সুনামগঞ্জের প্রকৃত বাতিঘর তিনি

কুমার সৌরভ
ব্যাকব্রাশ করা চুল তখন তাঁর। বেশি পাকা অল্প কাঁচা। চোখে বড় ফ্রেমের চশমা। রাশভারী চেহারা। চোখ দু’টি ভাবের কোন্ অজানা জগতে নিক্ষিপ্ত, তাই অভ্রভেদী দৃষ্টির তীক্ষèতা। স্বল্পভাষী। পরনে সাদা পায়জামা সাদা পাঞ্জাবি। সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ এক ব্যক্তি। কাছে যাওয়া যায় কিন্তু ছুঁয়া যায় না। কথা বলা যায় কিন্তু পালটা জবাবের আশা করা যায় না যেন। তাঁর বাইরের এই ঘরানা যে একেবারেই ঠুনকো, তাঁকে নিয়ে এই উপলব্ধি যে একেবারেই অন্তসারশূন্য, তা একবার যে তাঁর কাছ ঘেঁষতে পেরেছে সেই বুঝে নিয়েছে। সাহস করে তাঁর পাঞ্জাবির ঝুলে পড়া পকেটের কাছে গেলেই রিনিঝিনি মিষ্টতার আবেশ পাওয়া গেছে। তাঁর প্রশস্ত পকেট যেন রাশি রাশি চকলেট আর মোহন বাঁশিতে ঠাসা। যে তাঁর সান্নিধ্যে গেছে সেই বলতে বাধ্য হবে, তিনি ছিলেন শিশুর মতো সরল, জ্ঞানগম্ভীর, আকাশছুঁয়া উদার, সাগরের মতো প্রাণময়। হ্যাঁ, তিনি মরহুম আব্দুল হাই। সুনামগঞ্জের বিরলপ্রজ এক ব্যক্তি। ভাষাসংগ্রামী, রাজনীতিক, অভিনেতা, সংস্কৃতি সংগঠক, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, গীতিকার, ভাবুক; সর্ব গুণে গুণান্বিত এক মহিরুহ। এক ব্যক্তির মাঝে এতো গুণের সমন্বয়; সুনামগঞ্জে কেনÑ সারা দেশেই বিরল। তিনি কাজ করতেন নিজের কর্তব্য জ্ঞান করে, নিজেকে জাহির করতে নয়। তাই জীবদ্দশায় এমনকি মৃত্যুর এতো পরেও তিনি অন্তরালের এক মানবসন্তান। তাঁকে নিয়ে আদিখ্যেতা দেখানো কিংবা হায় আফসোস করার মতো মানুষ খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়। নিজের ওজনের সামান্য প্রতিদানও পাননি এই বটবৃক্ষসম কৃতী মানুষটি। যিনি মাতৃভাষার মান বাঁচাতে কৈশোর ও যৌবনে রাস্তায় নেমেছিলেন সেই তিনি প্রৌঢ়ত্বকাল কাটিয়েছেন ভাবসাগরে অবগাহন করে করে। লোকজ শিল্প ধারার সমৃদ্ধ এই হাওরাঞ্চলের আরেক রতœ হাছনরাজার গানের গবেষণা এবং হাছনরাজার গান সংকলিত করে করে পার্থিব জগতের মায়া ভুলে অপার্থিব জগতের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। নিজের নামের সাথে হাছনপছন্দ যোগ করে সত্যিকার অর্থে একজন হাছনপ্রেমিক ও ভাবুকে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। যিনি নিজেকে ভুলে ডুব দিয়েছিলেন অতল সাগরতলায় মনিমুক্তো আহরণ করবেন বলে। আশ্চর্য! কী অবলীলায় আমরা তাঁকে ভুলে বসে আছি। নিদারুণ মূঢ়তা আমাদের। সীমাহীন দীনতা আমাদের। ক্ষমা করবেন আব্দুল হাই, আপনি নিজের উচ্চতা দিয়ে আমাদের বামনত্ব সম্পর্কে কোনো পূর্বাভাস দেননি ঠিকই। কিন্তু সময় আজ আমাদেরকে মহাকালের সর্বাপেক্ষা বামন বলে উপহাস করছে। আপনার তাতে কিছুই আসবে যাবে না। হিমালয় পর্বত শিখরকে কোনো আবর্জনা কলুষিত করতে পারে না। আপনি সুনামগঞ্জের কত বড় সুনাম ছিলেন তা একদিন উদঘাটিত হবেই। এমন বন্ধ্যাকাল চিরস্থায়ী নয়। আপনার কীর্তির উপর যত পরত আস্তরণই পরুক না কেন, একদিন সেইদিন আসবে যেদিন ধুলো কিংবা বিস্মরণের আস্তরণ ধুয়ে মুছে শরতের নীল উজ্জ্বল আকাশের মতো আপনার কীর্তি সকলের সম্মুখে বেরিয়ে আসবে।
ব্যক্তিক স্মৃতির এক চিলতে আলো
মরহুম আব্দুল হাই সাহেবের নিজের একটি ছাপাখানা ছিলো। মুর্শিদী প্রেস। পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে ছিলো সেই ছাপাখানা। আমার বাবার ছিল বই বাঁধাই ও কাগজাত ব্যবসা। ছাপাখানায় বিভিন্ন ফরম ও রেজিস্টার ছাপিয়ে দোকানে বিক্রি করতেন। বাবা দুই/একটি লোকগানের বইয়ের প্রকাশকও ছিলেন। সেইসূত্রে ছাপাখানায় আসা-যাওয়া আমার শৈশবাবস্থা থেকেই। মুর্শিদী প্রেসেও এমন ছাপার কাজে বাবার সাথে, সময়ে একা একাও গেছি বহুবার। সেই যাতায়াতের সময় প্রায় প্রতিবারই সাক্ষাৎ হত আব্দুল হাই সাহেবের সাথে। তাঁর বিশালত্ব সম্পর্কে আমার অপরিপক্ক বয়সে কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু বেশভূষা ও স্থিতধী ব্যক্তিত্ব তাঁর প্রতি আমার সমীহভাব প্রকট করে তুলেছিল। কাছে যেতাম না তেমন। দূর থেকে দেখতাম। একদিন কাছে ডাকলেন। বাবার নাম করে বললেন, অমুকের ছেলে তুমি। কী পড়। ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলাম। তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেনÑ দোকানদারি করলে চলবে, মানুষ হতে হবে তো, তাই পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে বাবা। সভয়ে আমি পিছিয়ে এলাম। বারবার ঘাড় বাঁকিয়ে তাঁর কথায় সম্মতি জানিয়ে ফিরে আসলাম। কানে বাজতে লাগল তাঁর সেই উপদেশÑ মানুষ হতে হবে তো… মানুষ হতে হবে তো…। দুই হাত দুই পা মুখ চোখ কান সবকিছু মিলিয়ে আমি তো সেসময় মানুষই ছিলাম। তবুও কেন মানুষ হওয়ার উপদেশ? সেদিন তাঁর কথার মূল সুর না বুঝলেও মনে গেঁথে গিয়েছিলো কথাটি। ওই কথার সুর সেই যে আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, আজও নিস্তার নেই। মানুষ হতে হবে তো..। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ওই ধেয়ে আসা ঘূর্ণাবর্তের হাত থেকে রেহাই নেই। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান মানুষ কিংবা অমানুষ হওয়ার জন্য। ক্ষণিকের স্খলনে মনুষত্ব বিসর্জিত হতে পারে, আবার কোনো মহত্তর প্রয়াস অমানুষকেও মানুষের মর্যাদা এনে দিতে পারে। তাই কখন মানুষ আর কখন অমানুষ; এই দ্বৈরথ থামার নয়। মৃত্যুবধি মানুষ কিংবা অমানুষ হওয়ার ব্যাপক বিস্তৃত জীবৎকালকে তাই সবসময় নিরন্তর অনুশীলনে রাখতে হয় অভীষ্ট লক্ষার্জনে। মৃত্যুর পর কেউ যদি বলেÑ না সে প্রকৃতই মানুষ ছিলো; তবেই তো সার্থকতা। যেমন বলছি আজ আমরা, আব্দুল হাই ছিলেন একজন বিরলপ্রজ মানুষ।
আব্দুল হাই যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন আমি তরতাজা যুবক। যে বিকেলে তিনি মারা যান (২৫ এপ্রিল ১৯৮৩), বৈশাখের সেই তপ্ত বিকেল ওই মৃত্যুশোকে বরফের মতো জমে গিয়েছিলো। ছুটে গিয়েছিলাম আরপিননগরে তাঁর বাসভবনে। বিছানায় শায়িত ব্যক্তিটিকে দেখে এক বর্ণনাতীত দুঃখবোধ জেগেছিলো মনের গহীনে। ওই প্রথম তাঁর বাসভবনে যাওয়া। যে ঘরে শুয়ে ছিলেন তিনি সেই ঘরে ছিল কয়েকটি কাঠের আলমারি ভর্তি বই। বই জগতের যাবতীয় জ্ঞানের আধার। বইই মহাকালকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। বই ব্যক্তির চিন্তাকে বহু জনে ছড়িয়ে দিয়েছে। মূলত বইয়ের পাতায় চড়েই মানবসভ্যতা ক্রমাগত উপরে উঠেছে। সেই গ্রন্থরাজির মাঝখানে নিথর শুয়ে থাকা আব্দুল হাইকে সেদিন আমার মনে হয়েছিলো প্রকৃতই এক জ্ঞানী ব্যক্তি পরম সুখ ও তৃপ্তি নিয়ে চোখ বুজে আছেন। জীবনের অবসানে পেছনে ফেলে যাওয়া সময়ের খেরোখাতা মিলানোর পালা শুরু হয়। আব্দুল হাই বেঁচেছিলেন মাত্র ৫৪ বছর (১৯২৯-১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দ)। বর্তমান সময়ের তুলনায় নেহায়েতই অকিঞ্চিৎকর জীবৎকাল। অকাল মৃত্যুই বলা যেতে পারে। কিন্তু মানুষের দীর্ঘ জীবৎকাল তো কখনও কালের শরীরে চিহ্ন এঁকে দেয়ার কোনো পূর্বশর্ত নয়। এখন তো অনেকেই শতায়ু হন। অশীতিপরও ভুরি ভুরি। তাঁদের কয়জন সময়ের গায়ে এমন কিছু ছাপ রেখে যেতে পেরেছেন যা মৃত্যুর পরও তাকে অমরত্ব প্রদান করতে সক্ষম? হিসাব নিলে এমন দীর্ঘজীবি কীর্তিহীনের সংখ্যার হিসাব মিলানো দায় হবে। এর চাইতে আব্দুল হাইয়ের ৫৪ বছরের জীবন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ। তিনি সময়কে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সময়কে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি নির্মাণ ও চিন্তায়, কর্ম ও নৈপুণ্যে, ত্যাগ ও সাধনায়; বহুকিছু দান করে গেছেন। এমন স্বল্পায়ু মহৎপ্রাণ ব্যক্তিরাই পৃথিবী নামক এই গ্রহটিকে গুহা, পাথর, অসভ্যতা ও আদিমত্ব থেকে আধুনিক করেছেন। গতিকে প্রগতিতে রূপান্তরিত করেছেন। সুতরাং আব্দুল হাই সাহেবের ৫৪ বছরের জীবনই আমাদের এক পরম অর্জন।
অনেক কিছুর প্রথম তিনি
আগেই বলেছি এক অঙ্গে এত রূপ, খুব কমই দেখা যায়। আব্দুল হাই জীবনে বহু কাজ করেছেন। তাঁর প্রতিটি কাজই পৃথক পৃথক মূল্যায়নে মূল্যায়িত হবে। তিনি অনেক কিছুর প্রথম। প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের যে সংগঠনÑ ছাত্র ইউনিয়ন, সেটির শুরুতেও আব্দুল হাই’র অনন্য ভূমিকা ইতিহাসের অন্যতম অনুষঙ্গ। ১৯৫১ সনে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্চে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে গঠন করা হয় সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়ন। ওই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন আব্দুল হাই। ১৯৫২ সনে জাতীয়ভাবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হলে সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়ন ওই সংগঠনে আত্মীকৃত হয়ে যায় এবং অবধারিতভাবে জাতীয় ভিত্তিক ছাত্র ইউনিয়নের সিলেট জেলা শাখার সভাপতিও নির্বাচিত হন আব্দুল হাই। ১৯৫৬ সনে সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগ গঠিত হলে তিনি মহকুমা শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বলাবাহুল্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে গঠিত ওই কমিটিই সুনামগঞ্জের প্রথম সাংগঠনিক কমিটি। সুতরাং সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসাবে মরহুম আব্দুল হাই’র নাম ইতিহাসের পাতায় ধ্রুবতারার মতোই জ্বলজ্বল থাকবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সনে যে সাধারণ নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সম্পাদক হিসাবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন মরহুম আব্দুল হাই। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সনে দ্বিতীয়বারের মতো সুনামগঞ্জ সফর করেন (এর আগে বন্যাদুর্গত সুনামগঞ্জবাসীকে সমবেদনা জানাতে ১৯৭২ সনের ২৭ জুন বঙ্গবন্ধু সুনামগঞ্জ সফর করেছিলেন। উল্লেখ্য, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু মোট ৮ বার সুনামগঞ্জ সফরে আসেন। )। নির্বাচনকেন্দ্রীক সফর হলেও ১৯৭৩ সনের ওই সফরে বঙ্গবন্ধুকে দেয়া হয় উষ্ণ গণসংবর্ধনা। যথারীতি আব্দুল হাই ছিলেন সেই অভ্যর্থনা কমিটির সম্পাদক। বাংলাদেশ-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি গঠন করা হলে তিনি এই সংগঠনের সুনামগঞ্জ মহকুমা শাখার প্রথম সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকও এই আব্দুল হাই। হাছন রাজার গানকে জগৎময় ছড়িয়ে দেয়ার অন্যতম ব্যক্তি তিনি। তিনি পরাধীন পাকিস্তানে স্বসংস্কৃতির বিকাশ সাধনে ১৯৬৩ সনে সুনামগঞ্জে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও স্বাধীনতা পরবর্তী বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতিকে জনসম্মুখে নিয়ে আসতে আব্দুল হাই সাপ্তাহিক সূর্যের দেশ পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনার মাধ্যমে অনিয়ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি রাখেন। যুদ্ধকালীন জনমত নামক বুলেটিন প্রকাশ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত রাখতে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন বালাট সাবসেক্টরের প্রচার বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত। উপরে তাঁর পথিকৃতসুলভ যে সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার তথ্য পরিবেশন করা হলো, আব্দুল হাই সেগুলোতে সম্পৃক্ত হিেছলেন যুগদাবি পূরণ করতে। যুগদাবি পূরণ করতে যেয়েই তিনি এতকিছুর প্রথম হয়ে যান। রবি ঠাকুর কবিতায় বলেছিলেনÑ ‘‘প্রথম আলো পড়–ক মাথায়/নিদ্রা-ভাঙা আঁখির পাতায়/জ্যোতির্ময়ী উদয়-দেবীর/আশীর্বচন মাগো। /ভোরের পাখি গাহিছে ওই,/ আনন্দেতে জাগো।’’ আব্দুল হাইও তেমনি নিদ্রা-ভাঙা আঁখির পাতায় ভোরের ¯িœগ্ধ প্রথম আলোর পরশ লাগাতে চেয়েছিলেন, প্রথম হতে নয়।
পত্রে পল্লবিত তিনি
একটি অসাধারণ কাজ করেছেন মরহুম আব্দুল হাই এঁর মেয়ের জামাতা আল আজাদ। তিনি আব্দুল হাইকে নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ গ্রন্থ রচনা করেছেন ‘ভাষা সংগ্রামী আব্দুল হাই’ নাম দিয়ে। এই বইয়ে আব্দুল হাইর পুরো জীবনের একটি স্কেচ আঁকার চেষ্টার সাথে মূল্যবান কিছু সংযুক্তি দিয়েছেন আল আজাদ। বইয়ে তিনি আব্দুল হাই এঁর ১৪ খানা পত্র সংযুক্ত করেছেন। এর ১৩ খানা পত্রই তিনি কারাবাসকালে লিখেছেন। ১৯৫৪ সনে আরও অনেক রাজবন্দীর সাথে আব্দুল হাইও প্রায় এক বছর নিরাপত্তা বন্দী হিসাবে কারান্তরালে ছিলেন। সিলেট ও ঢাকা কারাগারে বন্দী জীবন কাটান তিনি। কারাবন্দীকালে তিনি নিজের মা ও বোনকে এই ১৩ খানা পত্র লিখেন। পত্রগুলো সম্পর্কে আল আজাদ লিখেছেন, ‘‘এই ঐতিহাসিক চিঠিগুলোতে পড়াশোনার প্রতি তার গভীর আগ্রহের পাশাপাশি মনেবলের দৃঢ়তা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।’’ আল আজাদ চিঠিগুলোকে যথার্থই ঐতিহাসিক রূপে চিহ্নিত করেছেন। সত্যিই এই চিঠিগুলো পড়লে ব্যক্তি আব্দুল হাই ও তাঁর সমকালকে কিছুটা চেনা যায়। আল আজাদের আব্দুল হাই সম্পর্কে লিখা বইখানা এই চিঠিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক রাজনীতিকই এরূপ পত্র লিখেছেন। কিন্তু প্রায় অধিকাংশ পত্রগুলোই সংরক্ষিত থাকেনি। পত্রের প্রাপকরা এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে না হয় অবহেলাজনিত কারণে এসব পত্র কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে দিয়েছেন। যদি এইসব পত্র আজ খুঁজে পাওয়া যেত তাহলে ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ ও এর নানা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বহু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পাওযা যেত। এ দিক দিয়ে মরহুম আব্দুল হাই সাহেবের পরিবারের সদস্যদের ধন্যবাদ দিতে হয় যে, তাঁরা এই ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ চিঠিগুলো যতœ সহকারে সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
কারাগার থেকে লিখা চিঠিগুলোর ক্রমবিন্যাস করলে দেখা যায়, আব্দুল হাই ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্ট, ৩১ আগস্ট, ১২ সেপ্টেম্বর, ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৪ অক্টোবর, ৩০ অক্টোবর নিজের মাকে (তিনি যাঁকে মাইজি বলে সম্বোধন করেছেন), ২৮ ডিসেম্বর বোনকে (তিনি যাঁকে ছোট বুবাই বলে সম্বোধন করেছেন), ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি, ১১ ফেব্রুয়ারি, ৩১ মার্চ, ১ বৈশাখ (ইংরেজি তারিখ দেয়া নেই), ১ মে ও ১৫ জুন মাকে লিখেছেন। বইয়ে সংযুক্ত সর্বশেষ চিঠিটি ছেলের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় অবস্থানকালে ১৯৮২ সনে ৩ মেয়েকে উদ্দেশ্য করে লিখা। কারাগার থেকে লিখা ১৩ খানা চিঠির ১২ খানাই তিনি মাকে লিখেছেন। এতে করে মার সাথে তাঁর গভীর সম্পর্কের কথা বুঝা যায়। বুঝা যায়, তাঁর যত আবদার, যত অনুযোগ-অভিমান, সবই মাকে ঘিরে। অন্তত ওই সময়টাতে বাইরের জগতের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিলো মাকে কেন্দ্র করেই। প্রতিটি চিঠির নীচে তিনি ‘গোলাপ’ নামে স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ মরহুম আব্দুল হাই এঁর ডাক নাম যে গোলাপ ছিলো তা এই চিঠিগুলো পাওয়া না গেলে আর জানাই হত না। চিঠিগুলো থেকে এই বোধ পাওয়া যায় যে, তিনি কারাগারে থেকেও আত্মকেন্দ্রীক ছিলেন না। পরিপার্শ্ব ও প্রতিবেশীদের নিয়ে তাঁর চিন্তা ও উদ্বেগ কম ছিল না। দ্বিতীয় চিঠিতে তিনি লিখছেন, ‘‘সুনামগঞ্জে কেমন জল করিল। আমাদের বাড়ির কোন জায়গা পর্যন্ত জল উঠিয়াছে জানিতে পারিলে দেশের সয়লাব সম্বন্ধে অনেক কিছু আন্দাজ করিতে পারিব।’’ বর্ষাকাল ও বন্যার দুর্যোগ নিয়ে তিনি কতটা চিন্তিত ছিলেন সেটি এ থেকে বুঝা যায়। দৃঢ়চেতা ও অসম্ভব মনেবলের অধিকারী আব্দুল হাই সম্পর্কে ধারণা করা যায় প্রথম চিঠিতেই। মাকে তিনি লিখছেন, ‘‘ভাই সাহেব বোধ হয় আমার আশা বাদই দিয়াছেন। আমি কিন্তু কোন ব্যাপারে নিরাশ হই নাই। হইবোও না। বাঁচিয়া থাকিতে হইলে জীবনে বাধাবিপত্তি অনেক থাকিবেই। এরি মধ্যে পথ কাটিয়া অগ্রসর না হওয়ার অর্থ সমূহ অমঙ্গলকে নিমন্ত্রণ করিয়া ডাকিয়া আনা।’’। পথ কাটিযা অগ্রসর হওয়ার চিন্তা যে ব্যক্তি কারাগারে বসে করতে পারেন তাকে পথের দিশারী ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় কি?
কারাগারে থ্কাাবস্থায় তিনি সিদ্ধান্ত নেন ¯œাতক পরীক্ষা দেয়ার। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় বই ও বই কেনার জন্য টাকার অভাব। অনেক চিঠিতে তাঁর এই অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। ৫ম চিঠিতে তিনি মাকে লিখছেন, ‘‘বইপত্রের অভাবে পড়াশোনা ভালোভাবে করিতে পারিতেছি না। পাঁচ মাস হইতে চলিল। আজ পর্যন্তও আমার এতো এতো বইখাতার একখানা পাতাও আমার হাতে আসিল না। ইহার চাইতে আশ্চর্যের আর কী হইতে পারে।’’ ৬ষ্ঠ চিঠিতে তিনি লিখছেন, ‘‘ আমার নি¤œলিখিত বইগুলির খুব দরকার। দাগ দেওয়াগুলি বাড়িতে বা বাসায় আছে। অন্যগুলি কিনিতে হইবে। ভাই সাহেব যদি নভেম্বর মাসের পহেলা ভাগে কিছু বেশি করিয়া টাকা পাঠান তাহা হইলে ভালো হয়।’’ ওই চিঠিতে তিনি মোট ১৮টি বইয়ের তালিকা দিয়েছিলেন যেগুলো তাঁর প্রয়োজন। ৭ম চিঠিতে তিনি বোনকে লিখছেন, ‘‘দরকারি বইয়ের যে বিস্তারিত লিস্ট পাঠাইয়াছিলাম সেখানকার প্রতি কেউ নজর দিয়াছেন বলিয়া তো আজ মাস তিনেকের মধ্যেও কোনও প্রমাণ পাইলাম না।’’ ৮ম চিঠিতেও তিনি মাকে লিখেছেন, ‘‘ভাই সাহেবকে বলিও বাকি যে বইগুলির লিস্টি পাঠাইয়াছিলাম সেগুলি বোধ হয় কোথাও পাইবেন না। টাকা পাঠাইয়া দিলে এখান হইতে কিনিয়া নিতে পারিব।… আর একখানা বই ওহফরধহ যরংঃড়ৎু লাল মলাটের ছোটো জিল করা বই বাড়িতে আছে। ওই খানাও পাঠাইয়া দিতে বলিও। ’’ কারাগার থেকে লিখা প্রায় প্রতিটি চিঠিতেই তিনি বিভিন্ন বইপত্র পাঠানো, বই কেনার জন্য টাকা পাঠানো, পরীক্ষার প্রস্তুতির খবরাখবর ইত্যাদির উল্লেখ রয়েছে। এ থেকে ¯œাতক পরীক্ষাকে তিনি কতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন তা বুঝা যায়। এর ফলও তিনি পেয়েছিলেন। আল আজাদেও দেয়া তথ্য মতে, ১৯৫৪ সনে কারাগার থেকে ৪৩ জন কারাবন্দী পরীক্ষায় অংশ নেন। তার মধ্যে একা আব্দুল হাই ডিস্টিংশনসহ ¯œাতক পরীক্ষা পাস করেন।
আল আজাদের বইয়ে উৎকলিত চিঠিগুলোতে সংগত কারণেই রাজনৈতিক প্রপঞ্চ উঠে আসেনি। তিনি চিঠি লিখেছেন মাকে। সেখানে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কথাই থাকবে। রাজনৈতিক সতীর্থদের কাছে তিনি কোনো চিঠি লিখেছিলেন কিনা তা আর এখন জানার উপায় নেই। লিখলেও সেগুলো মহাকালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। আরেকটি কারণ রয়েছে। কারাবন্দীদের চিঠিগুলো কয়েক স্তরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রাপকের হাতে আসে। রাজনৈতিক কথাবার্তা থাকলে হয় সেগুলো কাটিয়া দেওয়া হয় নতুবা পুরো চিঠিটিই গায়েব করে ফেলা হয়। সেকারণেও চিঠিগুলোতে রাজনৈতিক কথাবার্তা না থাকতে পারে। আব্দুল হাই এঁর চিঠিগুলো পড়লে সে সময়ের জেলের পরিবেশ সম্বন্ধে একটি ইতিবাচক ধারণা পাওয়া যায়। জেলের ভিতরে তাঁর কোনো অসুবিধা হচ্ছে এমন কথা কোনও চিঠিতে উল্লেখ নেই। বরং খাবার, চিকিৎসা, পড়াশোনা ও অবসর সময় কাটানোর বিষয়ে জেলভ্যন্তরে তিনি বেশ ভাল আছেন বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে। অবশ্য তিনি রাজনৈতিক কারণে নিরাপত্তা বন্দী হিসাবে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিলেন। সাধারণ কয়েদীদের অবস্থার সাথে তাঁর অবস্থার প্রভেদ থাকাটাই বরং স্বাভাবিক। শেষ চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন তিন কন্যাকে ঢাকা থেকে ২০ এপ্রিল ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ তারিখে। তিনি তখন কিডনি রোগে আক্রান্ত জীবিত একমাত্র পুত্র সন্তান গালেব হোসেনকে চিকিৎসা করাতে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেনÑ‘‘ গালেব মিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালোর দিকে। সত্বর পূর্ণ আরোগ্য হইবে বলিয়া মনে করি।’’ কিন্তু তাঁর এই আশা ছিলো মরীচিকার মতো অবাস্তব। ১৯৮২ সনেই পুত্র গালেব মাত্র ১৪ বছর পরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। জন্মের ৬ মাস পর তিনি প্রথম পুত্র সন্তানকে হারিয়েছিলেন। সেই শোক ভুললেও ১৪ বছরের তরতাজা পুত্র গালেবের মৃত্যু তাঁকে একেবারেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলে। জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব কিংবা অসারত্ব নিয়ে তাঁর মনে একধরনের নতুন চিন্তার আচ্ছন্নতা তৈরি হতে থাকে। জীবন ও সংসার সম্পর্কে তিনি তখন একেবারেই উদাসীন হয়ে উঠেন। ভাববাদে আত্মমগ্ন এক বিবাগী আব্দুল হাইকে তখন আমরা দেখতে পাই। এমন উদাসীনতা অবশ্য তাঁকে বেশিদিন সইতে হয়নি। পুত্র গালেব মিয়ার মৃত্যুর ঠিক এক বছরের মাথায় ১৯৮৩ সনের ২৫ এপ্রিল তিনি নিজেই মায়াময় জগতের যাবতীয় মায়া চিরতরে ছেড়ে জীবনাবসান ঘটান।
আব্দুল হাই এঁর হাতের লিখা ছিলো মুক্তো দানার মতো সুন্দর। চিঠিগুলো লিখেছেন সুবিন্যস্ত ভাষায়। কোনও বাক্য গঠনে সামান্যতম খুত নেই। শব্দচয়নে সাহিত্যিক মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। সমকালীন বেশকিছু চমকপ্রদ কথ্য শব্দেরও সন্ধান মিলে চিঠিগুলোতে। যেমনÑ জিল করা বই (বাইন্ডিং করা বই), কোরা রঙের গেঞ্জি (ধানের তোষের রঙ), নেমক খাইয়াছি (সহযোগিতা পাওয়া অর্থে), খুশ খবর (ভালো খবর), সবর করিবায় (অপেক্ষা করা) ইত্যাদি। এই চিঠিগুলো সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন।
শেষ কথার প্রণতি
আব্দুল হাই সারা জীবন এই অঞ্চলের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজকে অগ্রসর করে নিতে ভূমিকা রেখেছেন। আমরা এর ফল ভোগ করছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর ফল থেকে বঞ্চিত হবে না। মহৎ মানুষরা এমনভাবেই জীবনকে জগৎ কল্যাণে ব্যয় করেন। এই জায়গায় পরবর্তী প্রজন্মের কিছুটা দায়ভার থেকে যায়। দায়ভার হলো আলোকজ্জ্বল পূর্বসূরীদের বিস্মরণে চলে যেতে না দেয়া। তাহলে আদর্শ ও মূল্যবোধ, কর্তব্য ও দায়িত্ব, প্রগতি ও আধুনিকতা; কোনও কিছুই নিশ্চল হয় না। গুণিজনদের যদি আমরা ভুলে যাই তাহলে নতুন করে গুণী তৈরি হবে কী করে? আব্দুল হাই লোকান্তরে চলে গেছেন। তাঁকে নিয়ে কে কী করল তার কিছুই তিনি দেখবেন না।। তাতে তাঁর কিছু আসবে যাবেও না। কিন্তু আমরা যারা বেঁচে আছি তাদের অনেক কিছু আসা যাওয়ার রয়েছে। অগ্রগতি হলো আকাশের মতো অনন্ত এক অভীলক্ষ্য। একটু একটু করে উপরে উঠতে হয়। উপরে উঠার এই প্রয়াসে সময়ের নানা বাঁকে বহুজন বহুভাবে ভূমিকা রাখেন। আব্দুল হাইও রেখেছেন। এখন নতুন নতুন আব্দুল হাই প্রয়োজন। আমরা যদি অগ্রগতির রথে থাকতে চাই, আমরা যদি উর্দ্ধপানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে চাই; তাহলে অবশ্যই তাঁকে স্মরণ ও মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে হবে। নতুবা রুদ্ধ হবে এগিয়ে যাওয়ার পথটুকুই।
বিরলপ্রজ মহৎপ্রাণ কীর্তিতে মহীয়ান আব্দুল হাই এঁর প্রতি আমার অনন্ত শ্রদ্ধা।
তথ্যসূত্র: ১। ভাষাসংগ্রামী আব্দুল হাই- আল আজাদ।
২। সুনামগঞ্জে বঙ্গবন্ধু ও তৎকালীন রাজনীতি- কল্লোল তালুকদার