শিক্ষিত বেকার ও বেকারত্ব এবং আমাদের পরিকল্পনাহীনতা

করোনার কারণে নিয়োগ বন্ধ থাকা দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ার একটি কারণ। কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয়। বড় কারণটি হলোÑ দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ ব্যাচেলর বা মাস্টার্স ডিগ্রিধারী তরুণ তরুণী তৈরি হচ্ছে সরকারি খাতে সেই পরিমাণ চাকুরির সুযোগ নেই। এই বিএ, এমএ পাস লোকগুলোর সকলেই একটি সরকারি চাকুরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এখানে ওখানে দরখাস্ত করেন, ইন্টারভিউ দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিংহভাগের ভাগ্যে সরকারি চাকুরির সোনার হরিণ জোটে না। এই করতে করতে তাদের চাকুরির নির্ধারিত বয়স অতিক্রম হয়ে যায়। এরা দলে দলে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পরিবার ও দেশের দুর্দশা বাড়ায়। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জেলা কালেক্টরেটে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ৫১ জনই উচ্চশিক্ষিত বলে তথ্য উঠে এসেছে। এই পদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি বা এসএসসি। অষ্টম শ্রেণির পদের জন্য দলে দলে দরখাস্ত করেছেন বিএ, অনার্স, এমএ পাস শিক্ষার্থীরা। নিয়োগ পরীক্ষার প্রতিয়োগিতায় এই উচ্চ শিক্ষিতদের কাছে পদের প্রকৃত দাবিদাররা কুলিয়ে উঠতে পারেননি, পারার কথাও নয়। সংগত কারণেই বিধি মোতাবেক চাকুরি হয়ে গেছে উচ্চশিক্ষিতদের। এখন যদি অফিস সহায়কের জন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারীরা বঞ্চনার অভিযোগ আনেন উচ্চশিক্ষিতদের বিরুদ্ধে, তাহলে বলার কিছু আছে কি? এই অদ্ভুত অবস্থাটি দেশে প্রচলিত শিক্ষা দর্শনের দৈন্যতা প্রকাশ করে। একই সাথে কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি চাকুরির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরির দায়ও রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। পৃথিবীর কোনো দেশের সরকারই কর্মসংস্থানের মূল জোগানদারীর দায়িত্ব গ্রহণ করে না। সরকার দেশে কর্মসংস্থানের উপযুক্ত সুবিধা তৈরি করে দেয়। সেখানে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যে যার মতো চাকুরি খোঁজে নেয় কিংবা নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে আরও অনেককে চাকুরির সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশে প্রাইভেট খাত বিকশিত হচ্ছে এবং প্রাইভেট খাতে জড়িত কর্মী বাহিনীর সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু দেশের ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনশক্তির তুলনায় যে প্রাইভেট বা সরকারি খাতের সক্ষমতা কম, ব্যাচেলর বা মাস্টার্স পাস শিক্ষার্থীদের অফিস সহায়ক পদে চাকুরি গ্রহণ করা থেকেই সেই সত্য উন্মোচিত হয়।
যেকোনো পাসপোর্ট অফিসে গেলে পাসপোর্টপ্রত্যাশী তরুণদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। সরকার পাসপোর্ট অফিসে একটি ভালো পরিবেশ তৈরি করে দিতে পেরেছেন। তাই পাসপোর্ট পেতে এখন খুব বেশি বেগ পেতে হয় না কাউকে। যদি আগের পরিবেশ বজায় থাকতো তাহলে এই বিশাল পাসপোর্টপ্রত্যাশীদের নাকের জল আর চোখের জল এক হওয়ার জোগাড় হত নিঃসন্দেহে। পাসপোর্ট অফিসের ভিড় দেখে বুঝা যায় আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী দলে দলে দেশ ছাড়তে চাইছে। দশ/বিশ হাজার টাকা মাসিক বেতনের চাকুরির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের কষ্টকর জীবনকে তারা শ্রেয় মনে করছে। বেকার তরুণদের হতাশা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উন্নত রাষ্ট্রে অভিভাসন পাওয়ার চেষ্টায় কেউ মাছের ড্রামে লুকিয়ে কেউ ট্রাকের পিছনে লুকিয়ে উত্তাল ভূমধ্যসাগর পার হতে পিছ পা হচ্ছে না। যারা যেতে পারছে তো তারা যাচ্ছে। আর যারা যেতে পারছে না তারা হয় পথেই মরছে নয় বিদেশ বিভুইর জেলে পচে আবার পুনর্মুশিক ভব হয়ে দেশে ফিরে আসছে। ডেমোগ্রাফিতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সন্তোষজনক অব¯থা নিয়ে আমরা তৃপ্তির যে ঢেকুর তুলি এইসব চিত্র সেই ঢেকুরকে তিক্ত করে দেয়।
সরকার ও রাষ্ট্রকে তার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য কাজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কাজ করা মানুষের মৌলিক অধিকার। এই পরিবেশ নিশ্চিত করতে যেসব দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদী কুশলী পরিকল্পনা দরকার, দুঃখজনক সত্য হলো সেটি আমরা এখনও করতে পারিনি। অথচ ডেমোগ্রাফির এই সুবিধা খুব বেশিদিন একই জায়গায় থাকবে না। বিষয়গুলো নিয়ে কেউ কি কোনো চিন্তা করেন?