সদর হাসপাতালের দুটি লিফটই বিকল/ দুর্ভোগে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের আট তলা ভবনের দুটি লিফটই বিকল হয়ে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রোগী ও স্বাস্থ্য কর্মীরা। রবিবার বেলা ১১ টায় এই দূরাবস্তার সময় হাসপাতালের আটতলা ভবনে ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আক্তারুজ্জামানও। দুটি লিফট বিকল হয়ে পড়লে অসুস্থ্য রোগীরা অসহায় হয়ে পড়েন। ওয়ার্ডে থাকা রোগীরাও বিড়ম্বনায় পড়েন। রোগীদের খাবার সরবরাহ করা হয় নীচের তলা থেকে। এসময় ছয় তলা-সাত তলা থেকেও রোগীর খাবার নিতে নীচে আসেন রোগী কিংবা রোগীর স্বজনরা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (রোববার বিকাল ৫ টা) হাসপাতালে লিফট মেরামতের জন্য যায় নি কেউ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আট তলা ভবন সমঝে নেয় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। ওই সময়েই লিফটে নানা ত্রুটি ছিল। লিফটের ইমার্জেন্সি ড্রাইভ সিস্টেম (ইডিএস) না রেখেই ভবন সমঝে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে হাসপাতালের জেনারেটর দিয়ে বেশির ভাগ সময়ই লিফট চলে না। বিশেষ করে গরমের মৌসুমে বিদ্যুৎ না থাকলে লিফটও বন্ধ থাকে। ২০২০ সালে এই ভবনে হাসপাতাল স্থানান্তরের পর বহুবার হাসপাতালের লিফট বিকল হয়েছে। একসঙ্গে দুই লিফট বিকলের ঘটনা রোববারই প্রথম।
লিফট বিকল হবার পর হাসপাতালের আবাসিক রোগী, নতুন আসা রোগী, ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী সকলেই বেকায়দায় পড়েন। রোববার হাসপাতাল পরিদর্শনে এসেছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আক্তারুজ্জমান। আটতলার সেমিনার কক্ষে ওঠার সময় লিফটে ওঠলেও নামার সময় পায়ে হেঁটে নামতে হয়েছে তাঁকে।
এই অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েন বয়স্ক ও প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে আসা রোগীরা। আকলিমা বেগম নামের এক রোগী রোববার দুপুরে নীচতলায় প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তার স্বামী আজিজুর রহমান এক পর্যায়ে স্ত্রীকে পাঁজাকোলা করে গাইনি ওয়ার্ডে নিয়ে যান।
দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালের সাত তলার ৭১৬ নম্বরে আছেন শহরের নতুনপাড়ার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা লেখক সৌরভ ভূষণ দেব। পায়ে প্রচ- ব্যাথা তাঁর। রোববার বিকালে সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডা. বিশ^জিত গোলদারকে হাসপাতালের বাইরে গিয়ে দেখানোর কথা ছিল তাঁর। সাততলা থেকে নামার কোন ব্যবস্থা না থাকায় তিনি ডাক্তার দেখাতে পারেন নি।
কেবল এই দুই রোগী নয়। অসংখ্য রোগীকে ওঠা-নামার সমস্যায় রোববার ভীষণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
শহরতলির মাইজবাড়ি থেকে আসা বয়োজ্যেষ্ঠ রেহাতুন বেগম বললেন, ‘পাঁচ তলায় আমার নাতি ভর্তি, আমি ভুড়া মানুষ কিলাখান ওঠতাম।’ অনেক কষ্টে কয়েক সিড়ি ওঠে, বিশ্রাম নিতে নিতে আধাঘণ্ঠায় ওপরে ওঠেছেন জানালেন এই বৃদ্ধা।
আমবাড়ি থেকে আসা রাজিব আহমেদ জানালেন, অনেকদিন ধরেই একটি লিফট নষ্ট, আরেকটির অবস্থাও ভালো নয়। সচল লিফটই চালু থাকাকালীন কোন তলায় আছে, নীচে যাচ্ছে, না উপরে আসছে, বুঝা যায় না। কয়েকদিন আগে লিফটটি দুই তলা থেকে হঠাৎ করেই নিমিষে নীচে পড়ে যায়, লিফটে যারা ছিলেন, তারা কান্নাকাটি শুরু করেন।’
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম বললেন, আটতলা ভবনের হাসপাতালের ৮ম তলায় কনফারেন্স হল, ৭ম তলায় রোগীর ক্যাবিন, ষষ্ট তলায় শিশু ওয়ার্ড, পঞ্চম তলায় পুরুষ ও ডায়রিয়া ওয়ার্ড, চতুর্থ তলায় গাইনী ও মহিলা ওয়ার্ড, তৃতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটার ও প্রশাসনিক ওয়ার্ড, দ্বিতীয় তলায় আউটডোর এবং নীচ তলায় জরুরি বিভাগ রয়েছে। তিনি জানালেন, দুটি লিফটের একটি ২০ দিন আগে বিকল হয়েছে, আরেকটি রোববার বিকল হয়। দুটি লিফট একসঙ্গে এর আগে কখনো বিকল হয় নি। তিনি বললেন, লিফটের এই অবস্থায় আমরা নিজেরাও দুর্ভোগে পড়েছি। রোগীর খাবার রোববার উপরে ওঠানো যায় নি।
হাসপাতালের তত্বাবধায় ডা. আনিছুর রহমান বললেন, লিফট নিয়ে বড় বেশি বিপদে পড়েছি, এই লিফট দেখভালকারী প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত বিভাগ। গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশীকে আমি ফোন দিয়ে অনুরোধ করেছি দ্রুত এগুলো মেরামত করে দেবার জন্য। রোববার স্বাস্থ্য বিভাগের যুগ্মসচিব আক্তারুজ্জামান এসেছিলেন, তিনি লিফটে আট তলায় সেমিনার কক্ষে যান। কিন্তু নামার সময় লিফট বিকল ছিল। পায়ে হেঁটে নেমেছেন তিনি। তিনিও গণপূর্ত বিভাগে ফোনে কথা বলেছেন।
তত্বাবধায়ক জানালেন, বিদ্যুৎ না থাকলে লিফটি একটা তলায় আটকে থাকবে এবং আপনা আপনি দরজা খুলবে এই ব্যবস্থা লিফটে থাকার কথা ছিল। এটাকে বলে ইমার্জেন্সি ড্রাইভ সিস্টেম (ইডিএস)। এটি এখানকার লিফটে ছিল না। গরমের সময় হাসপাতালের জেনারেটরে অনেক সময় লিফট চলে না এটি স্বীকার করে তিনি জানান, সবকিছুই গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানানো হয়েছে। রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মহোদয়ও এগুলো নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করেছেন।
গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মমিনুর রহমান বললেন, হাসপাতালের একটি বিকল লিফট মেরামতের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আরেকটির উপর বেশি চাপ পড়ায় আজ রোববার বিকল হয়েছে। সেটি মেরামতের জন্য প্রকৌশলীরা সিলেট থেকে দ্রুতই আসবেন। দুয়েক দিনের মধ্যে লিফট সচল করার ব্যবস্থা করা হবে।