শাল্লার দুর্গাপূজার একাল-সেকাল

সুব্রত দাশ খোকন, শাল্লা
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজা সাধারণত বিত্তশালীরাই করে থাকেন। বঙ্গদেশে প্রতিমায় দুগার্পূজার প্রবর্তন করেছিলেন রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ন। পরবর্তী কালে নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় দুর্গাপূজাকে আরো জনপ্রিয় করে তোলেন। ১৭৯০ সালে কলকাতার ১২ জন ব্রাহ্মণ সম্মলিত ভাবে পূজা করেছিলেন। এই ১২ জনের কমিটি থেকেই পূজার নাম হয় বারোয়ারী পূজা বা সর্বজনীন পূজা। বর্তমানে শাল্লায় ৩৩টি পূজা মন্ডপে মহা ধুমধামের সাথে পূজা অনুষ্ঠিত হলেও আজ থেকে পঞ্চাশ বা একশত বছর পূর্বে শাল্লায় ৪টি স্থায়ী ব্যক্তিগত মন্দিরে শারদীয় দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হত।
১৩০৪ বঙ্গাব্দে ঘুঙ্গিয়ারগাঁও সরকার বাড়ীর দুর্গা মণ্ডপ নামকরণের মাধ্যমে ভবানী সরকার শাল্লায় ১ম দুর্গা পূজা প্রবর্তন করেন। এরপর ১৩১৮ বঙ্গাব্দে রাহুতলার রাম হরি রায় রাহুতলা বড়বাড়ি দুর্গা পূজা, ১৩১৯ বঙ্গাব্দে রাম চন্দ্র রায়, আনন্দপুরের মহেশপুরের বড়বাড়ি দুর্গা পূজা এবং ১৩২৬ বঙ্গাব্দে সুখলাইনের গগন দাশ সুখলাইন ডাক্তার বাড়ি পূজা মণ্ডপে পূজার প্রবর্তন করেন।
শাল্লার প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্ব সহকারী অধ্যাপক তরুন কান্তি দাস বলেন, বিগত ১৫/২০ বছর যাবত শাল্লায় দুর্গা পূজার সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু পূজায় ছেলেবেলাকার আমেজ আর আসে না। অতীতে ঘুঙ্গিয়ারগাঁও সরকার বাড়ি, সুখলাইনের ডাক্তার বাড়ি, আনন্দপুরের মহেশপুরের পূজোতে ৫ রাতেই যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হত। আমরা পালা করে আমার বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় ৩টি পূজাতেই যাত্রা গান উপভোগ করতাম। হিন্দু মুসলমান মিলে হাজার হাজার দর্শকদের সমাগম হত। কি মজাই না হত। এখন পুষ্পাঞ্জলী ও সন্ধ্যা আরতির মাধ্যমেই পূজা সীমাবদ্ধ।
ঘুঙ্গিয়ারগাঁও সরকার বাড়ী পূজা উদযাপন কমিটির বর্তমান সভাপতি অব: শিক্ষক গোপীকা রঞ্জন সরকার বলেন, আমার দাদুরা পাঁচ ভাই যথাক্রমে ভবানী সরকার, গোলক চাঁদ সরকার, রায়চাঁদ সরকার, প্রকাশ সরকার ও ভরত সরকার মিলে আজ থেকে ১২৫ বছর পূর্বে অথার্ৎ ১৩০৪ বঙ্গাব্দে শাল্লায় ১ম দুর্গা পূজা প্রবর্তন করেন এবং উনারা দুর্গা মায়ের নামে ১১ কেদার জমি লিখে দিয়েছিলেন বলেই আমরা পূজার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছি। পুজোতে যাত্রাগান হয় কিনা প্রশ্ন করলে উনি বললেন, বিগত ১০/১২ বছর যাবত আর যাত্রাগান হয় না। তবে আমাদের পুজাতো মালসী ও আরতি গান অনুষ্ঠিত হয়। সময়ের ব্যবধানে শাল্লায় যাত্রা গানের স্থবিরতা, প্রশাসন থেকে যাত্রাগাণের ব্যাপারে কড়াকড়ির কারণে গ্রাম বাংলার এক সময়ের চিত্ত বিনোদনের প্রধান মাধ্যম প্রায় হারিয়ে যেতে বসা যাত্রা শিল্প আর আগের মত হয় না বিধায় আমাদের দুর্গা পূজায় যাত্রা হয় না। একসময় নিজেও অভিনয় করতাম। পূজায় যাত্রা না হওয়ার কারণে গ্রাম বাংলার পূজার আমেজেও যেন কিছুটা ভাটা পড়েছে।
সুখলাইন ডাক্তার বাড়ির পূজা উদযাপন কমিটির বর্তমান সভাপতি অশোক চৌধুরী বলেন, গত ৩ বছর পূর্বে আমরা শতবর্ষী পূজা উদযাপন করেছিলাম। আমাদের দাদু গগন দাস পূজা শুরু করেছিলেন এবং ১০ কেদার জমি মায়ের নামে রেখে দিয়েছিলেন। তাই পূজার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছি। এখন যদিও মাঝে মধ্যে ডপযাত্রা হয়, কিন্তু আজ থেকে ১০/১৫ বছর পূর্বে আমাদের পূজায় ৫ রাতেই যাত্রাগান অনুষ্ঠিত হত। পূজোর রাতে যাত্রা উপলক্ষ্যে হিন্দু মুসলমান মিলে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হত। তখন খুবই মজা হত। এখন পূজার খরচ বেড়েছে তবে আগের মত আমেজ আর আসে না।
আনন্দপুরের মহেশপুরের পূজা কমিটির বর্তমান সভাপতি জ্যোতির্ময় রায় ও রাহুতলার কালী দাশ রায়েরও একই আক্ষেপ। যাত্রা না হওয়ায় এখন পূজোতে আর আগের মত মানুষের মিলন মেলা হয় না।
তবে বারোয়ারী বা সর্বজনীন পূজোগুলোর মধ্যে মুক্তারপুর, মেঘনাপাড়া, বাহাড়া, শাসখাই শাল্লার এই সমস্ত পূজোয় বিগত ২/৩ বছর যাবত যাত্রাগান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে পূজা কমিটির সদস্যরা বলেছেন, পূজা উপলক্ষ্যে প্রশাসনের কড়াকড়ি কম থাকায় গ্রামের কিছু সৌখিন যুবক নিজেরা চাঁদা উত্তোলনের মাধ্যমে নিজেদের অভিনয়ের মাধ্যমে তাদের নিজেদের পূজা মন্ডপে যাত্রাগান মঞ্চস্থ করেন।
মুক্তারপুর গ্রামের বিশিষ্ট অভিনয় শিল্পী নিতেশ দাস বলেন, প্রশাসনের অনুমতির কড়াকড়ির কারণে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য যাত্রা শিল্প প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। পূজা উপলক্ষ্যে আমাদের মুক্তারপুর গ্রামে আমরা নিজেরাই যাত্রাপালা করি। অথচ বর্তমান তরুণ সমাজকে নানা ধরণের নেশার হাত থেকে বাঁচাতে পারে বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড। যদি এখনই এই যুব সমাজকে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে উৎসাহিত না করা হয় ভাটী অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য একসময় হারিয়ে যাবে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও নবীন-প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা এগিয়ে না আসলে ভাটী অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে যেতে একসময় নি:শেষ হয়ে যাবে।