সময় এসেছে উদারতা ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা মুক্ত বাংলাদেশ দেখার অভিপ্রায়ীদের জন্য মঙ্গলবার দিনটি ছিলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এদিন সারা দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে দাঁড়িয়েছেন সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়ে। তাঁরা দুষ্কৃতকারীদের শাস্তি দাবি করেছেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যেনো নতুন করে আর কোনো সহিংসতার শিকার না হন সেজন্য কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কণ্ঠ উচ্চকিত করেছেন। মঙ্গলবার সারাদিনই এমনসব কর্মসূচি প্রত্যক্ষ করে সকলের মনে স্বস্তি তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে; সকলেই বুঝতে পেরেছেনÑ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে শতভাগ সরে আসেনি। মানুষের একটি বড় অংশ সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, সৌভ্রার্তৃত্বের আদর্শে এখনও উজ্জীবিত। এদিন দেশের বড় রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগসহ বহু সংগঠন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রত্যয় ব্যক্ত করে সহিংসতার শিকার জনগোষ্ঠীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। গত দেড় সপ্তাহ ধরে চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর মঙ্গলবারের এই জনসমাগম ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মনে সামান্য হলেও সান্ত¡নার উপলক্ষ হয়ে উঠেছে নিঃসন্দেহে।
একথা ঠিক, দুর্বৃত্তরা সর্বদাই সংখ্যায় অল্প হয়। এরা জনচক্ষু এড়িয়ে, রাতের আঁধারে অথবা সুযোগ বুঝে অপরাধ করে আবার মিলিয়ে যায়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ক্ষেত্রেও এমনই ঘটেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলোÑ এই অপরাধীচক্রকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। মঙ্গলবারের বিভিন্ন সমাবেশ থেকে যে কথা শুনা গেছে তার অন্যতম হলোÑ দেশে ইতোপূর্বে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা গেলে ২০২১ সনের এই সময়ে এসে আমাদের হৃদয় ভেঙে দেয়া ঘটনাবলীর সম্মুখীন হতে হতো না। বিচার হয়নি বলেই দুর্বৃত্তরা দুর্বিনীত হয়েছে, বেপরোয়া হয়েছে। আর কে না জানে, এইসব ঘটনা ঘটুকÑ তা চায় অনেক পক্ষ। এই পক্ষগুলো যেমন আছে দেশের ভিতরে তেমনি রয়েছে দেশের বাইরে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রধান উপকরণ হলো সাম্প্রদায়িকতার ট্রাম্পকার্ড। এই রাজনৈতিক চাহিদার পশ্চাতে থাকে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ। আর এর সবকিছু ঘটে মনন ও চরিত্রে সাংস্কৃতিক শ্যাওলার আস্তরণ পুরো হলে। আমাদের দেশে এখন যেসব অদ্ভুত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত তার অধিকাংশই সাম্প্রদায়িক মনোভাব তৈরির উর্বর ক্ষেত্র। পারিবারিকভাবেও এখন আমরা অনেকটা রক্ষণশীল হয়ে গেছি। সন্তানদের উদারতার পরিবর্তে শিক্ষা দেই বিচ্ছিন্নতার। ফলে শিশু বয়স থেকেই আমাদের সন্তানেরা বেড়ে উঠে অন্যকে অবজ্ঞা করার মানসিকতা নিয়ে। এর বিষফল প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। মঙ্গলবার সকল স্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে বাঙালির উদার সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করার আকুতি জানিয়েছেন।
ঘৃণার সংস্কৃতি কেবল ঘৃণাই তৈরি করে। কোনো একটি সম্প্রদায় বিশেষ নিশ্চিহ্ন হলেও ঘৃণার এই সংস্কৃতি দূর হবে না। ক্ষুধা লাগলে মানব শরীর বাইর থেকে খাদ্য না পেলে যেমন নিজের শরীরে সঞ্চিত চর্বি থেকে খাদ্য আহরণ করে তেমনি ঘৃণার সংস্কৃতি উপযুক্ত প্রতিপক্ষ না পেলে নিজেদের ভিতর থেকেই প্রতিপক্ষ খুঁজে নিবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে, এমন কি আমাদের চারপাশে তাকালে এমন ঘটনার দেখা পাওয়া যায়। তুচ্ছ কারণে একের হাতে অন্যের প্রাণহানি, ছোট-খাট বিষয় নিয়ে মারামারি; এসব কিছুই ঘৃণার সংস্কৃতি থেকে উদ্ভুত। জাতি হিসাবে আমাদের অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটছে নানা উপলক্ষে। সময় এসেছে বাংলাদেশের সকল নাগরিককে আবারও উদারতা ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার। মঙ্গলবার হাজার-লক্ষ কণ্ঠে সেই আকাক্সক্ষারই প্রতিধ্বনি শুনা গেছে।