- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://sunamganjerkhobor.com -

শান্তিগঞ্জে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

সোহেল তালুকদার, শান্তিগঞ্জ
আব্দুর রহমানের টিন বাঁশের তৈরী বসত ঘর, দুই রুমের কক্ষ। দুই রুমের কক্ষে মা-বোন, স্ত্রী সহ তাদের ৯ সদস্যের পরিবার। গত শুক্রবার (১৭ জুন) হঠাৎ করে অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। পানি বৃদ্ধি পেয়ে বসত ঘরের ভিতরে কোমর পানি হয় । এতে পরিবারের লোকজন বসত ঘরে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কোথাও দাঁড়াবার জায়গাটুকুও নেই। আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন ৯ সদস্যের সেই পরিবার। বসত ঘরে থাকা কাঁথা, বালিশ সহ মুল্যবান অনেক আসবাপত্র পানিতে ডুবে যায়। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে প্রতিবেশীর বাড়ীতে আশ্রয় নেন তারা। তাও আরও কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে সেই আশ্রয়টুকুও চলে যায়। অবশেষে স্থানীয় বিদ্যালয়ের ভবনে আশ্রয় খোঁজে পেয়েছেন। এভাবে হাজারো আব্দুর রহমানের জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে গেছেন। শান্তিগঞ্জ উপজেলার সরকারি হিসাব মতে ১১৭টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে চালু করা হলেও গ্রামের লোকজন বিভিন্ন বাসা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। পাশিপাশি এলাকার বিত্তবানদের বসত বাড়িতে ২০ থেকে ৩০ পরিবারও আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে বন্যায় এসকল আশ্রয় কেন্দ্রের লোকজন তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন। শান্তিগঞ্জ উপজেলার ১৫৫টি গ্রামে সরকারি ও বেসকারি মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার নলকুপের মধ্যে ১১ হাজার নলকুপ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
গত রবিবার (১৯ জুন) থেকে বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শান্তিগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৫ হাজার নলকূপ পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলার ১১৭টি আশ্রয় কেন্দ্র সহ দুই লক্ষাধিক মানুষ। কোন কোন গ্রামে নলকুপ উচু থাকায় সেখান থেকে লোকজন বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করছেন। শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় জনস্বাস্থ প্রকৌশল অধিদপ্তর ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ গ্রামে গ্রামে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও খাবার স্যালাইন সরবরাহ করেছে।
বুধবার (২২ জুন) সকাল থেকে শান্তিগঞ্জ উপজেলা জন স্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোঃ আব্দুর রব সরকারের নেতৃত্বে শান্তিগঞ্জ উপজেলা সদরে ভ্রাম্যমান মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে শান্তিগঞ্জ বাজার, পাগলা বাজার সহ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ও বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়। তারা এক দিনে ১০ হাজার পরিবারকে ১৫-২০ লিটার করে দুটি ভ্রাম্যমাণ মেশিনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করেন। সেই সাথে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ইতোমধ্যে ৪০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরন ট্যাবলেট বিতরণ করেছেন তারা।
ডুংরিয়া গ্রামের শামছুদ্দিন বলেন, আশ্রয় হারিয়ে অনেকে এসেছেন। এভাবে বিপদ হঠাৎ করে আসবে, এটা তো কল্পনায়ও ছিল না। মানুষ তো আগাম বুঝতে পারেনি। কয়েক ঘণ্টায় এমন গজব নামবে, কেউ ভাবতেই পারেনি। একেক ভবনে প্রচুর মানুষ থাকায় ঘুমহীন কাটাচ্ছেন অনেকে। খাবার আর বিশুদ্ধ পানির সংকট তো আছেই।
জয়কলস গ্রামের বাসিন্দা রুকনুজ্জামান বলেন, পানিবন্দি হয়ে বসত ঘরে টিকতে পারিনি। পাশের বাড়ীর প্রতিবেশীর বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছি। বসত ঘরে অনেক মুল্যবান জিনিসপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যা পরবর্তী অনেক টাকার প্রয়োজন হবে। সে চিন্তায় ঘুম আসছেন না।
শিবপুর গ্রামের কমর উদ্দিন বলেন, আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সংসার, কোন মতে বসত ঘরে পানির উপর চৌকিতে আশ্রয় নিয়েছি। আমার বাপের জন্মেও এতো পানি দেখিনি। আজ পাঁচ দিনের মাথায় ঘরের পানি নেমেছে। ঘরে যত সামান্য খাবার থাকলেও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ভুগছি। এখন ঘরে কাদা মাটি ও বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা জন স্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. আব্দুর রব সরকার বলেন, শান্তিগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১১ হাজার নলকুপ পানিতে তলিয়ে গেছে। আমরা তাদেরকে ইতোমধ্যে ৪০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করছি। পাশপাশি আমার অফিসের মাধ্যমে বন্যার পানি নেমে যাওয়া নলকুপ সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে এবং ভ্রাম্যমান মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে শান্তিগঞ্জ বাজার, পাগলা বাজার সহ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ও বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। সেই সাথে অনেক স্থানে আমরা কয়েকশত টিউবওয়েল উঁচু করে দিয়েছি, যাতে করে বিশুদ্ধ পানি বন্যা দুর্গত মানুষজন খেতে পারেন।

  • [১]