লকডাউনেও ঋণের কিস্তি প্রদানের চাপ

বিশেষ প্রতিনিধি
শহরের কালীবাড়ি পয়েন্টে মঙ্গলবার সকালে দাঁড়িয়ে কাজে যাবার জন্য (শ্রম বিক্রি করতে) অপেক্ষা করছিলেন ইমরুল নামের এক তরুণ। একাধিক দিন ব্যবহার করা ওয়ান টাইমের একটি মাস্ক তার মুখে। সাংবাদিক পরিচয় পেতেই বললেন, ‘ভাই আপনারা করোনা- লকডাউন কইন, আমরার খাওনের ব্যবস্থা কিলা অইতো, আর ঋণের কিস্তি কিলা দিতাম, লকডাউনের মাঝেও ঋণের কিস্তি আদায়ের লাগি যে লাখান চাপ দেয়, খাম কাজও না আইয়া উপায় আছে।’
পাশে দাঁড়ানো পূর্ব ইব্রাহিমপুরের আরেক তরুণ এগিয়ে বললেন, আমার নাম লেইক্কইন না, আমার স্ত্রী এনজিও সংস্থা ব্র্যাক (উন্নয়ন সংগঠন ব্র্যাক) থাকি লোন (ঋণ) তুলছিলা। ১০ তারিখ ২২০০ টেকা কিস্তি দেওয়ার দিন। আজকেই (মঙ্গলবার) ফোন দিয়া কইছইন তারা (ব্র্যাকের মাঠ কর্মী) টেকা রেডি রাখার লাগি কইছে। এই তরুণ জানালেন, উন্নয়ন সংগঠন আশা থেকেও তার পরিবারের লোকজন ঋণ তুলেছিলেন , সাপ্তাহিক কিস্তি বুধবার, ওই ১২ শ’ টাকার কিস্তি দেবার ব্যবস্থা রাখার লাগিও শনিবারেই মাঠ কর্মী ফোন দিয়েছেন।
রিক্সা চালক টুটুলের বাড়ি হালুয়ারঘাট। এসব কথা শুনে তিনি এগিয়ে বললেন, লকডাউনের মাঝে এক দেড়’শ টাকাও দিনে রোজগার করতাম পারি না। এর মাঝে আশার একজন গেছইন কিস্তির লাগি, পরে আমরা সবে না করছি দিতাম পারতামনায়, এরপরে ম্যানেজার গিয়া কইছইন লকডাউনের পরে কিস্তি দিওইন আপনারা।
নবীনগরের এক তরুণ (নাম প্রকাশ করতে চান নি) জানালেন, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক থেকে মাসিক কিস্তির একটা ঋণ আছে তার। মাসে সাড়ে চার হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। ৮ তারিখ কিস্তির তারিখ। মঙ্গলবার ফোন দিয়ে ঋণ আদায়কারী কর্মকর্তা বলেছেন, কিস্তি দেওয়া লাগবো, সবাইকে বলে রাখবেন। ৮ তারিখ না পারলে ১০ তারিখের মধ্যে কিস্তি দিতে হবে।
শহরতলির হাছনবাহারের এক তরুণ বললেন, আজকে (মঙ্গলবার) সকালেও ব্র্যাকের মাঠ কর্মী ঋণ গেছেন ঋণ আদায় করতে।
টুটুল, ইমরুল বা অন্য তরুণদের কথায় ধারণা পাওয়া যায় এনজিওগুলোর ঋণ আদায় কার্যক্রম এখনো থেমে নেই। সর্বাত্মক লকডাউনে শ্রমজীবীদের কাজের সুযোগ একেবারেই কমে গেছে। এরমধ্যেও কিস্তি আদায়ের চাপ থাকলে, এটি হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’এর মতো।
সুনামগঞ্জ শহরতলির পূর্ব ইব্রাহিমপুরের ব্র্যাকের মাঠ কর্মী বিষ্ণু দেব নাথ বললেন, যারা বিকাশের মাধ্যমে কিস্তি দিচ্ছে, তাদের কাছ থেকে এবং যারা দিতে ইচ্ছুক তাদের কাছ থেকে কিস্তি আদায় করা হচ্ছে। যারা পারছে না, তাদের চাপ দেওয়া হচ্ছে না।
উন্নয়ন সংগঠন ব্র্যাকের সদর উপজেলার ব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান বললেন, যারা নতুন ঋণ নিতে চাচ্ছে, তারা স্ব ইচ্ছায় কিস্তি দিচ্ছে, আমার অফিসের ৮৫ লাখ টাকা বকেয়া। এরপরও স্টাফদের বলে দেওয়া আছে, লকাউনের সময় কাউকে যেন কিস্তির জন্য চাপ দেওয়া না হয়। শহরতলির মাইজবাড়ি ও বদিপুর এলাকার অনেকেই খেলাপি হয়ে আছে বলে জানান তিনি।
উন্নয়ন সংগঠন আশার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ম্যানেজার রফিকুল আলম বললেন, সরকারের লকডাউন ঘোষণার দিন থেকে আশা অফিস বন্ধ দেওয়া হয়েছে। স্টাফদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। লকডাউন বাড়লে ছুটিও বাড়বে। কিস্তি আদায়ের চাপ বা কারো বাড়িতে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই আশার স্টাফদের। কেউ আমাদের পক্ষ থেকে কিস্তি আদায়ে চাপাচাপির কথা বললে, সেটি অসত্য হবে।