শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ, বদলি বাতিলের দাবি

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রাথমিক শিক্ষকদের অনলাইন বদলি কার্যক্রমে সুনামগঞ্জে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠেছে। বদলি অগ্রবর্তী করতে উপজেলা শিক্ষা অফিস কর্তৃক অবহেলার কথাও জানিয়েছেন শিক্ষকরা। সংক্ষুব্ধ একাধিক শিক্ষক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন। একইসঙ্গে এই বদলির আদেশ স্থগিত করারও আবেদন জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
শিক্ষকরা জানান, বদলির পরিপত্রে উল্লেখ রয়েছে একবার বদলি হবার পর তিন বছরের মধ্যে বদলির আবেদন করা যাবে না। অথচ. এই বদলিতে তিন বছর পূর্ণ হবার আগেই আবেদন করে বদলির আদেশ পেয়েছেন অনেকে।
শিক্ষকের চাকুরির সার্ভিস বইয়ে এবং শিক্ষকদের আইপিইএমআইএস’এ দেওয়া সকল জরুরি তথ্য যাচাই না করেই আগ্রহীদের আবেদন অগ্রবর্তী ও বাতিল করা হয়েছে। আগ্রহীরা আবেদনের সময় তথ্য গোঁপন করেও বদলির সুযোগ নিয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ১০ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে গেল সপ্তাহে করা যৌথ আবেদনে উল্লেখ করেছেন, তথ্য গোপন, সঠিক ঠিকানা ও দূরত্ব না দিয়েই অনেকে বদলি হয়েছেন। এই বদলির আদেশ স্থগিতের দাবি জানান তারা। এই দশ শিক্ষক ছাড়াও আরো একাধিক শিক্ষক বৃহস্পতিবার পর্যন্ত একই রকমের আবেদন করেছেন।
শিক্ষকরা জানান, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ঝরঝরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আকলিমা খানম বাহাদরপুর ছলিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ চাকুরিতে যোগদান করেন। ২০২০ সালের সাত জুন এই বিদ্যালয় থেকে বদলি হয়ে ঝরঝরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন তিনি। এই শিক্ষক তিন বছর পূর্ণ হবার আগেই বদলির আবেদন করেন। গেল সাত নভেম্বর সদর উপজেলার সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলির আদেশ পান তিনি। শিক্ষক আকলিমা খানম বলেছেন, তিনি ভুলে এটি করেছেন।
এই ঘটনায় শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। শিক্ষকরা বলেছেন, তাতেই বুঝা যাচ্ছে বদলির আবেদন সঠিকভাবে যাচাই না করেই অগ্রবর্তী করা হয়েছে।
শিক্ষকরা জানান, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা সহকারী শিক্ষক কামরুন নাহারের ২০০৬ সালে চাকুরি হয় জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার বুরুমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি বাবার স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে কাইয়ারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম বদলি হয়ে আসেন। এরপর তিনি বদলি হয়ে আসেন কৃষ্ণনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি চলমান বদলিতে স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করে কালিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আদেশপ্রাপ্ত হন। অথচ তার স্বামী বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা এবং সদর উপজেলার অষ্টগ্রাম রাস গোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। স্বামী বিশ^ম্ভরপুরের বাসিন্দা হলেও তিনি বদলির সুযোগ নিতে সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা উল্লেখ করেছেন।
কামরুন নাহার এ প্রসেঙ্গ বলেছেন, তিনি নীতিমালা লঙ্ঘন করেন নি। শহরে তাঁর ও তাঁর স্বামীর নামে জমি বাড়ী আছে।
সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার ভাড়া বাড়ীতে অবস্থান করে ২০০৯ সালে চাকুরি নিয়েছিলেন সহকারী শিক্ষক ইসরাত জাহান ¯িœগ্ধা। তিনি সদর উপজেলার বাণীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথমে নিয়োগ পান। ২০১৯ সালে আসেন পৈন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি এই জেলার নাগরিক না হয়ে চাকুরি পেয়েছিলেন, পৌরসভার নাগরিক না হয়ে এই সময়ের বদলিতে সুনামগঞ্জ পৌরসভার শহর বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলির আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ইসরাত জাহান ¯িœগ্ধা বললেন, চাকুরি নেবার সময় ভাড়া বাড়ীতে থাকলেও এখন তিনি শহরে জমি কিনেছেন। তিনি দুরত্ব ও স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করে যথা নিয়মে বদলি হয়েছেন।
জানিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষিকা ইন্ধিরা তালুকদার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে জানিয়েছেন, তিনি আবেদনে বাড়ী থেকে স্কুলের দুরত্ব সঠিক দেবার পরও তার আবেদন অগ্রবর্তী না করে বাতিল করা হয়েছে।
ফারহানা ইসরাত ও দিলদার চৌধুরী নামের সহকারি শিক্ষকদের বদলির ক্ষেত্রেও নীতিমালা লঙ্ঘিত হয়েছে বলে একাধিক শিক্ষক দাবি করেছেন। দিলদার চৌধুরী বলেছেন, তিনি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করে বদলির আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
উল্লেখ করা এসব অনিয়ম ছাড়াও আরও নানা অনিয়ম হয়েছে সম্প্রতি হওয়া বদলির আদেশে দাবি করেছেন শিক্ষকরা।
জেলা প্রাথমিক সহকারি শিক্ষক সমিতির সভাপতি হারুন রশিদ বললেন, বদলির এই কার্যক্রম নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তথ্য গোপন করে পয়েন্ট অর্জন করে কেউ কেউ বদলির আদেশপ্রাপ্ত হয়েছে। আইপিমআইএস ও সার্ভিস বুক আরও বেশি যাচাই করা জরুরি ছিল। এখন যারা বদলির আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে যারা তথ্য গোঁপন করেছেন বা ভুল তথ্য দিয়ে সুবিধা নিয়েছেন, তদন্তপূর্বক বদলি বাতিলসহ তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। না হয় অসন্তোষ তৈরি হবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুর রহিম বাবর বললেন, তথ্য গোপন করে চাকুরি নিয়ে থাকলে চাকুরি স্থায়ী করণের আগেই অভিযোগ করা জরুরি ছিল। লিখত অভিযোগ আমার কাছে আসলে যাচাই করে দেখবো। তিন চার দিনের মধ্যে সকল আবেদন অগ্রবর্তী করতে হয়েছে, এতো কম সময়ে বিপূল সংখ্যক আবেদনকারীর সার্ভিস বুক যাচাই করা কঠিন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম আব্দুর রহমান বললেন, সকল ক্ষেতেই যারা সত্য তথ্য গোপন করেছেন এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা যারা অগ্রবর্তী করেছেন, তাদের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে। যোগ্যতাই যাদের তৈরি হয় নি, তাদের বদলি বাতিলের জন্য অধিদপ্তরে লিখবো। সত্যতা পেলে অফলাইনে এসব বদলির আদেশ বাতিল করা হবে। এই বদলিতে আমার কেবল মঞ্জুর করার দায়িত্ব ছিল। এরবেশি আমার ক্ষমতা ছিল না।