শেখ হাসিনা : অ্যা ভিশনারী লিডার

হিরন্ময় রায়
দেশবিরোধী পরাজিত পক্ষের ইন্দনে রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির কিছু অংশের নৃশংস সন্ত্রাসে পিতা-মাতা, ভাইসহ আঠারো জন সদস্যের জীবনহানীর পর জীবন সংকটের সকল সম্ভাবনার মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই তিনি সেদিন বার্তা দিয়েছিলেন, তিনি ইতিহাসের সৃষ্টি নন, ইতিহাস সৃষ্টি করতে এসেছেন।
সেই বিভীষিকাময় সময়ে যেখানে মানুষ নার্ভাস ব্রেকডাউনের শিকার হয়ে, স্বাভাবিক জীবন থেকে হারিয়ে যায়, তিনি ফিরে এসেছিলেন দৃঢ় প্রত্যয় হয়ে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, গণতন্ত্রহীনতায় নিষ্পেষিত, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের বাংলায় তিনি সেদিন ফিরেছিলেন, নেতৃত্বহীন আওয়ামী লীগ ও জনগণ এবং দেশকে নেতৃত্ব দিতে। তাঁর এই অকুতোভয় নেতৃত্বে মানুষ আস্থা রেখে সংগঠিত হয়। দীর্ঘ একুশ বছর আন্দোলন সংগ্রামে বহু ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথে বহুবার জীবন সংকটে পড়েও থেমে থাকেননি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অকাতরে প্রাণ উৎসর্গ করেছে, কারাবরণ করেছে, নির্যাতিত হয়েছে, তবুও বঙ্গবন্ধুর কন্যার পাশে থেকেছে। ১৯৯৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে যখন আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসে, তখন ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর এই দেশের ক্ষমতায় ঝেঁকে বসা মিলিটারী ও পাকিস্তানপন্থীদের হাত থেকে দেশ মুক্ত হয়। তিনি ক্ষমতায় এসেই সরকার ও রাষ্ট্রকে শাসকের ভূমিকা থেকে গুণগত উত্তোরণ ঘটিয়ে জনবান্ধব সরকার ও রাষ্ট্রে রূপান্তর করেন। সংসদের মাধ্যমে ইমডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের মধ্য দিয়ে দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতির হাত থেকে মুক্তির পথ দেখান। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে না করে নিম্ন আদালতের মাধ্যমে শুরু করে বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ করেন। এতে বিচার বিভাগের সম্মান আরো সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ প্রতিষ্ঠার পর হতে চলে আসা ভ্রাতৃঘাতি রক্তপাত ও অশান্তি থামাতে পাহাড়ী অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পার্বত্য শান্তি চুক্তি করেন তিনি। ফলে পাহাড়ে শান্তি ফিরে এবং সুফল ভোগ করছেন পাহাড়ী জনগোষ্ঠী ও দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশ লাভের মাধ্যমে পাহাড়ে কর্মসংস্থানের পথ খুলে গিয়েছে, পাহাড়ী অঞ্চলে যোগাযোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ফারাক্কা বাঁধ সমস্যার সমাধানকল্পে গঙ্গা পানি চুক্তি করা হয় তাঁর সরকারের দৃঢ় ও ঝানু কূটনৈতিক পদক্ষেপে। গঙ্গার পানি ন্যায্য হিস্যা আদায় হয়।
খাদ্য ঘাটতির দেশ বাংলাদেশে তাঁর কৌশলগত ও আন্তরিক পদক্ষেপে সার, বীজ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। ভর্তুকি সহায়তা দিয়ে উন্নত বীজ ও সময়মতো সার কৃষকের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়া হয়। সার ও বীজের জন্য রাজপথে নেমে কৃষককে অতীতের মতো প্রাণ দিতে হয়নি। সেই সাথে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি সহায়তা নিশ্চিত করা হয়। ফলে উজ্জীবিত হয় কৃষক ও কৃষি খাত। খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়। স্বৈরাচারের যাতাকলে চিরকাল নিষ্পেষিত মানুষ অবাক, দেখল শেখ হাসিনার সরকার শাসক হয়ে নয়, বন্ধু ও সেবক হয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ভিজিডি, ভিজিএফ ও ওএমএস কর্মসূচী নিয়ে দরিদ্র মানুষের ভাতের অধিকার নিশ্চিত করেছে। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় এটি ছিল বিরল উদ্যোগ। বন্যা, খরায় বা স্বাভাবিক অবস্থায় অতীতের মতো কোন মানুষই না খেয়ে মারা যাননি। বাজার নিয়ন্ত্রণ করে জিনিসপত্রের দাম জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখাও ছিলো ‘৯৬-২০০১ সালের সরকার তথা শেখ হাসিনার অনন্য কৃতিত্ব।
বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা নারী ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ এর প্রবর্তন করে রাষ্ট্রের সম্পদকে অনগ্রসর মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেন শেখ হাসিনা। মানুষ প্রথম উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় রাষ্ট্র শুধু শাসন করে না, পালনও করে যা ছিলো রাষ্ট্র কে ওয়েলফেয়ার স্টেইটে রূপান্তরে শেখ হাসিনার অনন্য উদ্যোগ।
যাদের মাথাগোজার ঠাঁই ছিলো না, তাদের জন্য শেখ হাসিনা আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘর নির্মাণ করে দেন, তাদের কর্মসংস্থানের জন্য সহজশর্তে ঋণের ব্যবস্থা করেন। বস্তবাসীদের ঘরে ফেরা কর্মসূচীর আওতায় গ্রামে পুনর্বাসন করেন।
দেশের সাধারণ মানুষ তথা গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করেন। ভ্যাক্সিনেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে প্রসূতি ও শিশু মৃত্যু হার হ্রাস করেন।
স্থানীয় সরকার ও সরকার ব্যবস্থায় নারীর অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নেয়া কার্যকর উদ্যোগ। ফলে স্থানীয় সরকারে ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব বিকাশ লাভ করে। লিঙ্গবৈষম্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায় শেখ হাসিনার কার্যকর পদক্ষেপে।
দেশের ইতিহাসে তাঁর আমলেই সংসদীয় সরকারে বিরোধীদলকে দেয়া যোগ্য সম্মান ও অধিকার এবং ক্ষমতার অংশীদারিত্ব।
তাঁর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মহান ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক গুরুত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে সফল প্রচারের ফলে জাতিসংঘ একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
দেশমাতৃকার সূর্যসন্তানরা ছিলেন রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে এক প্রকার ব্রাত্য। তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানের আওতায় ও ভাতার আওতায় নিয়ে আসেন শেখ হাসিনা। এতোসব সাফল্যের পর প্রথম কোন সরকার হিসেবে পূর্ণ মেয়াদে সরকার পরিচালনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা অর্পণ করেন শেখ হাসিনা।
সেই নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারেনি আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে আসছেন যে, একক দল হিসেবে ভোট বেশি পেলেও সেবারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী চক্রের অপপ্রচার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ এবং কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়নি আওয়ামী লীগকে। জামাতের শীর্ষনেতা গোলাম আযম একটি প্রথমসারির দৈনিকে একটি কলামে ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করে সতর্ক করেন যে, আওয়ামী লীগকে আসন সংখ্যা দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না।
এরপরের ইতিহাস পূর্ণিমা শীলদের মতো নারী ধর্ষণ, অধ্যক্ষ মুহুরীদের হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে সংখ্যালগুদের নির্যাতন করার ইতিহাস। জঙ্গীবাদ, বাংলা ভাইর মতো জঙ্গীদের উত্থান, একযোগে সারাদেশে বোমা হামলা, প্রতিবেশি দেশে সন্ত্রাসে মদদ দেয়া, কিবরিয়া, মমতাজ, আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা ও একুশে আগস্টে বোমা হামলা করে বিরোধীদলকে নিশ্চিহ্ন করার ইতিহাস। দেশ পরপর পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়।
এই দুর্যোগে আবারো ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন শেখ হাসিনা। জীবন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে জনগণকে নিয়ে লড়াই করে সরকারের পতন ঘটান।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কারাবাসও তাঁর এবং তাঁর দলের কর্মীদের মনোবলে চির ধরাতে পারেনি। তাই ২০০৮ সালে আবারো ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।
তখন থেকেই তাঁর নেতৃত্বের গুণগত উৎকর্ষতার স্ফুরণের সোনালী অধ্যায়ের শুরু। তিনি নিজেকে শুধু প্রধানমন্ত্রীত্বে আবদ্ধ রাখেননি হয়ে উঠেছেন দেশ ও জাতির ভিশনারী নেতাতে, তাঁর কৌশলগত পদক্ষেপে দেশ পুরোপুরি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের রূপান্তরিত হয়। সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী সীমায় নিয়ে আসা আরো বিপুল সংখ্যক মানুষকে। ভিজিএফ ও ভিজিডি সেবা বৃদ্ধি, ওএমএস ডিলার পয়েন্ট বৃদ্ধি, খোলা বাজারে টিসিবির পণ্য বিক্রয়, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। অনগ্রসর মানুষ রাষ্ট্রের সুফল ভোগ করছে।
সকল মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হয় ও ভাতার পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়।
দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করতে ভিশনারী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা কৌশল প্রণয়ন করেন এবং পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, রূপকল্প ২০৪১, ভিশন ২০২১, ডেলটা প্ল্যান গ্রহণ করেছেন। ধাপে ধাপে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তকে সংযুক্ত করতে ফোর লেন, এইট লেন, এক্সপ্রেস হাইওয়ে, গভীর সমুদ্রবন্দর। বঙ্গবন্ধু ইপিজেডসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইপিজেড নির্মাণ হয়েছে, হাইটেক সিটি নির্মাণ হচ্ছে নতুন এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য। পদ্মা সেতু, ঢাকায় মেট্টোরেল, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ শেষ দিকে।
বিশ্বব্যাংক ও দেশবিরোধীদের ষড়যন্ত্র, কল্পিত দুর্নীতি মোকাবিলা করে সারা বিশ্বকে চমকে দিয়ে দেশের নিজস্ব অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মাসেতু নির্মাণ করে সমকালীন বিশ্বে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও তাঁর নিজের নেতৃত্বকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। বিভিন্ন জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণ চলছে।
ভারতের সাথে অমীমাংসিত ল্যান্ড বাউন্ডারি সমস্যার সমাধান করে ছিটমহল ও জমি উদ্ধার করা হয়েছে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে। আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায় করে শেখ হাসিনা প্রমাণ দিয়েছেন তিনি কারো কাছে নতজানু নয়।
এই দেশকে বটমলেস বাসকেট বলে উপহাস করেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার। সারাবিশ্ব যখন মন্দায় ধুকছে তখন প্রবৃদ্ধির হার ধরে রেখে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির বিস্ময়, এখন এটি “বাংলাদেশ প্যারাডক্স”। বাংলাদেশের ভিশনারী নেতা শেখ হাসিনার হাত ধরে দরিদ্র দেশের তকমা ঝেড়ে বাংলাদেশ এখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ।
কোভিডের থাবায় সারাবিশ্ব স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। দূরদর্শী শেখ হাসিনা তখন কৌশলী পদক্ষেপে অর্থনীতি চালু রেখেছেন। ফলে উন্নয়নের সূচকে ও মাথাপিছু আয়ে ভারতকে পিছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। কোভিড মহামারীর সময়ে দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলছে দেশ। খাদ্য শস্য উৎপাদন ও গার্মেন্টস রফতানীতে এদেশ এখন শীর্ষ পাঁচে।
এই বছরের শুরুতেই মাতারবাড়ী সমুদ্র বন্দরে ভিড়েছে মাদার ভ্যাসেল। সিঙ্গাপুরের মতো বন্দর ব্যবস্থা গড়ার আগামী স্বর্ণোজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত এটি। এক সাথে গৃহহীন সত্তর হাজার মানুষকে জমিসহ পাকা ঘর উপহার দিয়ে বিশ্বে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। আরো এক লক্ষ ঘর নির্মাণ হচ্ছে।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে যে বাংলাদেশের জন্ম, তাঁরই কন্যা বাংলাদেশের ভিশনারী লিডার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল।
মহাকালের গায়ে ছাপ রেখে ইতিহাস সৃষ্টি করে চলেছেন শেখ হাসিনা। ভবিষ্যতের ইতিহাস বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা ও শেখ হাসিনাকে উন্নত রাষ্ট্র নির্মাতা হিসাবে শীর্ষাসনে বসাবে।