- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://sunamganjerkhobor.com -

লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল নির্ধারণের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়

গণপ্রশাসনে বদলি একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক চর্চা। নির্দিষ্ট সময় অন্তর কর্মস্থল পরিবর্তন সরকারি বিধি বিধান দ্বারা নির্ধারিত। এই ধরনের একটি স্বাভাবিক বিষয় তখনই আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয় যখন সেটি ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে আলোচিত সমালোচিত হয়। বলা বাহুল্য জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক একটি বদলি আদেশ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে প্রশংসনীয় ও অনুকরণযোগ্য উদ্যোগ হিসাবে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদসূত্র অনুসারে জানা যায়, জেলা প্রশাসন থেকে সম্প্রতি ১০ জন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা ও ১৮ জন ভূমি উপ সহকারি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। এই বদলি আদেশ জারি করতে যে প্রক্রিয়া অনুসৃত হয়েছে সেটিই আসলে আমাদের চমৎকৃত করেছে। এই ২৮ জন সরকারি কর্মচারি সরকারি নীতিমালা অনুসারে বদলিযোগ্য ছিলেন। কর্তৃপক্ষ যাকে যেমন ইচ্ছা তেমন স্থানে বদলি করতে পারতেন। বিশেষ করে ভূমি সহকারি বা উপ সহকারি কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রে অতীতে নানা অনৈতিক সংযোগের অভিযোগ পাওয়া যেত। তদবির, ঘুষ প্রদান ইত্যাদি অনৈতিক প্রক্রিয়ায় ভালো ভালো তহসিল অফিসে পদায়ন পাওয়ার প্রথা চালু ছিল। ছাতক জগন্নাথপুর বা সদরের কোনো কোনো তহসিল অফিসে পদায়ন পেতে পকেট ভর্তি নয় ব্যাগ ভরে টাকা লেনদেনের গল্পও শোনা যেতো। আলোচ্য বদলিটিও সেভাবে হতে পারত। কিন্তু হয়নি একজন জেলা প্রশাসকের সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতার কারণে। সজ্জন ব্যক্তি হিসাবে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ইতোমধ্যে একটি উজ্জ্বল ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন। ভূমি কর্মকর্তাদের আলোচিত বদলি আদেশটি তাঁর ওই ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করেছে। এই ২৮ ভূমি কর্মকর্তার বদলির ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক গতানুগতিকতা পরিহার করে লটারির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। বদলিযোগ্য কর্মচারিরা নিজেরাই লটারির মাধ্যমে নিজেদের বদলিকৃত কর্মস্থল নির্ধারণ করেছেন। এতে কারও ভালো কিংবা অপেক্ষাকৃত কম ভালো কর্মস্থল নির্ধারিত হয়েছে, কিন্তু সবচাইতে যেটি ভাল হয়েছে তা হল, এই পদায়ন নিয়ে কারও কোনো আপত্তি জানাবার পথ খোলা রইল না। একই সাথে এই বদলির ক্ষেত্রে কোন তদবির, প্রভাব, সম্পর্ক, অর্থ; ইত্যাদি খারাপ প্রপঞ্চগুলোর সামান্য সংযোগও ছিলো না। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে এই বদলি আদেশ জারি করা হয়েছে। এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কাজ করার জন্য আমরা জেলা প্রশাসককে অভিনন্দন জানাই।
সরকারের নানা অধিক্ষেত্রে বড় বড় দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার খবর প্রায়ই ফলাও করে প্রচার হয়। সরকারি প্রশাসনযন্ত্র নিয়ে সাধারণ মানুষের মনোভাব এখনও সুখকর নয়। বরং জনমনে সরকারি প্রশাসন নিয়ে সন্দেহ, ভয় ও অন্যায্যতার চিন্তা কাজ করে। এইরকম বাস্তবতায় সরকার জনপ্রশাসনকে গণমুখী করতে নানামুখী প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। সরকারি প্রশাসনে শুদ্ধাচার, উদ্ভাবন, সমানাভূতি, প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতা; ইত্যাকার বিভিন্ন আধুনিক ধ্যান ধারণার প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। কিছু কিছু কর্মকর্তা যে সরকারি এই উদ্যোগগুলোকে নিছক কেতাবি পরিভাষা না ভেবে অন্তরে ঢুকিয়ে রেখেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক আরও বহু কর্মকা-ের সাথে এই বদলি আদেশ জারির মাধ্যমে তা প্রমাণ করেছেন। আমরা চাইব এই অভিনব প্রক্রিয়ার অন্তর্নিহিত সদ্ভাবটি সর্বত্র অনুসৃত হোক। বিশেষ করে যে যে জায়গায় সেবা ও উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন হয় সে সে জায়গায় এই ধরনের চর্চার প্রসার ঘটুক। তাহলে জনপ্রশাসন সত্যিকার অর্থে জনমুখী চরিত্র ধারণ করে শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
সবশেষে ছোট্ট একটি কথা। লটারি একটি যান্ত্রিক ও ভাগ্যনির্ভর প্রক্রিয়া। এতে কর্মস্থলের জন্য উপযুক্ত লোক নির্বাচন নাও হতে পারে। তবে আর সব প্রক্রিয়া যখন প্রশ্নবিদ্ধ ও নিষ্কলুষ রাখা কঠিন তখন লটারিই উত্তম। একসময় হয়তো উপযুক্ততা ও ন্যায্যতা বিবেচনা করে পদায়ন করার পরিবেশ তৈরি হবে। জেলা প্রশাসকের লটারি উদ্যোগটি সেই পথকেই প্রশস্ত করছে।

  • [১]