মধ্য দিয়ে বিএনপি জনসংযোগ ও সাংগঠনিক অবস্থার যে প্রমাণ রাখল সেটিকে জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক কর্মসূচি দিয়েই জবাব দিতে হবে। রাজনীতির শেষ গন্তব্য সাধারণ জনতা। বিশেষ করে ভোটের রাজনীতিতে জনসন্তুষ্টির কোনো বিকল্প নেই। যে বিএনপি বছরখানের আগেও সভাসমাবেশ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতো সেই সংগঠনটি হঠাৎ কোন্ জাদুকাঠিস্পর্শে এতোটা সবল হয়ে উঠল তার জবাব খোঁজতে হবে। আমরা জানি গত এক বছর যাবৎ দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনকে অতীষ্ট করে তুলেছে। এই অসন্তুষ্টি একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। বিএনপি সফলভাবে এই সংকটসহ সরকার ও সরকারি দলের অপরাপর ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাকে মানুষের কাছে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু সরকারি দলের বিশাল বিশাল সাংগঠনিক ইউনিটগুলো কার্যত জনগণের কাছে গিয়ে এই সংকটের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে অবহিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। মানুষের সাথে সম্পর্কহীন আয়েশিপনার কারণেই আজ ব্যাপক জনগোষ্ঠী বিরোধী সভা সমাবেশে যোগদান করছে। অথচ ক্ষমতাসীন দল হিসাবে তৃণমূলের মানুষের সাথে অনবরত যোগাযোগ স্থাপন, মতবিনিময় এবং উদ্বুদ্ধ করণের সুযোগ সবচাইতে তাদেরই বেশি ছিলো। সরকার দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে প্রচুর কাজ করে যা্েচ্ছ কিন্তু সমস্যা হলো দলটি এর জনতুষ্টির সুফলটি দলের অনুকূলে আনতে পারছে না। কেন এই সমন্বয়হীনতা তার কারণ খোঁজে বের করে দলকে জনগণের গভীরে পৌঁছে দিতে না পারলে সামনে দাঁত কামড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
আমরা চাই দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দল বেশি বেশি জনসম্পৃক্ত চরিত্র অর্জন করুক। তাহলেই আমরা যে গণতন্ত্র ও সুশাসনের কথা বলি তার পূর্ণতা ঘটবে। বলা ভালো, গত পঞ্চাশ বছরের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই সত্যই পরিস্কার হয় যে, জনগণ কখনও রাজনৈতিক দলগুলোর মূখ্য জায়গায় অধিষ্টিত হতে পারেনি। সকলেই মানুষকে কেবল নিজেদের ক্ষমতারোহণের হাতিয়ার হিসাবে বিবেচনা করেছে। এর বাইরে বিকল্প কোনো গণবান্ধব রাজনীতি শক্তি সঞ্চার করতে পারেনি। ফলে দেশের রাজনীতি একই ঘুর্ণাবর্তে বারবার ঘুরে চলেছে। এখন সময় এসেছে জনগণকে মূখ্য অবস্থানে রেখে চিন্তা-ভাবনা করার। এই কাজে যারা সফল হতে পারবে তারাই কেবল টিকে থাকার স্থায়ী ঠিকানা খোঁজে পাবে।