সুনামগঞ্জ পৌর নির্বাচন জনপ্রতিনিধিত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নির্বাচনি পরিবেশ

সুনামগঞ্জ পৌর নির্বাচন প্রচারণার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়র পদে তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় নির্বাচনী আমেজ সেই অর্থে জমে উঠেনি পৌরাঞ্চলে। সম্ভবত মেয়র বা চেয়ারম্যান পদের নির্বাচনে এত জৌলুষহীনতা অতীতে কখনও দেখা যায়নি। মেয়র পদটিকে ঘিরে পুরো শহর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যেত। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতার স্পর্শে পরিবেশ-পরিস্থিতি কখনও কখনও উত্তাপ-উত্তেজনা ছড়ালেও সাধারণ মানুষ একে উৎসবের অংশ হিসাবেই দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন। এবার সেরকম পরিস্থিতি না থাকায়, আপাত দৃষ্টিতে নৌকার প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি না হওয়ায় মূলত নির্বাচনটি উৎসবের আমেজ নিয়ে সামনে আসতে পারেনি। তবে নির্বাচনটিকে একেবারে নিষ্প্রাণ হতে দেননি কাউন্সিলর প্রার্থীরা। পৌরসভার ৯ ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৪৮ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এক ৯ নম্বর ওয়ার্ডেই ১১ জন আর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৯ জন প্রার্থী লড়ছেন সাধারণ কাউন্সিলর পদের জন্য। সুতরাং পাড়া-মহল্লায় তাঁদের কল্যাণে নির্বাচনি পরিবেশ কিছুটা জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখা গেছে। এবার অধিকাংশ প্রার্থী প্রচারণার ক্ষেত্রে মাইক ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নাগরিকদের শব্দদূষণের হাত থেকে রক্ষা করার মতো একটি প্রশংসনীয় উদ্যেগ গ্রহণ করেছেন। এজন্য তাঁদের ধন্যবাদ।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার রাস্তা-ঘাট, ড্রেনেজ সিস্টেম ব্যবস্থা ইত্যাদি এখন বেশ নাজুক অবস্থায় আছে। নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যাশা অনেক কিছ্।ু পৌরশহরে একটি পৌর মিলনায়তন নেই, নেই কোনো পৌর কমিউনিটি সেন্টার অথবা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বৃহত্তর ৫ নম্বর ওয়ার্ড, যেখানে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বসতি, সেখানে নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়। পৌরসভার অভ্যন্তরে ক্রমশ নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠছে অপরিকল্পিতভাবে, সেখানে মানা হচ্ছে না ইমারত নির্মাণের নিয়ম-কানুন। পৌরসভার জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে আছে বেশ আগে থেকেই। এরকম অবস্থায় অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলার জায়গাটিও দুর্বল। সুতরাং পৌর নির্বাচনে যারা জনপ্রতিনিধিত্বের অধিকার অর্জন করবেন তাঁদের কাজ করার অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। জনপ্রতিনিধিগণের রূচি, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা-চেতনা ও সৃজনশীলতার উপরও নির্ভর করে আরও বহু জনহিতকর কর্মকা-। সুতরাং মেয়র পদ নিয়ে নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা তৈরি না হলেও নির্বাচিতদের প্রকৃত পৌরপ্রতিনিধি হয়ে উঠার পরীক্ষা দেয়ার একটি উর্বর ক্ষেত্র কিন্তু প্রস্তুত হয়েই আছে। এখন আমাদের অপেক্ষা করার পালা, নির্বাচনের পর নতুন পৌর পরিষদ এই জায়গায় কতটুকু যোগ্যতার পরিচয় দেন তা দেখার।
আরেকটি বিষয়ের প্রতি নজর দেয়া প্রয়োজন রয়েছে বলে আমরা মনে করি। কাউন্সিলর প্রার্থী নিয়ে যে প্রতিযোগিতা চলমান তা বহু ভোটারকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। সকল কাউন্সিলর প্রার্থীই নিজ নিজ এলাকার সকলের কাছের মানুষ। আত্মীয়তা, বন্ধুতা, প্রতিবেশী; ইত্যাদি সম্পর্ক দ্বারা পরষ্পর সংযুক্ত। এরকম অবস্থায় একাধিক কাছের মানুষের মধ্যে যেকোনো একজন প্রার্থী বেছে নেয়া সত্যিই কঠিন। কিন্তু এই কঠিন কাজটিই করতে হবে ভোটারদের। গণতান্ত্রিক রীতি অনুসারে প্রত্যেক ওয়ার্ডে একজন প্রার্থী জয়লাভ করবেন, অন্যদের পরাজয় মেনে নিতে হবে। জয়-পরাজয়ের এই মানসিকতা নির্বাচনের আগে থেকেই প্রার্থীদের অর্জন করতে হবে। এটি না করে কেউ যদি নির্বাচনের পরে ্আপত্তিকর আচরণে লিপ্ত হন তবে তা একদিকে যেমন পৌরবাসীর লজ্জাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিবে তেমনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সংশ্লিষ্টদের অসহনশীলতাও প্রমাণ করবে। আমরা আশা করব প্রার্থী, ভোটার ও প্রশাসন; সকলেই নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করবেন।