শিক্ষার সংকট প্রকট হাওরে

সু.খবর ডেস্ক
ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের একটি গ্রাম চকিয়াচাপুর। গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টির নাম চকিয়াচাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলে যেতে পাড়ি দিতে হয় শৈলচাপড়া হাওর। গত বছরের ২২ জুন সকালে স্কুলে বিস্কুট বিতরণ হবে জেনে চকিয়াচাপুর গ্রাম থেকে প্রথম শ্রেণিতে সদ্য ভর্তি হওয়া সুমাইয়া আক্তারসহ ৭-৮ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা দেয় একটি ছোট ডিঙি নৌকায় করে। মাঝরাস্তায় আফালের কবলে পড়ে নৌকা ডুবে যায়। অন্যরা কোনোমতে সাঁতরে পাড়ে উঠতে পারলেও মারা যায় সুমাইয়া আক্তার নামে ৬ বছর বয়সী প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। উত্তাল হাওরে ঝোড়ো হাওয়ায় যে ঢেউ উঠে, স্থানীয় জনপদের মানুষ সেটিকে বলে ‘আফাল’।
ঘটনাটি একটি উদাহরণ মাত্র। দেশের হাওর অঞ্চলগুলোতে স্কুলে যেতে গিয়ে অনেক শিশুর স্মৃতি শৈশবেই আটকে যায় এমন নিদারুণ ভাগ্য বিড়ম্বনায়। এখানে শিক্ষার্থীদের দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা, সচেতনতার অভাব, দুর্গমতা, বাল্যবিয়েসহ নানা প্রতিকূলতা ছাড়াও লড়াই করতে হয় প্রকৃতির সঙ্গে। এসব যুদ্ধ শেষে খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থী মাড়াতে পারে উচ্চশিক্ষার চৌকাঠ। এসব কারণে দেশে শিক্ষার হার ৭১ শতাংশ হলেও হাওর অঞ্চলে এই হারটি ২০ থেকে ৪০ শতাংশের বেশি নয়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, হাওর অধ্যুষিত উপজেলাগুলোর মধ্যে সর্বনি¤œ শিক্ষার হার সুনামগঞ্জের শাল্লায়, মাত্র ২০ দশমিক ১০ শতাংশ। ৪০ দশমিক ৩০ শতাংশ শিক্ষার হার নিয়ে সর্বোচ্চ স্থানে আছে একই জেলার ধর্মপাশা। হাওর থাকা অন্য উপজেলাগুলোতেও শিক্ষার হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি নয়।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ২০১৭ সালে প্রকাশিত হওয়া ‘বিদ্যালয় সম্পর্কিত তথ্য’ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে এক হাজার ৪৬৫টি। জেলার ১৬৬টি গ্রাম এখনও বিদ্যালয়হীন। প্রায় ৬০০ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৩৯৩টি। ঝড়-তুফানে ভেঙে পড়ায় এবং বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় জেলার সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হয় উন্মুক্ত স্থানে। ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত। ১২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন অতিঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যালয় পরিদর্শনের জন্য উপজেলা পর্যায়ের ৬১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও ৩৭ জনের পদ শূন্য।
ইউনিসেফের ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী জেলায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৩৭ শতাংশ। এছাড়াও জেলায় হাওরের দুর্গম অঞ্চলে স্কুল শিক্ষকেরাও যথাসময়ে স্কুলে পৌঁছাতে পারেন না। পাশাপাশি অধিকাংশ বিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই। বর্ষায় দ্বীপ গ্রামের এসব বিদ্যালয়ে যেতে বেগ পোহাতে হয় শিক্ষকদের।
সুনামগঞ্জ ছাড়াও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরবেষ্টিত কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। এই সাত জেলার ৪৭টি উপজেলায় প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর জমি নিয়ে হাওর অঞ্চল গঠিত। হাওর উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০১২ অনুযায়ী এসব হাওর অঞ্চলে দারিদ্র্যের পরিমাণ অন্তত ৩০ শতাংশ। এ অঞ্চল দেশের মোট আয়তনের প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ, যেখানে ২৬ হাজার গ্রামে থাকা মোট জনসংখ্যা দুই কোটিরও বেশি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে ছোট বড় ৪১৪টি হাওর, জলাশয় ও জলাভূমি রয়েছে। তাদের মধ্যে ভাটির দেশ সুনামগঞ্জে হাওর রয়েছে ১৩৩টি, সিলেটে ৪৩টি, হবিগঞ্জে ৩৮টি, মৌলভীবাজারে ৪টি, নেত্রকোনায় ৮০টি, কিশোরগঞ্জে ১২২টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রয়েছে ৩টি। জেলাগুলোর হাওর অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রেখে চললেও হাওরের জনপদ রয়েছে অনেক পিছিয়ে।
শুধু প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরাই নয়, সংকটে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। করোনাকালে তাদের বাসায় থেকে মোবাইল বা ল্যাপটপে ক্লাসে যুক্ত হতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের একটা অংশ ক্লাস করার জন্য ডিজিটাল ডিভাইস সংগ্রহ করতে পারছেন না। আবার অনেকে টাকাপয়সা জোগাড় করে ডিজিটাল ডিভাইস সংগ্রহ করলেও ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল হওয়ার কারণে অংশ নিতে পারছেন না চলমান ক্লাস-পরীক্ষায়।
তাহিরপুর উপজেলার বাসিন্দা ও সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ রাসেল জানান, আমাদের অনলাইনে ক্লাস চলছে। শুনেছি করোনা মহামারির কারণে পরীক্ষাও অনলাইনে হবে। বাসায় ফোনের নেটওয়ার্কই ঠিকমতো পাওয়া যায় না। এমন অবস্থায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে আমাকে শহরে আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে ওঠা লাগবে। তবে রাসেলের সব শিক্ষার্থী আত্মীয়ের বাসায় ওঠার মতো সুযোগ করে উঠতে পারবেন না। এতে করে উচ্চশিক্ষা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ূয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই সংকটে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, হাওর অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক কম। যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্গম ও পানিনির্ভর হওয়ার কারণে এ অঞ্চলে আরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ছিল।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিমুক্তভাবে আসা-যাওয়া করা এবং নিকটবর্তী স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা না গেলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) চতুর্থ অভীষ্ট লক্ষ্যে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক গুণগত শিক্ষার কথা বলা হয়েছে সেটি হাওর অঞ্চলে অর্জন করা সম্ভব হবে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বর্ষাকালে শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুল-কলেজে যায়। অতীতে অনেক নৌ-দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের প্রাণ হারাতে দেখেছি আমরা। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আলাদাভাবে নৌকার ব্যবস্থা করার জন্য আমরা দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানিয়ে আসছি। বর্ষাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে এবং শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আমরা ওই অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি স্কুলে শিক্ষকদের উপস্থিতি কম থাকে। শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে স্কুল কমিটিকে আরও ভালোভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায় থেকে শিক্ষকদের নিয়োগ করা হলে এ সমস্যাটির সমাধান হতে পারে বলে আমি মনে করি।
হাওর অঞ্চলে শিক্ষার হার ও মান না বাড়িয়ে এসডিজির লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, কাঠামোগত ও গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসার কথাই বলা হয়েছে এখানে। গড়পড়তাভাবে আমরা এসডিজিতে একটা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাই, তা নয়। জাতীয়ভাবে যেমন আমরা এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার হারকে ভালো করার চেষ্টা করবো, তেমনি হাওর অঞ্চলের স্থানীয় পর্যায়েও এ চেষ্টাটা করতে হবে।
এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে জানিয়ে তিনি জানান, পদক্ষেপ নেওয়া সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে। এখানে স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনকে আরও অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অংশীদার ও জনগণকে সঙ্গে রাখতে হবে। নিয়মিত ভিত্তিতে এসডিজি বাস্তবায়ন (শিক্ষার ক্ষেত্রে) ঠিকমতো হচ্ছে কিনা এর সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা, সেগুলোকে পর্যালোচনা করা এবং এর ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন করা হলে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অক্সফাম এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) যৌথভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আর্থিক সহায়তায় ‘গণতান্ত্রিক সুশাসনে জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ’ শিরোনামে একটি প্রকল্পে কমিউনিটি ভিত্তিক সংগঠনের (সিবিও) মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বিভিন্ন পরিষেবার ওপর সামাজিক নিরীক্ষা পরিচালনা করে এবং এই সম্পর্কিত নিরীক্ষার তথ্য এবং উপাত্ত সংশ্নিষ্ট সেবা প্রদানকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে গণশুনানির মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। এতে হাওর অঞ্চলে শিক্ষাবিষয়ক পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, সেবা প্রদান ও মনিটরিং প্রক্রিয়ায় স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে মতামত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গুণগত মান বাড়াতে সামাজিক নিরীক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর গণশুনানি করার কথাও বলা হয়েছে।
সূত্র : সমকাল