সাচনা-বেহেলী সড়কে সেতু যেন মরণফাঁদ

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াতের পথ জামালগঞ্জের সাচনা-বেহেলী সড়কের চৌধুরী বাড়ি সেতু ভয়ংকর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সেতুর মাঝ অংশ ফুটো হয়ে বৃহৎ আকার ধারণ করায় সম্প্রতি অটোরিক্সা চালকদের পক্ষ থেকে বালু, পাথর, সিমেন্টের জোড়াতালিতে চলাচল উপযোগী করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরক্ষণেই তা ভেঙে পড়ে যাওয়ায় পরবর্তীতে রডের উপর কোনরকম বøক ফেলে রাখা হয়েছে। তাতে ভারি কোন গাড়ি উঠলেই চাকা দেবে যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া দুই প্রবেশমুখসহ মাঝ অংশের র‌্যালিংও ভেঙে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে সেতুটি।
বিপজ্জনক এই সেতু নিয়ে গত বছরের অক্টোবরে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর-এ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। তখন উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘তিনি প্রথম শুনেছেন এ সেতুতে সমস্যা আছে। এর আগে এ বিষয়টি কেউ তাকে জানায় নি। সে সময় সরজমিনে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের দশ মাস গত হলেও ভঙ্গুর সেতুটি সংস্কারের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নি। চরম ঝুঁকিপূর্ণ এ সেতুটির প্রতি কোন নজরদারি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
সাচনা বাজার থেকে বেহেলীগামী চৌধুরী বাড়ি সেতুটি বছর দুয়েক আগে থেকে বেহাল দশায় আছে। ভেঙে পড়েছে দু’পাশের নিরাপত্তা বেষ্টনী। চৌধুরী বাড়ি অংশের প্রবেশমুখ সংলগ্ন সেতুর মাঝ বরাবর ফুটো হয়ে বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে। বেরিয়ে এসেছে লোহার রড। অসাবধানতাবশতঃ ফুটোকৃত স্থানে কারও পা কিংবা চাকা ঢুকে পড়লে নিশ্চিত বড় দুর্ঘটনা ঘটবে। চলাচলের নিরাপত্তার জন্য দেওয়া র‌্যালিং ভেঙে পড়ায় যেকোন সময় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নীচে পড়ে প্রাণ হারানোর আশঙ্কাও আছে। সেতুটি দ্রæত মেরামত ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
জানা যায়, উপজেলার বেহেলী, জামালগঞ্জ উত্তর ও সাচনা বাজার ইউনিয়নসহ তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ৭০-৮০ টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম সাচনা চৌধুরী বাড়ি সেতু। সাচনা বাজার থেকে বেহেলীগামী সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ এ সেতু দিয়ে প্রতিদিন শত শত টমটম, টলি, অটোরিক্সা, রিক্সা, মোটরসাইকেল চলাচল করছে। সেতুটি অত্যন্ত সরু হওয়ায় একটি রিক্সা কোনরকম তাতে চলতে পারে। একটি উঠলে আরেকটিকে সেতুর অপর মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
এলাকাবাসী সূত্রে আরও জানা যায়, প্রায় দুই দশক আগে সাচনা বাজারের হোমিও চিকিৎসক ডা. জিআর রায় আগের এই পুরোনো সেতু পার হতে গিয়ে মোটরসাইকেলসহ নীচে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এরপর বিএনপি জোট সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত¡াবধানে পুরাতন সেতু ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণ করা হয়। ১৬-১৭ বছর যেতে না যেতেই আবার মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। নির্বিঘœ যাতায়াতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা সরু এই ব্রিজটি ভেঙে প্রশস্ত করে আবার পুনঃনির্মাণের জোর দাবি উঠছে।
স্থানীয় রিক্সাচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ব্রিজের এই ভাঙাটা ছোট থেকে এত বড় হয়েছে। সাইডের র‌্যালিংও ভেঙে গেছে। এগুলো দেখার কেউ নেই। এখানে পড়ে মানুষ মরলে, মায়া কান্না কাঁদতে আসবেন অনেকেই।
সেতু সংলগ্ন মন্দিরে নিয়মিত আসা-যাওয়া করা লোকনাথ সেবা সংঘের সভাপতি সজীব বনিক বলেন, চৌধুরী বাড়ি’র সেতু দিয়ে শুধু এখানকার মানুষই নয়, পার্শ্ববর্তী উপজেলার মানুষও যাতায়াত করে। এছাড়া সেতু থেকে নেমেই ৫ টি মন্দিরের অবস্থান। জনগুরুত্বপূর্ণ এই সেতুর মাঝখানে যে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে যেকোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটবে। স্কুলগামী শিশু-কিশোররা হঠাৎ দুষ্টুমীর ছলে গর্তে পড়ে গিয়ে নিশ্চিত বিপদের সম্মুখীন হবে। জরুরী ভিত্তিতে সেতুর মেরামত প্রয়োজন।
সাচনা চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা অর্ধেন্দু ঘোষ চৌধুরী (সঞ্জু) জানিয়েছেন, আগের পুরোনো সেতুটি পাকিস্তান আমলে (সম্ভবত ১৯৬৬-৬৭ সালে) রামপুর গ্রামের আব্দুস সত্তারের তদারকিতে নির্মিত হয়েছিল। তখন সড়ক থেকে দু’পাশে বাঁশের চাটাই হয়ে সেতুতে উঠতে হতো। পরবর্তীতে সেটি ভেঙে বর্তমান সেতু নির্মাণ করা হয়। সেতুটির নির্মাণকালে অনিয়ম হয়েছিল, এখন এটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। চলাচলের ঝুঁকি এড়াতে সাময়িক সংস্কার করে এখানে একটি প্রশস্ত দীর্ঘস্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার জানিয়েছেন, এ অঞ্চল দিয়ে আমাদের লোকজন প্রায়ই আসা-যাওয়া করে। আমরা জানি এখানে ছোট্ট একটা ছিদ্র আছে। এই সেতু ভেঙে নতুন করে করার প্রাক্কলন তৈরি করছি আমরা। একারণে ছোটখাট কাজগুলো আমরা করছি না এই মুহূর্তে। আর গর্তটা যদি ভয়ংকরই হয়, তাহলে এডিপি থেকে আমরা করে দিব।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ বলেন, চৌধুরী বাড়ি’র সেতু অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ভঙ্গুর সেতুটি রিপিয়ারিং করে আপাতত নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। কারণ এই সেতু দিয়ে দুই-তিন উপজেলার মানুষ চলাচল করে। দ্রæততার সাথে সেতুর সংস্কার কাজ শুরু করা হবে।