রাতের আঁধারে লাউগাছ কর্তন জাবেদ আলীদের স্বস্তিকর উৎপাদন পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে

রাতের আঁধারে সবজি ক্ষেত কেটে দিয়ে শত্রুতা মিটানো নেহায়েৎই কাপুরুষতার নামান্তর। শুধু কাপুরুষতা নয় এটি চরম অপরাধ। এরকম এক কা-ই ঘটেছে সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের অক্ষয়নগর গ্রামে। পার্শ্ববর্তী মুসলিমপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক জাবেদ আলী। নিজের কোনো জোতজমি নেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ফি বছর করেন সবজি চাষ। এবারও অক্ষয়নগর এলাকার কিছু জমি বর্গা নিয়ে তিনি চাষ করেছিলেন লাউ। এজন্য তিনি দাদন গ্রহণ করেছিলেন প্রায় চার লাখ টাকা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, শুক্রবার রাতে তার এই লাউ ক্ষেতের সবগুলো লাউগাছ কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্ত। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এজন্য জাবেদ আলী থানায় একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। অভিযোগপত্রে তিনি অক্ষয়নগর গ্রামের রুবেল মিয়া ও জুয়েল মিয়াকে দায়ী করেছেন। গণমাধ্যমকে জাবেদ আলী বলেছেন, শুক্রবার দিনের বেলা রুবেল মিয়া ক্ষেতে এসে তার নিকট লাউ ও শশা চায়। তিনি দেননি। এসময় রুবেলের সাথে তার কথা কাটাকাটি হয়। ক্ষিপ্ত হয়ে রুবেল জাবেদ আলীকে হুমকি দিয়ে যায়। পরদিন এসে তিনি দেখেন ক্ষেতের চার থেকে পাঁচ শ’ লাউ গাছ কাটা অবস্থায় পড়ে আছে। অভিযুক্ত রুবেল মিয়া জাবেদ আলীর সাথে কথা কাটাকাটির কথা স্বীকার করলেও তিনি লাউ গাছ কাটেননি বলে জানিয়েছেন। অবশ্য দোষী কখনও নিজের দোষ স্বীকার করে না। অবস্থাদৃষ্টে অনুমিত হয় রুবেল মিয়াই জাবেদ আলীর ভরা ক্ষেতের লাউ গাছগুলো কেটে দিয়ে নির্মমতার চরম উদাহরণ তৈরি করে গেছে।
আজ থেকে বছর চল্লিশেক পিছিয়ে গেলে সুনামগঞ্জে সবজি আবাদের হতাশাজনক চিত্র দেখা যেত। বাইরে থেকে সবজি না এলে স্থানীয় বাজারে কোনো ধরনের সবজি পাওয়া যেত না। জাবেদ আলীর মতো সংগ্রামী কৃষকরা পরিশ্রম করে জেলার সবজি উৎপাদনে বলা যায় বিপ্লব ঘটিয়েছেন। এখন জেলায় যে পারিমাণ সবজি উৎপাদন হয় তা দিয়ে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করার পরও বহু সবজি বাইরে বিক্রি করা যায়। সবজি উৎপাদন করে বহু লোক নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। দারিদ্র বিমোচনে সবজি চাষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু রুবেল মিয়ার মতো কিছু দুর্বৃত্ত যখন এক কৃষকের ক্ষেত ভর্তি লাউ গাছ কেটে নিয়ে শত্রুতা মিটায় তখন সবজি চাষে কৃষকের উৎসাহে ভাটা পড়বে, একথা সত্য। দরিদ্র কৃষক জাবেদ আলী বর্গা নেওয়া জমিতে লাউ ইত্যাদি চাষ করে পুরো বছর পরিবার পরিজনের মুখের অন্ন জুগানোর চিন্তা করেছিলেন। তার স্বপ্ন এক রাতের নির্মমতায় আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তিনি সবজি চাষের জন্য ঋণ নিয়েছিলেন, পাইকারদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা গ্রহণ করেছিলেন। জাবেদ আলীর চোখে এখন দুনিয়ার অন্ধকার নেমে আসবে এটা খুব স্বাভাবিক। এই দুর্বৃত্তপনার উপযুক্ত বিচার ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জাবেদ আলীর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিৎ। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সবিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে জাবেদ আলীরা উৎপাদনশীলতার প্রতীক। তাঁরা উৎপাদন করেন বলেই আমরা ভোগ করতে পারি। উৎপাদক শ্রেণি যদি কিছু মাস্তানের ভয়ে নিজেকে উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে নেন তাহলে আখেরে ক্ষতি হবে দেশের। সামনে দুর্দিন আসছে। বৈশ্বিক মহামান্দার ধাক্কায় ২০২৩ সনে বিপর্যয় তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদী না রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এরকম প্রেক্ষাপটে উৎপাদন বিধ্বংসী অভিযুক্ত রুবেল মিয়াদের উপযুক্ত বিচার করে জাবেদ আলীদের স্বস্তিকর উৎপাদন পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে।