সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ জেলায় ১৭টি নতুন সেতুর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরমধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘতম সেতু কুশিয়ারা নদীর উপর নির্মিত রানীগঞ্জ সেতু। এটি ৭০২ মিটার দীর্ঘ। হাওরবাসীর বহুল প্রত্যাশিত এই সেতু নির্মাণের ফলে ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জের দূরত্ব ৫২ কিলোমিটার কমেছে। রাজধানী ঢাকাসহ বন্দরনগর চট্টগ্রাম যেতে সুনামগঞ্জবাসীর সময় কম লাগবে দুই ঘন্টা। এতে ব্যবসা বণিজ্যের প্রসার ঘটবে। হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে। টাঙ্গুয়ার হাওরসহ জেলার পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এই সেতু। সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হলো সুনামগঞ্জবাসীর সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
সোমবার বেলা ১১ টায় গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি সুনামগঞ্জ জেলার ১৭ সেতুসহ নবনির্মিত দেশের ‘শতসেতু’ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
সুনামগঞ্জ প্রান্তে এসময় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি, সুনামগঞ্জ- ১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এমপি, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, সিলেটের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ পিপি, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খায়রুল কবির রুমেন সহ জেলা আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ।
সুনামগঞ্জ প্রান্তের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। প্রধানমন্ত্রী সুনামগঞ্জ প্রান্তে কেবল একজন পরিবহন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেন।
সুনামগঞ্জ জেলা ট্রাক ট্যাংক কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নূর উদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুভূতি ব্যক্ত করার সময় জানালেন, ডাবর-জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ হয়ে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের সৈয়দপুরে যুক্ত হওয়া ৪৬ কিলোমিটার সড়ক এবং রানীগঞ্জে সেতু হওয়ায় বদলে যাবে হাওর ভাটির অথনৈতিক চিত্র। ভাটি অঞ্চলের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও হাওরের মাছ এখন কমসময়ে কম খরচে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত রানীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী বিদ্যুৎ কুমার রায় বললেন, রানীগঞ্জ প্রাচীন মোকাম (বড় হাট)। একসময় এর নদীবন্দর হিসেবে খ্যাতি ছিল। কালের বিবর্তনে নদী খাল শুকিয়ে যাওয়ায় বাজারের গুরুত্ব কমেছিল। গত কয়েক বছর হয় সড়ক ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। কিন্তু কুশিয়ারা নদীতে সেতু থাকায় ট্রাকে আসা মালামাল কয়েক বছর ওপারে নামিয়ে ট্রলার বাল্কহেড দিয়ে আনা হয়েছে। ফেরী আসার পরও বড় বড় ট্রাকগুলো আসতে অসুবিধা হয়েছে। এখন আর সেটি হবে না। পুরো জেলায় এ পথ দিয়ে আসবে ঢাকা, ভৈরব ও চট্টগ্রামের মালামাল। বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী রাধিকা রঞ্জন রায় ও মো. জবরুল ইসলামও একই ধরণের মন্তব্য করলেন।
জবরুল ইসলাম বললেন, সেতু হবার পর এই এলাকায় ছোট ছোট শিল্প কারখানা গড়ে ওঠারও স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয়রা।
জেলা প্রশাসক মো. জাহঙ্গীর হোসেন বললেন, এই সেতু সুনামগঞ্জের পর্যটন কেন্দ্রে আসা পর্যটকদের আসতে আরও উৎসাহিত করবে। কম সময়ে সুনামগঞ্জে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট ঘুরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাবেন পর্যটকেরা।
সেতু উদ্বোধন ঘোষণার পর স্থানীয় শিল্পীরা বৈষ্ণব কবি রাধারমণের ‘জলে গিয়া ছিলাম সই’ গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করেন। এছাড়াও সমবেত কন্ঠে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমের গান-‘বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা সবাই কয়’ গেয়ে শুনান বাউল শিল্পীরা।
রানীগঞ্জ বাজারের পাশে রানীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এ উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে এসময় বিপূল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
গণভবনে এই উপলক্ষে আয়োজিত ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে সেতুমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সভাপতিত্ব করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটির গণভবন প্রান্তে সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। অনুষ্ঠানে সেতুগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী। অনুষ্ঠানের শুরুতে শতসেতু নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন হয়।
উদ্বোধন হওয়া সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের ১৭টি নতুন সেতু হলো-রাণীগঞ্জ সেতু, আক্তাপাড়া সেতু, কোন্দানালা সেতু, দাড়াঁখাই, কলকলিয়া সেতু, কুশিলা সেতু, নাদামপুর সেতু, কাটাখাল সেতু, তকিপুর সেতু, ঘরগাঁও সেতু, হাসনাবাদ সেতু, মাধবপুর সেতু, পেপারমিল সেতু, রহমতবাগ সেতু, টেংগারগাঁও সেতু, লক্ষীবাউর সেতু ও নৈনগাঁও সেতু।
প্রসঙ্গত, পাগলা-জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কের রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কুশিয়ারা নদীর ওপর রানীগঞ্জ সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট। ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতু ও আড়াই কিলোমিটার সংযোগ সড়ক কাজ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ২৪ ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড ২৪ বি এবং এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এমবিইএল। চুক্তি অনুযায়ী ৭০২ দশমিক ৩২ মিটার দীর্ঘ এবং ১০ দশমিক ২৫ মিটার প্রস্থ সেতুটির নির্মাণ কাজ ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা ছয় বছরে এসে শেষ হয়।
উদ্বোধনের পর টোল দিয়ে প্রথম সেতু পাড় হন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি।