শাল্লার ইউএনও’র অবমুক্তি, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়মের নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন

কতিপয় গুরুতর অভিযোগ উঠার পর শাল্লা উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আল মুক্তাদির হোসেনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তাঁর বদলি আদেশ আগেই জারি করা ছিল বলে জানা গেছে। সর্বশেষ বাঁধ নির্মাণের জন্য পিআইসি গঠনে অনিয়মের অভিযোগ এনে শাল্লার ৪ ইউপি চেয়ারম্যান তাঁর বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের নিকট অভিযোগ দায়ের করার কয়েক দিনের মধ্যেই ওই বদলি আদেশ কার্যকর করে তাঁকে শাল্লা থেকে অবমুক্ত করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুসারে তিনি রোববার কর্মস্থল ছাড়বেন। তার জায়গায় দিরাই উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) কে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক আশ্রয়ণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠে ওই ইউএনও’র বিরুদ্ধে। শাল্লা বাজারে সরকারি জায়গায় দোকানকোঠা বন্দোবস্তপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে খাজনা গ্রহণের সময় অতিরিক্ত টাকা উত্তোলনের আরেকটি অভিযোগও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ বাঁধের পিআইসি গঠনে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের মতামত গ্রহণ না করে নিজের ইচ্ছামত সুবিধা নিয়ে পিআইসি গঠনের অভিযোগ উঠে তাঁর বিরুদ্ধে। জেলা প্রশাসক বলেছেন, ‘যেহেতু তাকে নিয়ে জনঅসন্তোষ আছে, এ কারণে বদলির আদেশ দ্রুত কার্যকর করা হয়েছে’। জনঅসন্তোষের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একজন কর্মকর্তার বদলি আদেশ দ্রুত কার্যকর করা একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। অন্তত এর মধ্য দিয়ে তাঁর অনিয়ম-অভিযোগের বিষয়ে কিছুটা কর্তৃপক্ষীয় বিবেচনাবোধ কাজ করেছে। এজন্য জেলা প্রশাসককে ধন্যবাদ।
ইদানীং নানা কারণে সরকারি আমলাতন্ত্র বিরূপ আলোচনা-সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছেন। জনসেবার জন্য নিয়োজিত এই গণকর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার নানা সংবাদ প্রকাশ হয়। শুধু শাল্লা উপজেলা কিংবা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা বিশেষ নন, বরং গণপ্রশাসনের সর্বত্রই এরকম একটি অবস্থা তৈরি হয়ে গেছে। এটি দেশের সুশাসন পরিচালনার অন্তরায়। মানুষ মাত্রই দোষ-ত্রুটির উর্দ্ধে নন। মানবিক তাড়নায় কেউ অসৎ কর্মে প্রবৃত্ত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে যখন একটি কার্যকর বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ধারা বজায় থাকে তখন তা নিয়ন্ত্রণ-ছাড়া হয়ে উঠতে পারে না। এই জায়গাই সম্প্রতি বেশ ব্যত্যয় দেখা যায়। যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারির বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠে, পরবর্তীতে তাঁদের বিরুদ্ধে আদৌ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় কি-না তা জানা যায় না। এই না জানার কারণে একটি ধারণা গড়ে উঠেছে যে, এসব অপকর্মের জন্য দায়ীরা আদতে দোষ করেও রক্ষা পেয়ে যান। এই ধারণার বিপরীতে একজন ইউএনওকে জন-অসন্তোষ বিবেচনায় নিয়ে কর্মস্থল থেকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনাটি ইতিবাচকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বদলী কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। গণ-কর্মচারীদের জন্য এটি রুটিন প্রক্রিয়া মাত্র। সুতরাং শাল্লার ইউএনও’র অপকর্মের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, এমন ধারণা করার কোন কারণ নেই। কোন অনিয়মের জন্য বদলী তাৎক্ষণিক একটি ব্যবস্থা হতে পারে, চূড়ান্ত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠে আসে তার সত্যতা নিরূপিত হলে উপযুক্ত সাজা বিধান করাটাই আসল কথা। এটি করা গেলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গে দুর্নীতির ভয়াল বিস্তার রোধ করা সম্ভব। সরকার জনগণের স্বার্থে যে নীতি-আদর্শ তৈরি করেন, কেন্দ্র থেকে সারা দেশের উন্নয়নের জন্য যে বরাদ্দ দেয়া হয়; তার সবকিছুই বাস্তবায়ন হয় গণ-কর্মচারীদের দ্বারা। তাঁরা আন্তরিকতা, সততা ও দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন পর্যায়ে কাজ না করলে সরকারের জন-বান্ধব কর্মসূচিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই শাল্লার সদ্য অবমুক্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার যদি আদৌ কোন অনিয়ম-দুর্নীতি করে থাকেন তবে সে সবের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বিধি-বিধান অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাই কাম্য।