শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী: বাঙ্গালির স্বাধীনতার পরম বন্ধু

এডভোকেট আলী আমজাদ
বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। রয়েছে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অসামান্য অবদান। তাদের একজন হলো ভারতের সেদিনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক আত্মত্যাগী বন্ধু।
শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ১৯১৭ সালে ১৯ নভেম্বর ভারতের বিখ্যাত নেহেরু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্যতম কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহেরুর নাতনী এবং পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু ও কমলা দেবীর কন্যা। ইন্দিরা গান্ধী শৈশবে সুইজারল্যান্ড এবং পরে অক্সফোর্ডে পড়াশুনা করেন।
শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী রাজনীতিতে আগমন করেন পারিবারিক সূত্রে। তিনি ১৯৪২ সালের পরপরই ভারতের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। স্বামী ফিরোজ গান্ধীর সহচার্য্যে তার রাজনীতির মাঠে বিচরণ আরও গতিশীল হয়ে উঠে। রাজনৈতিক কারণে তিনি কারাবরণ করেছেন। তিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি সারা বিশ্বের অন্যতম একজন প্রধানমন্ত্রী এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাহার নিজ ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা বলে ১৯৬৪ সালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রী সভায় তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত হন। ১৯৬৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৫ বছর অত্যন্ত বিচক্ষনতার সহিত দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ১৯৫২ সাল থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের যে পথচলা, সে পথচলার পথে ইন্দিরা গান্ধী ছিল বঙ্গবন্ধুর অন্যতম মিত্র। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে ঢাকায় পাকিস্তানী হানাদারদের দ্বারা যে গণহত্যা চলানো হয়, ২৭ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী ভারতের লোক সভায় তার ভাষণে এর বিবরণ ও করণীয় তোলে ধরেন। ৩১ মার্চ লোক সভায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সর্বাত্মকভাবে সহযোগীতার প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে তা সর্ব সম্মতি ভাবে পাশ করা হয়।
মুক্তিযদ্ধ চলাকালীন সময় মুজিবনগর সরকার গঠন হওয়ার পরপরই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের সংকট আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমন্ডলে তোলে ধরেন। ১৯৭১ সালে মে মাসে বেলগ্রেডে বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধিরা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বাণী পড়ে শুনান। ফলে ৮০টি দেশের প্রতিনিধিরা সাদরে তা গ্রহণ করেন। ০৮ আগষ্ট বিশ্বের সকল রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের কাছে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ভারতের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বার্তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন রক্ষায় ও তার মুক্তির দাবীতে ইয়াহিয়া খানের উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য আহ্বান জানান।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ভারতের সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেন বাংলাদেশের অসহায়, ভিটা মাটি হারা শরণার্থীদের জন্য। জীবনের মায়ায় দেশ ছেড়ে পালানো শরণার্থীদের থাকার জন্য শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পুলিশের অস্ত্রাগার খুলে দিয়েছিলেন নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী গ্রামের অধিবাসীরা নিজেদের ঘরবাড়ী ছেড়ে দিয়েছিল বাঙালি শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য। তৎকালীন সময় বাংলাদেশের জন্য ভারতের মতো এত ত্যাগ অন্য কোন রাষ্ট্র করেনি। ০৬ ডিসেম্বর লোক সভায় ভাষণে বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রদান করেন। শরণার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানকে হুশিয়ারি করেন যে, বাংলাদেশীদের প্রতি এই অন্যায় আচরণ দ্রুত বন্ধ না করলে ভারত চুপকরে বসে থাকবেনা। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ছুটে গিয়েছেন শরণার্থী শিবিরে আশ্রিতদের খবর নিতে।
শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তার অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর আন্তরিকতার দ্বারা ১৯৭১ সালে সারা ভারত জুড়ে গড়ে তুলছিলেন এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য। বাংলাদেশের জন্য সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী চষে বেড়িয়েছেন বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে।
প্রায় ১৭,০০০ ভারতীয় সেনা বাঙালির স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অকাতরে জীবন দিয়েছেন। আমরা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে ঋণী।
১৯৮৪ সালে ৩০ অক্টোবর দিল্লীতে নিজ বাসভবনে নিজ দেহরক্ষীরাই তাকে গুলি করে হত্যা করে। ইন্দিরা গান্ধীর এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারালো এক অকৃত্রিম বন্ধুকে। বিশ্ব হারালো এক নিপীড়িত মানুষের বন্ধুকে। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস যতদিন থাকবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর অবদানও ততোদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক : যুদ্ধকালীন কোম্পানী কমান্ডার