সার্বজনীন দুর্গোৎসব

এস ডি সুব্রত
মহামারী করোনার প্রভাব কাটিয়ে যখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস তখন আনন্দ বারতা নিয়ে আসছেন দেবী মহামায়া। সকল অন্যায় অবিচার দূর করে দেবী দুর্গা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে প্রতি বছর পালিত হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। গত বছরের তুলনায় এবছর পূজা জাঁকজমকপূর্ণ হবে আশা করা যাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্যবিধির উপর নজর থাকবে অবশ্যই। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—-
“ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে
বা হাত করে শঙ্কা হরন
দুই নয়নে স্নেহের হাসি
ললাটনেত্র আগুনবরণ।”
দুর্গা পূজা কবে কখন শুরু হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। দুর্গা পূজার শুরু নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। ভারতে দ্রাবিড় সভ্যতার দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। আর্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবতাদের। অনার্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবীদের। দেবীরা পূজিত হতেন আদ্যাশক্তির প্রতীক রূপে। প্রায় ২২ হাজার বছর পূর্বে ভারতের প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠী থেকে দেবী পূজার প্রচলন। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় তা আরো গ্রহণযোগ্য ও বিস্তৃত হয়ে উঠে। মাতৃপ্রধান পরিবার মায়ের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, এই মতানুসারে দেবী হলেন শক্তির রূপ। শাক্ত মতে কালী বিশ্বসৃষ্টির আদিকারন। মহাভারত অনুসারে দুর্গা বিবেচিত হন কালী শক্তির আরেক রূপে। বৃহদ্ধর্ম পূরাণ ও কালিকা পুরাণ মতে রাম রাবনের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গা কে পূজা করা হয়েছিল। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময় পূজার যথাযথ সময় নয়। এই দুই পুরাণ অনুসারে রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। মারকেন্দিয় পুরাণ মতে চেদী রাজবংশের রাজা সুবায়া খ্রিস্ট্রের জন্মের ৩০০ বছর আগে উড়িষ্যায় দুশেরা নামে দুর্গা পূজা প্রচলন করেছিলেন। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে দুর্গা পূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দুর্গা ভক্তি তরঙ্গিনীতে দুর্গা বন্দনা পাওয়া যায়। ১৫১০ সালে কুচবংশের রাজা বিশ্বসিংহ কুচবিহারে দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন। ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন বলে ধারনা করা হয়। ওড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমলে থেকে দুর্গা পূজা হয়ে আসছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই পূজা ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারী বা কমিউনিটি পূজা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। দক্ষিণ এশিয়ায় এটাকে শরৎকালের বার্ষিক মহাউৎসব হিসাবে ধরা হয় বলে ইহাকে শারদীয় উৎসবও বলা হয়। বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ১৮ শতকে মঠবাড়িয়া নবরতœ মন্দির এ ১৭৬৭ সালে প্রথম দুর্গা পূজা হয় বলে লোকমুখে শোনা যায়। ইতিহাসবিদ দানীর মতে, পাঁচশ বছর আগে রমনার কালী মন্দির নির্মিত হয়েছিল এবং সেখানে কালী পূজার সাথে দুর্গা পূজাও হতো। কারো মতে রাজশাহীতে তাহেরপুরে রাজা কংস নারায়ন প্রথম দুর্গা পূজা করেন এদেশে। ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ মতে, দুর্গা পূজার প্রথম প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ। দ্বিতীয় বার দুর্গা পূজা করেন স্বয়ং ব্রহ্মা। তৃতীয় বার দুর্গা পূজা আয়োজন করেন মহাদেব। বিংশ শতকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে দুর্গা পূজা সমাজের বিত্তবান এবং অভিজাত হিন্দু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান শতাব্দীর শুরুর দিকে দুর্গা পূজা তার সার্বজনীনতা পায়। ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর এককভাবে দুর্গা পূজা ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠে। বাংলাদেশে বিত্তশালী হিন্দু দের প্রভাব প্রতিপত্তি কমতে থাকে। ফলে একক দুর্গা পূজা থেকে প্রথমে বারোয়ারী বা কমিউনিটি দুর্গা পূজা এবং পরে সার্বজনীন দুর্গা পূজার প্রচলন শুরু হয়। সার্বজনীন দুর্গা পূজার প্রচলন হওয়ার পর থেকে এই পূজা জনপ্রিয়তা লাভ করে। এখন দুর্গা পূজা ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে রূপ নিয়েছে সামাজিক উৎসবে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।