সময়সীমার প্রায় দু’সপ্তাহ পরও বাকি আছে দুর্বা-দুরমুজ

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই সপ্তাহ গত হতে চলেছে। ২২ ফেব্রুয়ারি বাঁধ পরিদর্শনে এসে এক সুধী সমাবেশে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম ৭ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এরপরও পুরোদস্তুর শেষ হয়নি ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ। বাঁধে মাটি ফেলা প্রায় শতভাগ শেষ হলেও ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারে বস্তাসহ অনেক বাঁধে দুরমুজ ও দুর্বা লাগানোর মতো আনুষাঙ্গিক টেকসই কাজ বাকি রয়ে গেছে।
হাতে গোণা কয়েকটি বাঁধে পিআইসি সংশ্লিষ্টরা ঘাস লাগানোর কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। অবশিষ্ট বাঁধের কোনটিতে দুরমুশ হয়েছে কোনটিতে হয়নি। এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ বাঁধে লাগেনি দূর্বা। কাজ অসম্পন্ন এসব বাঁধে পিআইসি কিংবা শ্রমিক কাউকে খোঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি গত ক’দিন আগের ভারী বৃষ্টিতে প্রকৃতি প্রতিকূলতার জানান দিলেও পিআইসিদের বাঁধমুখী করতে পারেনি। এতে করে ফের কয়েক ঘন্টা বৃষ্টি হলেই বাঁধ ধসে হাওর ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বেহেলী ইউনিয়নের হালি, শনি ও মহালিয়া হাওরের ২৬টি প্রকল্প ঘুরে এমন শঙ্কিত বাস্তবতা চোখে পড়েছে।
হাওর ঘুরে দেখা যায়, বদরপুর থেকে শুরু হয়ে মদনাকান্দি পর্যন্ত বাঁধের একটিতেও দূর্বা লাগানো হয়নি। বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদারের মদনাকান্দিস্থ বাড়ি থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত (বিতর্কিত ৩৭ নম্বর পিআইসি) বাঁধে শুধু নামমাত্র মাটি পড়েছে। এ বাঁধে দুরমুশ-দূর্বা দুটোই বাকি আছে। হালি হাওরের ঘনিয়ার বিল সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারের নদী তীরবর্তী এক অংশে মাটি ধসে বড় ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়েছে এবং ধীরে ধীরে এ ভাঙ্গন বৃহৎ আকার ধারণ করবে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এর বিপরীত পারস্থ শনি হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ দুই ক্লোজার নান্টুকালী, লালুর গোয়ালা ও হালি হাওরের মামুদপুরের ভাঙ্গায় দূর্বা দূরের কথা এখনও পড়েনি কোন বস্তা। তবে লালুর গোয়ালায় উপস্থিত পিআইসি সভাপতি এসও রেজাউল কবির এসে বস্তা কিভাবে পাতা হবে তা দেখাবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু নান্টুকালী ক্লোজার ও মামুদপুরের ভাঙ্গায় পিআইসি সংশ্লিষ্টদের দেখা যায়নি। মামুদপুরের বৃহৎ ক্লোজারটিতে বস্তাবিহীন বাঁশের আড় দেওয়া হলেও এক অংশের আড় হেলে পড়েছে।


অপরদিকে মহালিয়া হাওর সুরক্ষিত কোন বাঁধে লাগানো হয়নি দূর্বা। এ হাওরের মদনাকান্দি গ্রামের অপর তীরে যে ক্লোজার আছে সেখানেও পড়েনি বস্তা। অন্যদিকে হালি হাওর পারের মদনাকান্দি থেকে আছানপুরমুখী ৩৬ নম্বর পিআইসির কাজ অনেকটা সন্তোষজনক। তবে পরবর্তী ৩৫ নম্বর পিআইসির বাঁধে এসকেভেটর এখনও চলমান আছে। পরে আছানপুর থেকে সুন্দরপুর কালীবাড়ি বাঁধ হয়ে উলুকান্দি-যতীন্দ্রপুর পর্যন্ত যে কয়টা বাঁধ আছে সেগুলোর কয়েকটিতে দূর্বা লাগানো চলমান থাকলেও দুরমুশ সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি। এছাড়া উপজেলার পাগনা মিনি পাগনা হাওর রক্ষা বাঁধের কাজও একই অবস্থা বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় প্রকৃতি বেঁকে বসলে বাঁধ ধসে পড়ে হাওর চরম ঝুঁকিতে পড়বে বলে জানিয়েছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা।
উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, হালি ও পাগনার হাওরসহ সকল হাওরের প্রায় ৬০ ভাগ বাঁধে এখনও দূর্বা লাগানো হয়নি। ড্রেসিংয়ের কাজও রয়ে গেছে প্রায় ২০ ভাগের বেশি। কোন কোন বাঁধে এখনও মাটির কাজ বাকি আছে। এ জন্য পিআইসি সংশ্লিষ্টরা বিল অল্প দেওয়ার কারণে তারা ধারদেনা করে যতটুকু পারছেন ততটুকু কাজ এগিয়ে নিয়েছেন, এমনটা বলতে চাইছেন। সবকিছু মিলে বাঁধের কাজ যে পর্যায়ে অবস্থান করছে তাতে হাওর এখনও ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ার ব্যাপারে শংকা প্রকাশ করে আগামী সোমবার সুনামগঞ্জে হাওর বাঁচাও আন্দোলন মানববন্ধন করবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ।
বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার তার বাড়ির সামনের (৩৭ নম্বর পিআইসি) বাঁধ নিয়ে বলেন, এ বাঁধটিতে গত এক সপ্তাহ আগে মাটি ফেলা হয়েছে। আমি খবর নিয়ে দেখেছি আজ থেকে ড্রেসিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এই কাজটা মামুদপুরের একজনকে দেওয়া হয়েছিল। পরে কাজের দেরী দেখে ইউএনও স্যার অন্য আরেকজনকে দিয়ে দিছেন। তাই এ বাঁধের কাজটা একটু বিলম্বিত হয়েছে।
৩৮ নম্বর পিআইসি সভাপতি (মামুদপুর ক্লোজার) মো. আবু তায়েব বলেন, বাঁধে বস্তা দিতে প্রায় ২ লাখ টাকা লাগে। কিন্তু যে বিল পাইছি তাতে কিচ্ছুই হইছে না। এখন টেকার ধান্দায় ঘুরতাছি। দুই দিন আগে ডিসি স্যার আইছিলেন। বাঁশের ফাইলিং দেইখ্যা উনি সন্তোষ প্রকাশ করছেন। এখন টেকা না পাইলে বাকি কাজ করমু কিতা দিয়া।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক আলী আক্কাছ মুরাদ বলেন, নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ চলে গেছে। যতটুকু জেনেছি বাঁধে দূর্বা লাগানোসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ এখনও বাকি আছে। যদি বৃষ্টি হয় তাহলে বাঁধ ধসে বিপদ হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে পিআইসিদের কোন দায়বদ্ধতা কিংবা হাওরের প্রতি দরদ আছে বলে মনে হয় না।
তিনি আরও বলেন, পিআইসি নেওয়ার জন্য তারা এখানে সেখানে ধর্না দিয়ে যে যুদ্ধ চালিয়ে যায় সেই যুদ্ধটা বাঁধে করতে দেখা যায় না তাদেরকে। পিআইসি পাওয়ার পরে বাঁধের প্রতি তাদের তেমন নজর থাকে না। আসলে এর জন্য মূলত কর্তৃপক্ষই দায়ী। যদি সামর্থবান প্রকৃত কৃষকদের এ কাজ দেওয়া হতো তাহলে তারা নিজের জমির মায়ায় হলেও অন্ততঃ বাঁধে পড়ে থাকতো।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে সরকারের কোন কৃপণতা নেই। বাঁধের কাজে কোন কাতির চলবে না। নির্ধারিত সময়ের পরেও মন্ত্রী মহোদয়ের কথামতো আরও ৭ দিন গত হয়েছে। কিন্তু কাজ এখনও বাকি আছে। যদি বড় ধরনের কোন বৃষ্টি হয় তাহলে বাঁধ ভেঙ্গে বিপদের সম্মুখীন হবে হাওর। এতে তদারকি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে উপজেলা কাবিটা স্কীম বাস্তবায়ন মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, যে কাজ বাকি আছে এর সবগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। আর ঘনিয়ার বিল সংলগ্ন ক্লোজারে যে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে সেটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এ জন্য ওয়ার্ক অর্ডারও দেওয়া হয়েছে। তা পাস হলেই দ্রুত সময়ের মধ্যে এর কাজ শেষ করা হবে।