র‌্যাগিং বন্ধ করতে রাজনীতির শুদ্ধিকরণ দরকার

চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, গুন্ডামি, হিং¯্রতা প্রভৃতি উপসর্গের সাথে র‌্যাগিং নামক আরেকটি প্রপঞ্চ ছাত্র রাজনীতিতে কীভাবে জাঁকিয়ে বসে গেল আমরা টেরও পাইনি। অথবা বলা যেতে পারে এ নিয়ে সকলেই এতদিন নির্বিকার ছিলাম। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাÐের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিংয়ের ভয়াবহতার দিকটি নতুন করে সকলের সামনে উন্মোচিত হল। ফাহাদ হত্যাকাÐটি মূলত র‌্যাগিংয়েরই পরিণতি। র‌্যাগ-ডে নামের একটি নামের সাথে আমরা পরিচিত ছিলাম যা শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গন ত্যাগের বছরে পালন করত। দীর্ঘদিনের ক্যাম্পাস জীবনের বিদায়ক্ষণটিতে স্মৃতিময় করে রাখতে ওই দিনে শিক্ষার্থীরা আনন্দ উৎসব করতেন। এই উৎসব ছিল নিছক একটি আনন্দ অনুষ্ঠান যা অন্যদের জন্য কোনো অবস্থাতেই ভীতিকর ছিল না। কিন্তু র‌্যাগ-ডে পালন করতে করতে শিক্ষার্থীরা কখন কীভাবে র‌্যাগিং নাম দিয়ে এক বিভৎস অত্যাচার লীলা পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে চালু করে ফেলল সেটি নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চলতে পারে। কিন্তু আপাতত এটুকু বলা যেতে পারে, ছাত্র রাজনীতির অশুদ্ধিকরণের পথ ধরেই আমদানি ঘটেছে বিভৎস র‌্যাগিং। বিশ্ববিদ্যালয়ে কত ধরনের র‌্যাগিং হয় তার কিছু চিত্র গণমাধ্যমের বরাতে এখন সকলের জানা হয়ে গেছে। সিনিয়র ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা জুনিয়রদের কিংবা সরকারি সংগঠনের পাÐাদের দ্বারা নিরীহ শিক্ষার্থীদের শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের এইসব ভয়াবহ ঘটনা জেনে আমরা আতংকিত হয়ে পড়েছি। আমাদের যেসব সন্তান এখন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত এবং বিভিন্ন হলে বসবাসরত তাদের কথা চিন্তা করলে আমরা শিহরিত হই। আশ্চর্যের কথা হলো, ভিতরে ভিতরে এই অত্যাচারের মাত্রা দিনকে দিন বাড়তে থাকলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো সংগঠিত প্রতিবাদ-কর্মসূচী পালিত হতে দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি চালু রয়েছে এ হলো তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এই দায় তথাকথিত ছাত্ররাজনীতির নামে আমদানি হওয়া মাস্তানীতন্ত্রের, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, সর্বোপরি জাতীয় রাজনীতির।
একদা ঐতিহ্য বহন করা ছাত্র রাজনীতির নাম শুনলে এখন মানুষ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। কোন অভিভাবকই চান না তার সন্তান শিক্ষাঙ্গনে গিয়ে কোনো দলীয় রাজনীতিতে জড়িত হয়ে পড়–ক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনা এমনই এক জায়গা যেখানে অভিভাবকদের ইচ্ছার তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। পরিবেশের কারণে বহু মেধাবীই এখানে বেপথু হয়ে নিজের মেধার বিসর্জন দিয়ে বড় মাস্তান হয়ে পড়ে। নিরীহ শিক্ষার্থীরা র‌্যাগিংয়ের ভয়াবহতায় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যারা ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে আসে তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশই যে বিকৃত মানসিকতা নিয়ে বেরিয়ে আসে তা বলাই বাহুল্য। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়কে, আমাদের দেশে, এখন জ্ঞান তৈরির জায়গা বলার অবকাশ নেই। এই শিক্ষা-বন্ধ্যাত্বের কারণে আমরা মেধা ও সৃজনশীলতার জায়গায় কতটা পিছিয়ে পড়েছি, দুর্ভাগ্যবশত সে নিয়ে আমাদের জাতীয় রাজনীতিবিদদের তেমন কোনো মাথা ব্যথা নেই।
র‌্যাগিং নিষিদ্ধ করতে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। আইন-আদালতের মাধ্যমে এই কঠিন অপসংস্কৃতিটি দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য জাতীয় রাজনীতির শুদ্ধিকরণ দরকার। যেসব কারণে শিক্ষাঙ্গনে তথাকথিত কিছু ছাত্র নেতা দাপট দেখাতে পারে সেইসব কারণকে দূর করতে হবে। এই দায়িত্ব পালন করতে হবে মূল রাজনীতিকদের। ছাত্র রাজনীতিকে তার ঐতিহ্যবাহী রাস্তায়ই চলতে দিতে হবে। ছাত্র রাজনীতিকে পেশিশক্তির উৎস বিবেচনা করা হলে কখনও র‌্যাগিং বা অন্য কিছুকেই বিদায় করা সম্ভব হবে না। তাই আসুন, ছাত্র রাজনীতি থেকে সকল ধরনের অপ-আদর্শিক বিস্তৃতি রোধ করতে আমরা জাতীয় নেতৃত্বকে বাধ্য করি। আমাদের মেধাবী সন্তানদের কোনো ভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া চলতে পারে না।