লজ্জাজনক ভোট পেলেন আ.লীগ ও জাপার প্রার্থী

বিশেষ প্রতিনিধি
দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর লজ্জাজনক পরাজয় হয়েছে। খুবই কম ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। অথচ. দোয়ারাবাজারে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর এমন গো-হারা’এর ঘটনায় বিব্রত স্থানীয় নেতা কর্মীরা। হাস্যকর ভোট পেয়েছেন জাপা মনোনীত প্রার্থীও।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ উপ-নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৪ জন প্রার্থীর মধ্যে জামানত হারিয়েছেন এই দুই প্রার্থী। ৫৯ কেন্দ্রের মধ্যে ১৭টি ভোট কেন্দ্রে জাতীয় পার্টির প্রার্থী একটিও ভোট পান নি। অপরদিকে ১০টি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর ভোট সংখ্যা ১০ এর গন্ডিও অতিক্রম করতে পারেনি। ৬, ৮, ৫, ৪, ৫, ৯, ৯, ৮, ৭ এবং ৪ টি করে ভোট পেয়েছে নৌকা।
উপজেলার ৫৯ কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিলেন ১ লক্ষ ৬৯ হাজার ২২৬ জন। এরমধ্যে ১ লক্ষ ৩১ হাজার ৫৪৪ ভোটারই ভোটদানে বিরত ছিলেন। যা মোট ভোটারের প্রায় ৭৭ শতাংশ। নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ৩৭ হাজার ৬৮২ জন। এরমধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ৩৭ হাজার ৪৭০ এবং বাতিলকৃত ভোটের সংখ্যা ২১২। জামানত ফিরে পেতে প্রার্থীদের ৪ হাজার ৭১১ ভোট পেতে হতো।
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী কোন প্রার্থী কাস্টিং ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট না পেলে তার জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়। নির্বাচন কমিশনের এই বিধি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম জামানত হারিয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৩ হাজার ৬৭৪ ভোট।
৫৯ কেন্দ্রের মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দোয়ারাবাজার সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬, টেবলাই সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮, নাছিমপুর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫, দোহালিয়া সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪, কুমারনীকান্দি সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫, ধোপাখাই সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯, কান্দাগাঁও-নোয়াগাঁও সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯, পান্ডারগাঁও সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮, রাধানগর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ এবং মঙ্গলপুর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪ ভোট করে পেয়েছেন। অথচ এসব কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ইউনিটের পদধারী ভোটারই এরচেয়ে অনেক বেশি।
দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোপিকা রঞ্জন চক্রবর্তী তার কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ৬ ভোট পাওয়া প্রসঙ্গে বললেন, দলীয় প্রার্থী সক্রিয় রাজনীতিক নয়। তিনি ভোট চাইতেও আসেন নি। তাকে দলীয় মনোনয়ন দেবার পর মানুষের কাছে নৌকার জন্য ভোট চাইতে গেলে অনেকেই আমাদের উপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ওই ব্যক্তিকে ভোট দেবার কথা যেন না বলি, যারা মনোনয়ন দিতে ভূমিকা রেখেছেন, তারাই দলীয় প্রতীক নৌকার অবমাননা করেছেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি কমিটির সদস্য গোল আহমদ বললেন, সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ নাই, কথা নাই, বার্তা নাই, যাকে খুশি তাকে নৌকা তুলে দিলে মানুষ ভোট কিভাবে দেবে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক বললেন, তৃণমূল থেকে দেওয়া তালিকার ৭ নম্বর ক্রমিকের মনোনয়ন প্রত্যাশীকে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের পছন্দ হয়েছে। তার মনোনয়ন পাওয়াই ছিল হাস্যকর। এরপরও আমি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু প্রার্থীর আচরণে কর্মী ভোটার সবই সরে গেছে। স্থানীয় রাজনীতিতে দলে দুই বলয় (এমপিম মানিক ও শামীম চৌধুরী বলয়) আছে, এক বলয়ের হয়ে নৌকা এনেছেন তিনি, আরেক বলয় সেলফি তুলে খালাস। রাজনৈতিক কোন কৌশল তার জানা নেই। সকলকে সন্দেহ করছিলেন দলীয় মনোনীত প্রার্থী। এজন্য তার এমন শোচনীয় পরাজয় হয়েছে।
জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক শামীম চৌধুরী দোয়ারাবাজারে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যকে দায়ী করে বললেন, তিনি দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন ড্যামি প্রার্থীকে। দলের কর্মী-সমর্থকদের আরেক প্রার্থীর পক্ষে থাকতে বলেছেন। তাঁর (এমপির কারণেই) কারণেই দলীয় প্রার্থীর ভোট এতো কম হয়েছে।
দলীয় প্রার্থী নুরুল ইসলামের মুঠোফোন কয়েক দফায় চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় কথা বলা যায় নি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুহিবুর রহমান মানিক বললেন, দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের উপ-নির্বাচনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীকের মতো হেভিওয়েট রাজনীতিক মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তাঁকে দেওয়া হয় নি। এ কারণে দলের নেতা কর্মীরা ক্ষুব্ধ ছিলেন। নুরুল ইসলামকে দলের মনোনয়ন দেবার পর নেতা কর্মীরা তার সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু তিনি (নুরুল ইসলাম) শামীম চৌধুরী’র নেতৃত্বে সদ্য হয়ে যাওয়া ইউপি নির্বাচনে বিজয়ী বিদ্রোহীদের নিয়ে প্রচারণায় নামায় দলের নেতা কর্মীদের খুইয়েছেন, তারা অপেক্ষাকৃত ভালো প্রার্থী দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের অপর নেতা দেওয়ান আল তানভীর আশরাফী চৌধুরীর পক্ষে অবস্থান নেয়। তানভীর আশরাফী’র বাবাও দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তার পরিবারেরও সুনাম রয়েছে উপজেলাজুড়ে। কর্মীরা তার পক্ষে অবস্থান নেবার বিষয়ে আমার কোন ভূমিকা ছিল না। আমি ভোটের মাঠে যাই নি। বরঞ্চ দলের দায়িত্বশীলরা শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রার্থী নুরুল ইসলামের পক্ষেই ছিলেন।
জাতীয়পার্টি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবু সালেহও জামানত হারিয়েছেন। তিনি পেয়েছেন মাত্র ২০০ ভোট। অথচ. এই উপজেলায় এক সময় জাতীয় পার্টির উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন।
দোয়ারাবাজার উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক হাবিব উল্লাহ্ হেলালী বললেন, দলীয় প্রার্থী পরিচয়ে যিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তিনি সংগঠনের কোন পদে নেই। তাকে দলীয় মনোনয়ন দিতেও আমাদের জিজ্ঞেস করা হয় নি। তিনি আমাদের সহায়তা চান নি।
প্রসঙ্গত, দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে জয়ী হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী, উপজেলা সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক দেওয়ান আল তানভীর আশরাফী চৌধুরী (কাপ পিরিচ)। তিনি পেয়েছেন ১৯ হাজার ৯০৯ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্রের মোড়কে নির্বাচন করা জেলা বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক এম এ বারী (আনারস) পেয়েছেন ১৩ হাজার ৬৮৭ ভোট।